ধান ও চাল থেকে শুরু করে আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম—দেশের প্রধান কৃষিপণ্যের বাজারে মূল্যের অস্থিরতা এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। কোথাও কৃষক লোকসানে, কোথাও ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি দাম। এই বৈপরীত্যের পেছনের কারণ খুঁজতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি কৃষিপণ্যের মূল্যশৃঙ্খল নিয়ে একটি বিস্তৃত সমীক্ষা চালিয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) সমীক্ষার গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউনিট ও গভর্নর অফিসের যৌথ উদ্যোগে করা ‘এ স্টাডি অন ভ্যালু চেইন ইফিয়েন্সি অব দ্য অ্যাগ্রিকালচারাল প্রডাক্টস ইন বাংলাদেশ (সেকেন্ড ফেস)’ শীর্ষক এ গবেষণায় দেশের ১৮ জেলার ৬১টি উপজেলার মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে— উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মৌসুমি সংকট, সংরক্ষণ দুর্বলতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতিই দামের অস্থিরতার মূল কারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সমীক্ষা স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, কৃষিপণ্যের বাজারে মূল সমস্যা উৎপাদনের ঘাটতি নয়, বরং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। সময়মতো নীতিগত সহায়তা ও আর্থিক সুরক্ষা না বাড়ানো গেলে কৃষক লোকসানে পড়বেন, আর শেষ পর্যন্ত তার চাপ এসে পড়বে ভোক্তার ঘাড়েই।
ধান ও চাল: খরচ বাড়ছে, দামও চাপে
সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বোরো মৌসুমে উৎপাদিত মোটা চালের খুচরা দাম কেজিতে ৬১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। গবেষণা বলছে, উৎপাদন খরচ এক বছরে বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জমির পরিমাণ কমে যাওয়াই এর মূল কারণ।
অনেক কৃষক আগের বছর বেশি লাভের আশায় আলু ও পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকেছিলেন। ফলে ধানের জমি ও ফলন দুটোই কমেছে। পাশাপাশি দুর্বল বর্ষণ ও টানা বৃষ্টিতে ধান শুকানো ও মাড়াই ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে মিল পর্যায়ে চাল উৎপাদনে।
ঈদের টানা ১০ দিনের ছুটি ও ব্যাংক বন্ধ থাকায় ধান কেনাবেচা স্থবির হয়ে পড়ে। এতে মিলগুলো কাঁচামালের সংকটে পড়ে এবং বাজারে চালের দাম বেড়ে যায়।
চিকন চালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। খুচরা দাম কেজিতে ৭৮ টাকা, যা এক বছরে বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৮ শতাংশ, আর জমির পরিমাণ কমেছে ৪ শতাংশ।
আলু: বাম্পার ফলনেও লোকসান
আলুতে এ বছর ফলন ভালো হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। উৎপাদন খরচ যেখানে কেজিতে ১৯ টাকা, সেখানে মাঠপর্যায়ে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২–১৩ টাকায়। ফলে কৃষক প্রতি কেজিতে গুনছেন বড় লোকসান।
লোকসান ঠেকাতে কৃষকরা আলুর প্রায় ৫৯ শতাংশ কোল্ড স্টোরেজে রাখছেন। তবে সংরক্ষণ খরচ কেজিতে ৬.৭৫ টাকা, যা বাস্তব ব্যয়ের তুলনায় বেশি বলে উঠে এসেছে সমীক্ষায়। বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ থাকায় দাম বাড়ার সম্ভাবনাও এখনই দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
পেঁয়াজ: দাম স্থিতিশীল, লাভ সীমিত
পেঁয়াজ উৎপাদনে এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ফলন হয়েছে। বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে দাম কেজিতে ৪৩ টাকা, উৎপাদন খরচ ৩৩ টাকা। কাগজে-কলমে লাভ থাকলেও বাস্তবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণে ওজন কমা ও পচনের কারণে লাভ প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
সমীক্ষা বলছে, ন্যায্য লাভ নিশ্চিত করতে পেঁয়াজের দাম ৫০-৬০ টাকা হওয়া প্রয়োজন। আধুনিক এয়ারফ্লো সংরক্ষণ প্রযুক্তি চালু হলে অপচয় কমিয়ে কৃষকের আয় বাড়ানো সম্ভব।
ব্রয়লার ও ডিম: খামারির ঘাড়ে লোকসান
ব্রয়লার মুরগিতে খামার পর্যায়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১৩২ টাকা, অথচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। ঈদুল আজহার সময় লাল মাংসের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় মুরগির চাহিদা কমে যায়, যার পুরো চাপ গিয়ে পড়ে খামারিদের ওপর।
ডিমের ক্ষেত্রেও ছোট খামারিরা লোকসানে পড়েছেন। বিপরীতে বড় খামারি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করে লাভ ধরে রাখতে পেরেছে।
কী সুপারিশ দিলো বাংলাদেশ ব্যাংক
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— কৃষিপণ্য ও পোলট্রি খাতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) চালু করা জরুরি। সার, খাদ্য ও ওষুধের বাজারে কঠোর নজরদারি দরকার। আধুনিক সংরক্ষণ ও শুকানোর অবকাঠামো বাড়াতে হবে। পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় স্বল্পসুদে ঋণ ও রিফাইন্যান্স সুবিধা চালু করতে হবে।