ড. এম. এল. রায়হান
সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
পোস্টডক্টরাল গবেষক, সোকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান
আমি গতকাল লিখেছিলাম যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘পলিসি সামিট ২০২৬’ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ন্যারেটিভ-নির্ভর রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক উদ্যোগ। লিখিত, খাতভিত্তিক ও সংখ্যাভিত্তিক নীতিপ্রস্তাব উপস্থাপনের মাধ্যমে জামায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে নীতিপ্রস্তাবের গুণমান মূল্যায়ন করতে হলে কেবল অভিপ্রায় নয়, বরং তার ফিস্কাল বাস্তবতা, কাঠামোগত সক্ষমতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
বিশেষত আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে, যেখানে সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক ও সম্পদ সীমিত—সেখানে প্রতিটি পলিসি প্রপোজালের কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবেই। তাই জামায়াতের দেওয়া প্রস্তাবগুলোকে প্রশ্ন করা, বিশ্লেষণ করা ও গঠনমূলক সমালোচনার আওতায় আনা জরুরি। একইভাবে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রস্তাব—দেশের সকল পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘বেকারভাতা প্রদান’—এই বিষয়গুলো নিয়েও সমানভাবে একাডেমিক ও নীতিনির্ভর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ক্ষমতার দাবিদার রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রস্তাবসমূহ সংশোধন ও পরিমার্জনের সুযোগ পাবে এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি অধিকতর বাস্তবসম্মত ইশতেহার উপস্থাপন করতে পারবে।
রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর কাছে জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট হওয়া উচিত—তারা যে নীতিপ্রস্তাব দিচ্ছে, সেগুলোর ‘প্ল্যান অব ওয়ার্ক’ ও ‘ক্যালেন্ডার অব ওয়ার্ক’ জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা এবং বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রদর্শন করা।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের প্রস্তাবগুলোর কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
১. জিডিপি বনাম বাজেট: একটি মৌলিক বিভ্রান্তি
স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৬–৮ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী এবং নৈতিকভাবে প্রশংসনীয়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান ফিস্কাল কাঠামোতে এটি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে মোট বাজেট জিডিপির মাত্র ১৫–১৬ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার জাতীয় আয়ের খুব সীমিত অংশই সরাসরি ব্যয় করতে পারে।
এই অবস্থায় স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৬–৮ শতাংশ বরাদ্দ মানে দাঁড়ায়—সরকারি বাজেটের প্রায় ৪০–৫০ শতাংশ কেবল একটি খাতে ব্যয়। এতে শিক্ষা, কৃষি, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক খাত মারাত্মকভাবে সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
যদি এই লক্ষ্যমাত্রা মোট জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যয় (Total Health Expenditure) হিসেবে নির্ধারিত হয়ে থাকে—তাহলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। কারণ জাতীয় ব্যয় ও সরকারি বাজেট—এই দুইয়ের পার্থক্য স্পষ্ট না হলে নীতিপ্রস্তাব অর্থনৈতিকভাবে বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে।
২. রাজস্ব নীতিতে ইতিবাচক দিক ও সীমাবদ্ধতা
জামায়াতের অর্থনৈতিক প্রস্তাবের একটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিক হলো—রেভিনিউ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে তুলনামূলকভাবে সুস্পষ্ট অবস্থান। করহার কমিয়ে horizontal tax expansion, কর ফাঁকফোকর বন্ধ করা এবং করজাল বিস্তারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের ধারণা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষিত।
তবে এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়—
এই কর সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন—তা কীভাবে এবং কত সময়ে গড়ে তোলা হবে? কর প্রশাসনের বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে কার্যকরভাবে ট্যাক্স লুপহোল বন্ধ করা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া, যা পাঁচ বছরের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন।
৩. কন্ট্রাডিক্টরি পলিসি প্যাকেজ
নীতিপ্রস্তাবগুলোর মধ্যে একটি লক্ষণীয় দুর্বলতা হলো—কিছু প্রস্তাব পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একদিকে শিল্পায়নের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ব্যাপক ভর্তুকি বা বিনামূল্যে সরবরাহের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের নীতি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল করে এবং বাজারে বিকৃত প্রণোদনা (distorted incentives) তৈরি করে।
৪. সময়সীমা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা
পাঁচ বছরে ১০ মিলিয়ন তরুণকে স্কিল ট্রেনিং, ১.৫ মিলিয়ন ফ্রিল্যান্সার তৈরি, প্রতিটি উপজেলায় টেক ল্যাব স্থাপন—এই লক্ষ্যগুলো আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিশাল প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত জনবল, অবকাঠামো ও ধারাবাহিক অর্থায়ন। এই সক্ষমতা কীভাবে তৈরি হবে—সে বিষয়ে বিস্তারিত রোডম্যাপ এখনও অস্পষ্ট।
৫. নৈতিক অভিপ্রায় বনাম রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা
জামায়াতের নীতিপ্রস্তাবে নৈতিকতা, ইনসাফ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। তবে রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল নৈতিক অবস্থান দিয়ে সম্ভব নয়; এটি অর্থনীতি, প্রশাসন ও ক্ষমতার কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই এগোয়। এখানে আবেগী প্রতিশ্রুতি যতটা শক্তিশালী, টেকনিক্যাল ডিটেইল ততটাই দুর্বল বলে প্রতীয়মান হয়।
জামায়াতে ইসলামীর পলিসি সামিট নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী আলোচনা শুরু করেছে। তবে একটি দায়িত্বশীল নীতিপ্রস্তাব হতে হলে শুধু “কী করতে চাই” নয়, বরং “কীভাবে, কত সময়ে, কোন অর্থে এবং কোন ঝুঁকি নিয়ে”—এই প্রশ্নগুলোর বিশ্বাসযোগ্য ও পরিমাপযোগ্য উত্তর দিতে হয়।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে—আমরা আর অলীক স্বপ্ন বা ফাঁপা স্লোগানে সন্তুষ্ট নই। আমরা চাই বাস্তবসম্মত, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই নীতি। সেই মানদণ্ডে জামায়াতের প্রস্তাব একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে, তবে এটিকে এখনো পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তবযোগ্য রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় রূপ দিতে আরও গভীর পরিমার্জন প্রয়োজন।