Image description
 

২০১১ সালের ২৫ নভেম্বর আমি জেল থেকে ছাড়া পাই। কয়েকদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গেলাম। ঢাকায় ফিরে খুব টায়ার্ড ছিলাম। খেয়ে বিশ্রাম নিতে যাবো এমন সময় দৈনিক আমার দেশ-এর সিনিয়র রিপোর্টার এম এ নোমানের ফোন। কোথায় আছি, এটা জানতে না চেয়েই বললেন, আপনাকে জাতীয় প্রেসক্লাবে আসতে হবে। বললাম, এখন আসতে পারবো না। আমি সবেমাত্র বাড়ি থেকে এসেছি। অত্যন্ত টায়ার্ড আছি। নোমান বললেন, এটা রুহুল আমীন গাজী ভাইয়ের কথা, আমার নয়। আমি বললাম, এখন নয়। কাল আসবো।

এম এ নোমান এরপর বললেন, এটা গাজী ভাইয়েরও কথা নয়, বিএনপি চেয়ারপার্সন ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কথা। বিকেলে এখনই জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এই সমাবেশে বক্তা হিসেবে মাহমুদুর রহমান ভাই এবং আপনাকে অবশ্যই রাখতে বলেছেন ম্যাডাম। আপনাকে সংবাদটা পোঁছানোর জন্য আমাকে গাজী ভাই দায়িত্ব দিয়েছেন। এরপরের সিদ্ধান্ত আপনার।
সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ পত্রিকাটির নিয়মিত প্রকাশনা শুরু হয় ২০০৩ সালের অক্টোবরে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে শীর্ষকাগজে। এটা জানতাম যে, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রতিবেদনগুলো দেখতেন এবং মন্তব্য করতেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থাও নিয়েছেন। তারমধ্যে দু’একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ছিলো। তবে ওইসব প্রতিবেদন নিয়ে কখনো কথা হয়নি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। সাংবাদিক সম্মেলন বা অনুষ্ঠানাদিতে দু’একবার সাক্ষাৎ হয়েছে, কিন্তু সেগুলো একান্তই আনুষ্ঠানিক। ফলে জানা সম্ভব হয়নি, আমার সম্পর্কে বেগম খালেদা জিয়ার ধারণা কেমন- ভালো নাকি খারাপ।

জাতীয় প্রেসক্লাবের ওই সাংবাদিক সমাবেশে উপস্থিত হলাম। মাহমুদুর রহমান ভাই আমার আগেই উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনিও আমার বিষয়ে বরাবরই আন্তরিক ছিলেন। এর আগে শীর্ষনিউজ ডটকম ও শীর্ষকাগজের অ্যাক্রেডিশেন কার্ড বাতিলের প্রতিবাদে ৩০ জুলাই ২০১১ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ভাইও উপস্থিত ছিলেন তাতে। ওই রাতেই আমি গ্রেফতার হই। এর কিছুদিন আগে মাহমুদ ভাই জেল থেকে বের হয়েছেন। পরে অন্য মাধ্যমে জেনেছি, মানববন্ধনের ভিডিও তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখানো হয়েছে। ভিডিওটি শেখ হাসিনার সামনে উপস্থাপনের সময় বলা হয়েছে, এরা দু’জন সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্রে নেমেছে। আর তখনই শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন আমাকে গ্রেফতারের।
জাতীয় প্রেসক্লাবের ওই সমাবেশের পরে বিএফইউজে এবং ডিইউজের পক্ষ থেকে সাংবাদিক মহাসমাবেশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১২ মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে দুই দিন পিছিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনিই মূলতঃ সাংবাদিক মহাসমাবেশ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিএফইউজে এবং ডিইউজে-কে। বিএফইউজে’র সভাপতি ছিলেন রুহুল আমিন গাজী। গাজী ভাই আমাকে জরুরিভাবে প্রেসক্লাবে যাওয়ার জন্য খবর দিলেন। তিনি বললেন, সাংবাদিক মহাসমাবেশ হবে। এতে তোমাকে এবং মাহমুদুর রহমানকে অবশ্যই রাখতে বলে দিয়েছেন ম্যাডাম। তুমি মিস করবে না কোনোভাবেই। আমরা দাওয়াত কার্ড বানাবো। দাওয়াত কার্ডে প্রধান অতিথি হিসেবে শুধুমাত্র ম্যাডামের নাম থাকবে। তোমাকে দাওয়াত কার্ড পাঠাবো। মহাসমবেশে হাসিনার নির্যাতন-নিপীড়নের বর্ণনা দেবে। আমি বললাম, হ্যাঁ মহাসমাবেশে অবশ্যই থাকবো।

১২ ফেব্রুয়ারির আগে আরও বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে রুহুল আমিন গাজী ভাইয়ের সঙ্গে। প্রত্যেকবারই গাজী ভাই মহাসমাবেশের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। গাজী ভাই একাধিকবার এও বলেছেন, আমরা যতবার ম্যাডামের সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাই তিনি প্রত্যেকবারই তোমার খোঁজ-খবর জানতে চান। আমরা কেমন আছি, জানতে না চেয়ে তিনি শুধুমাত্র তোমার কথা জিজ্ঞেস করেন, একরাম কেমন আছে? রুহুল আমিন গাজী ভাই অসন্তুষ্ট চিত্তে নয়, বরং সরলভাবে খুশিমনেই কথাগুলো বলতেন। কিন্তু আমার মনে হলো, সিনিয়র-প্রভাবশালী কেউ কেউ বিষয়গুলো ভালোভাবে নিচ্ছেন না। পরিস্থিতি এমন যে, তাদের নেতৃত্বের স্থান আমি দখল করে নিচ্ছি।

সেই ১২ ফেব্রুয়ারি এলো। সম্ভবত সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরের সাংবাদিক মহাসমাবেশে আমি উপস্থিত হলাম। নিয়ম অনুযায়ী অতিথি হিসেবে আমাকে সভামঞ্চে ডাকার কথা। কিন্তু ডাকলেন না ঘোষক। অথচ নেতা-অতিথি অন্য সবাই সমাবেশের মঞ্চে আছেন। আমি দর্শক সারিতে বসলাম। নেতারা সবাই আমাকে দেখছেন, স্টেজে যাওয়ার জন্য বলছেন না।

এই সময় পুরনো একটা কথা মনে পড়লো। আমি যখন আজকের কাগজে ছিলাম, ২০০৩ সালের কথা। একটি ঘটনায় চীফ রিপোর্টারের (যিনি আমার আত্মীয়ও) সঙ্গে রাগ করে চাকরি থেকে ইস্তফা দিলাম এক মাসের নোটিস দিয়ে। নোটিসের মেয়াদ যখন শেষের দিকে চীফ রিপোর্টার মেসবাহ আহমেদ ও সিনিয়র রিপোর্টার এনাম আবেদীন আমাকে নিয়ে বসলেন। বললেন, তোমাকে রাখার জন্য সম্পাদক কাজী শাহেদ সাহেব আমাদের দু’জনকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তুমি কী চাও? তোমার যা যা চাহিদা সবই পূরণ করবেন তিনি। সম্পাদক বলেছেন, তোমাকে এ অফিসের প্রয়োজন আছে। কাজী শাহেদ সাহেবের মূল্যায়ন হলো, একরাম যথেষ্ট যোগ্য। কিন্তু সে কখনো নিজের পাওনা বুঝে নিতে পারবে না, যেখানেই চাকরি করুক।

সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদের এই মূল্যায়নের কারণ হলো, অফিসের প্রয়োজন ছাড়া আমি কখনো তাঁর কাছে যাইনি। তোয়াজ করিনি। আমি বরাবরই বিশ^াস করি, যোগ্যতার মূল্যায়ন কখনো না কখনো দিতে হবে অবশ্যই। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, সমাবেশের এখানে আর বসে থাকা ঠিক হবে না। নেতাদের সঙ্গে ঠেলাধাক্কা দিয়ে সামনে যেতে চাই না। আমার মূল কাজ এটা নয়। এসব করতে গেলে বরং আমার মূল কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। নিজেদের মধ্যে অবস্থানের লড়াইয়ে নামলে হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করা আর হয়ে উঠবে না।

সম্ভবতঃ সাড়ে ১১টার দিকে বেগম খালেদা জিয়া প্রেসক্লাব এলাকায় আসলেন। নেতারা সবাই মঞ্চ থেকে দৌড়ে গেইটে গেলেন ম্যাডামকে আনতে। এই ফাঁকে আমি প্রেসক্লাব চত্বর ছেড়ে চলে যাই। ম্যাডাম মঞ্চে এসেই আমাকে খুঁজলেন, একরাম কই? মাইকে আমাকে খোঁজাখুঁজি শুরু হলো, শীর্ষনিউজ সম্পাদক একরামুল হক আপনি কোথায় আছেন? ম্যাডাম খালেদা জিয়া আপনাকে খুঁজছেন। আপনি এখানেই তো দর্শক সারিতে ছিলেন। যেখানেই থাকুন মঞ্চে আসুন। ম্যাডাম খালেদা জিয়া আপনাকে খুঁজছেন। এভাবে অনেকবার মাইকে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু আমি তখন সেখানে ছিলাম না, তাই যেতে পারিনি। পরে জেনেছি অন্যদের মাধ্যমে এ কথাগুলো।

মনে হলো, আমি না থাকাতে কেউ কেউ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন, আপদ গেলো- এই বিবেচনায়। পরবর্তীতে চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করলাম। তাঁকে বললাম, আপনার সংগ্রামের সহযোগী যোদ্ধা হিসেবে আরও বড় ভূমিকা রাখবো। যা এ ধরনের সভা-সমাবেশের মাধ্যমে সম্ভব নয়। আমার পেশাগত ভূমিকাই হবে হাসিনার বিরুদ্ধে বড় অস্ত্র।

বেগম খালেদা জিয়াকে দেওয়া সেই কমিটমেন্ট অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে কখনো আমার কলমকে বিরত রাখতে পারেনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা। শীর্ষনিউজ, শীর্ষকাগজ এবং সবশেষে শীর্ষনিউজ মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমেও লাগাতারভাবে বড় ধরনের ভূমিকা রাখা হয়েছে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে। একটি গণমাধ্যম বন্ধ করা হলে আরেকটি দিয়ে লড়াই চালিয়ে গেছি। দফায় দফায় শীর্ষনিউজকে বন্ধ করা হয়েছে। প্রত্যেকবার ব্লকের পর আবার নতুন ডোমেইন নিয়ে শীর্ষনিউজ নিউজ পোর্টাল চালু করেছি। একবার ডোমেইন ব্লক হওয়ার পর নতুন ডোমেইনে অনলাইন চালু করা অত্যন্ত কষ্টকর কাজ। তারপরও দমে যাইনি। শীর্ষনিউজ, শীর্ষকাগজ বা মাল্টিমিডিয়ার প্রতিটি শব্দ পর্যন্ত অত্যন্ত সচেতনভাবে দেখতাম, যাতে কোনো একটি শব্দও হাসিনার পক্ষে না যায়।

২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিদেশে গিয়ে সেটেলড হওয়ার অনেক পরামর্শ এবং অফারও এসেছে। কখনও বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা মাথায়ও ঢুকতে দেইনি। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ৫ আগস্ট, ২০২৪ পর্যন্ত সময়গুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন রকমের। ২৮ অক্টোবর বিএনপির নয়াপল্টনের মহাসমাবেশ ভন্ডুল হওয়ার পর বলা যায়, লেখালেখির জন্য একমাত্র আমিই ছিলাম বিএনপির পক্ষের লোক। অবশ্য, এর আগেই শীর্ষনিউজ পোর্টাল উচ্চ আদালতের দোহাই দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন ডোমেইনে চালু করা যাচ্ছিল না, তাতে হাইকোর্টের আদশে লঙ্ঘন ও আইনের ফাঁদে ফেলা হবে। এই সময় শীর্ষনিউজ মাল্টিমিডিয়া বেশ ভালো ভূমিকা রাখছিল। মাল্টিমিডিয়া বন্ধেরও অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। সম্ভব হয়নি, যেহেতু এটা চলছিলো ফেইসবুক-ইউটিউবের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে সরকারের কোনো আইন বা নীতিমালাও নেই। তাই ব্যবস্থা নিতে পারছিল না। তবে ৬ নভেম্বর, ২০২৩ শীর্ষকাগজের ছাপাখানায় পুলিশ পাঠিয়ে পত্রিকা ছাপা বন্ধ করে দেওয়া হলো। প্রেস মালিককে দিয়ে উল্টো আমার বিরুদ্ধে থানায় জিডি এন্ট্রি করানো হলো। ডিসি অফিসে অভিযোগপত্র দেওয়া হলো, শীর্ষকাগজের ডিক্লারেশন বাতিল করার প্রয়াস হিসেবে। ৫ আগস্ট, ২০২৪ পর্যন্ত পত্রিকা ছাপতে পারিনি। কিন্তু মাল্টিমিডিয়ার পাশাপাশি শীর্ষকাগজ ডোমেইনে পত্রিকার প্রকাশনা চালু রেখেছি।

মহীয়সী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অনেক গুণের অধিকারী। তাঁর মতো এতো গুণের ধারেকাছেও যাওয়ার সম্ভাবনা নেই আমার। তবে চেষ্টা করেছি তাঁর দু’একটি গুণ অনুসরণের, যেমন- দেশপ্রেম, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে লাগাতারভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। বেগম খালেদা জিয়ার কাছে অঙ্গীকার করেছি। লাগাতার লড়াইয়ের মাধ্যমে সেই অঙ্গীকার রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমিই একমাত্র ব্যক্তি- দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাইনি, একদিনের জন্যও লড়াইয়ে বিরতি দেইনি এই দীর্ঘ সময়ে।

বেগম খালেদা জিয়া পরপারে চলে গেছেন। মৃত্যুর সময় এবং এর পরে আল্লাহ তাকে সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তা দিয়েছেন, সম্মান দিয়েছেন। আল্লাহর কাছে আবেদন করবো, যাতে পরকালেও এমন সম্মান দান করেন তাঁকে।

লেখক: (সম্পাদক, শীর্ষনিউজ ডটকম ও সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ)