Image description

দেশের কারাগারগুলোয়ও লেগেছে ভোটের হাওয়া। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান কারাগারে বন্দি হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ সাধারণ বন্দিরাও। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দাপুটে রাজনীতি করা এবং প্রশাসনে দাবড়িয়ে বেড়ানো শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাসহ বর্তমানে কারাবন্দি ১৯০ জন ভিআইপি। এর মধ্যে অন্তত ১০৫ জন আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

তাঁদের মধ্যে অন্তত ৫০ জন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য। কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার বন্দিদের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ বহুগুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ নির্বাচনে মাত্র ১৪ জন বন্দি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন। আর এবার এই সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
 
বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে মোট ৮৬ হাজার ৩০০ জন বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ছয় হাজার ২৪০ জন বন্দি ভোটাধিকারের জন্য নিবন্ধন করেছেন। যদিও এনআইডির ভুল তথ্য ও নানা কারণে ৩২০ জনের আবেদন বাতিল হয়েছে। তবে পাঁচ হাজার ৯২০ জন বন্দিকে ভোট দিতে অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন ১৯০ জন ভিআইপি বন্দি। তাঁদের বড় একটি অংশ কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে রয়েছেন। এর মধ্যে ১০৫ জন বন্দি পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে আবেদন করেছেন।

জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, যাঁরা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন, নিয়ম অনুযায়ী তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। নির্দেশনা পাওয়ার পরই দেশের সব কারাগারে বন্দিদের নিবন্ধন করার জন্য প্রচার করা হয়েছে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ জন ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। তবে তাঁদের নাম বলতে চাই না।

কারা কর্তৃপক্ষ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলেও কারাগারের একটি বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, সাবেক মন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান, আসাদুজ্জামান নূর, ইমরান আহমদ, খুলনা-৪ আসনের সাবেক এমপি সালাম মুর্শেদী, ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খানসহ অর্ধশত সাবেক মন্ত্রী ও এমপি এই তালিকায় রয়েছেন।

এ ছাড়া সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ সোহায়েল, সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাছান চৌধুরী, কুষ্টিয়ার সাবেক পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাতসহ অনেক ভিআইপি বন্দি ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন।  

বাংলাদেশের সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর ৮ ধারা অনুযায়ী, যাঁরা আইনগত হেফাজতে বা কারাগারে আছেন, তাঁদের পোস্টাল ব্যালট বা ডাকযোগে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে কয়েক দশক ধরে এই আইনের প্রয়োগ দেখা যায়নি। সাবেক ডিআইজি প্রিজনস মেজর (অব.) শামসুল হায়দার ছিদ্দিকী এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে বন্দিদের ভোট দেওয়ার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা তৎপরতা দেখিনি।

তবে ২০২৩ সালের শেষের দিকে তৎকালীন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন কারাবন্দিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়। এর ফলে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো কারাবন্দিরা ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। তবে সেবার মাত্র ১৪ জন বন্দি এই সুযোগ নিয়েছিলেন।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ কালের কণ্ঠকে জানান, বন্দিদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি জেল কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই প্রচার করে। আগ্রহী বন্দিরা নিবন্ধনের জন্য কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করেন। ইসি থেকে প্রাপ্ত পোস্টাল ব্যালটসংবলিত খামগুলো কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ভোটারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এতে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য আলাদা দুটি ব্যালট থাকবে। কারাগারের ভেতরেই একটি অস্থায়ী গোপন ভোটকক্ষ তৈরি করা হবে। সেখানে বন্দিরা তাঁদের পছন্দের প্রতীকে ভোট দেবেন। ভোট দেওয়া শেষে ব্যালট পেপারগুলো বিশেষ খামে ভরে সিলগালা করে রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানায় পাঠানো হবে।

দেশের ৮৬ হাজার বন্দির মধ্যে এবার ছয় হাজারের বেশি বন্দি নিবন্ধন করেছেন। অর্থাৎ ৭৯ হাজারেরও বেশি বন্দি নিবন্ধনের বাইরে থেকে গেছেন।

কারাবন্দিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের এই ক্রমবর্ধমান হার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।