Image description

বরিশালের নির্বাচনী মাঠ এখন জমজমাট। শহর থেকে গ্রামের মেঠোপথ পর্যন্ত দেয়াল, গাছ আর বৈদ্যুতিক খুঁটিতে সাঁটানো পোস্টার। বিকেল নামলেই হ্যান্ডমাইকে  শুরু হয় প্রচারণা; রাত পর্যন্ত চলে উঠান বৈঠক। প্রতীক বরাদ্দের আগেই অন্তত তিন দলের প্রার্থীদের দৈনন্দিন প্রচারণার ধরন প্রায় একই রকম।

তবে একটি জায়গায় এসে এই সমীকরণ ভেঙে যায়।

 

বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনে প্রতীক বরাদ্দ পাওয়া ১২৩ জন প্রার্থীর ভিড়ে নারীদের উপস্থিতি মোটেও চোখে পড়ার মতো নয়। সংখ্যার হিসাবে প্রায় অদৃশ্য। মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র দুইজন।

শতাংশের হিসেবে তা ২ শতাংশেরও  কম। ছয় জেলার মধ্যে কেবল দুই জেলায় নারী প্রার্থীর দেখা মিলেছে। বাকি চার জেলায় ব্যালটে থাকছে না কোনো নারী নাম।

 

দুই নারী প্রার্থীর শুধু পরিচয় নয়, তাঁদের রাজনৈতিক পথ পুরোটাই আলাদা।

তাঁদের একজন চিকিৎসক, অপরজন সাবেক সংসদ সদস্য। কিন্তু নির্বাচনী মাঠে নামার পর স্পষ্ট হয়, এই লড়াই শুধু ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে প্রতিযোগিতা সামাজিক অবস্থান, আর্থিক সক্ষমতা আর রাজনৈতিক পুঁজি ঘিরে।

 

এক প্রান্তে আছেন মনীষা চক্রবর্ত্তী। সংসদ থে‌কে শুরু ক‌রে সি‌টি নিবাচ‌নে র‌য়ে‌ছে তাঁর অভিজ্ঞতা।

ব্যক্তিগত উদ্যোগ আর স্বজনদের সহায়তার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর প্রচারণা। সীমিত সম্পদ, পরিচিতজনের সহযোগিতা আর অল্পস্বল্প স্বেচ্ছাশ্রমে এগোচ্ছে তাঁর নির্বাচন। বড় ব্যানার বা শোভাযাত্রা নেই। রয়েছে নিয়মিত হাঁটা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা আর নিজের বিশ্বাসে অটল থাকা।

 

অন্য প্রান্তে রয়েছেন ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টো। তাঁর ক্ষেত্রে এখনও স্পষ্ট পুরনো ক্ষমতার ছাপ। রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী। সম্পদ, পারিবারিক রাজনৈতিক ভিত্তি আর দীর্ঘদিনের পরিচিত নেটওয়ার্ক তাঁকে আলাদা করে চেনায়। মাঠে নামলেই বোঝা যায়, তাঁর পেছনে রয়েছে অতীতের শক্ত জমি, যা এখনও পুরোপুরি নড়েনি।

চিকিৎসক মনীষার ভরসা ‘মাটির ব্যাংক’
বরিশাল-৫ আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্ত্তী। বয়স ৩৫ বছর। পেশায় চিকিৎসক। মনোনয়নপত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা একটি মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। মারামারির একটি মামলায় অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি।

মনীষার ঘোষিত অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে নগদ ১২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, ব্যাংকে চার লাখ ৬৪ হাজার টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী আমানত পাঁচ লাখ টাকা। রয়েছে পাঁচ ভরি সোনা। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ৬৯ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদ নেই বললেই চলে। 

বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে তিন লাখ ২৯ হাজার টাকা। চিকিৎসা পেশা ও ব্যাংকের মুনাফা মিলিয়ে মাসিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তাঁর মোট সম্পদ ২২ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য মনীষা নির্ভর করছেন পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তার ওপর। বোন তন্দ্রা চক্রবর্ত্তী ধার দেবেন তিন লাখ টাকা, কাকাতো ভাই দুই লাখ টাকা। বাবা তপন চক্রবর্ত্তী দান করবেন ৫০ হাজার টাকা।

ইলেনের পুরনো ক্ষমতার ছাপ
ঝালকাঠী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টো। বয়স প্রায় ৬০ বছর। ২০০১ সালে তিনি সরাসরি ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। স্বামী প্রয়াত জুলফিকার আলী ভূট্টো ছিলেন ব্যবসায়ী ও সাবেক সংসদ সদস্য। তাঁদের দুই সন্তান বর্তমানে পড়াশোনায় ব্যস্ত।

ইলেন ভূট্টোর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা। নগদ রয়েছে ২১ লাখ ৩১ হাজার টাকা, ব্যাংকে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি প্রাইভেট কার ও ৩০ তোলা সোনা রয়েছে।

কৃষি ও অকৃষি জমির মূল্য এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা। উত্তরা এলাকায় একটি বাড়িও রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তাঁর মোট সম্পদ এক  কোটি ৯ লাখ টাকা। বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ছয় লাখ ৭৩ হাজার টাকা এবং ঘোষিত ব্যয় ১৫ লাখ টাকা। নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য ধার ও দানের তালিকাও বড়। চাচা শ্বশুর দেবেন তিন লাখ টাকা; দেবর দুই লাখ এবং দুই ভাই দান করবেন পাঁচ লাখ টাকা। 

তিন নারীর একজন বাদ
এবারের নির্বাচনে তৃতীয় নারী প্রার্থী ছিলেন ঝালকাঠী-১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি মনোনীত ডা. মাহমুদা আলম মিতু। তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধও ঘোষিত হয়। তবে ১০ দলীয় জোটের সমর্থন না পেয়ে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তিনি। ফলে কার্যত প্রতিযোগিতায় নারীর সংখ্যা আরো  সংকুচিত হয়েছে।

বরিশাল মহিলা পরিষদের সভানেত্রী অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, ১২৩ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র দুইজন থাকা প্রমাণ করে, রাজনীতিতে নারীর জন্য সমান মাঠ এখনও প্রস্তুত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো মুখে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললেও মনোনয়নে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখনও ব্যক্তিনির্ভর এবং কাঠামোগত সমর্থন ছাড়া টিকে থাকা কঠিন।

শাহ সাজেদা আরো বলেন, সংসদে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বক্তৃতায় যতটা সরব, প্রার্থী তালিকায় তার ছাপ ততটাই অনুপস্থিত। এবারের নির্বাচনে বরিশাল বিভাগে সেই পুরনো বাস্তবতাকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। নারী ভোটার আছেন, কিন্তু প্রার্থী হিসেবে তাঁদের উপস্থিতি এখনও ব্যতিক্রম।