Image description

গত বছর ঢাকার একটি আদালত আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীমকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা জরিমানা করেন এবং তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নগদ অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্থায়ী আমানত জব্দের নির্দেশ দেন। এই রায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দুর্নীতির মামলাগুলো অবশেষে গতি পাচ্ছে—এমন একটি শক্ত বার্তা দেয়। এর কয়েক সপ্তাহ আগেই আরেকটি আদালত দেশের অন্যতম আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারি হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ৫২৫ কোটির বেশি টাকা জরিমানা করেন এবং প্রায় ১২১ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন।

এই দুই রায় ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। একসময় যাদের 'ধরাছোঁয়ার বাইরে' মনে করা হতো, তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় আদালত দ্রুতগতিতে কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই আদালত প্রায় ৫ হাজার ৬০ কোটি টাকা জরিমানা আদায় এবং ৩২১ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন, যা উভয় ক্ষেত্রেই রেকর্ড সর্বোচ্চ।

এসব জরিমানা ও বাজেয়াপ্ত বিষয়ে বিচারিক আদালতে রায়ের পর হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে।  সে তুলনায়, ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল মাত্র ৮১ কোটি টাকা। দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর যে পরিমাণ জরিমানা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ এসেছে, তা কমিশনের ইতিহাসে একেবারেই নজিরবিহীন।

২০২৫ সালে দুদকের দায়ের করা মামলাগুলো নিষ্পত্তির পর আদালত প্রায় ৫ হাজার ৬০ কোটি টাকা জরিমানা আদায়ের নির্দেশ দেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় চার গুণ বেশি। বিচারিক আদালতের রায় ও আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে, যেখানে আগের বছর এ অঙ্ক ছিল মাত্র ৮১ কোটি টাকা।

দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের বিপুল অঙ্কের জরিমানা আদায়ের রায় আগে কখনো হয়নি। আইন অনুযায়ী, সব জরিমানা ও বাজেয়াপ্ত সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়ে।

২০২৫ সালে আদালত রাষ্ট্রের অনুকূলে প্রায় ৩২১ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ২৭ গুণ বেশি। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে কোনো বছরেই এত বড় অঙ্কের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়নি।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, জরিমানা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের এই পরিমাণ "নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন" এবং এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।

তিনি বলেন, দুর্নীতির কারণে টালমাটাল অর্থনৈতিক খাত এই জরিমানা ও বাজেয়াপ্তের অর্থ দিয়ে কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। তবে এসব মামলার বেশিরভাগ রায় যেহেতু বিচারিক আদালতে হয়েছে, তাই হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে এগুলো চ্যালেঞ্জ হবে, দুদক যেন সেই চ্যালেঞ্জগুলো শক্তভাবে আইনি পথে মোকাবিলা করতে পারে, সেই উদ্যোগ নিতে হবে।

দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেও সম্পদ জব্দ করা যায়। সে ক্ষেত্রে সম্পদ সরকারের হেফাজতে থাকে, তবে আসামিদের আপিলের অধিকার থাকে।

তিনি বলেন, "মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই চূড়ান্তভাবে সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়।"

দুদক ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী সব জরিমানা ও বাজেয়াপ্ত সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়, যা রাষ্ট্রের কাজে ব্যয় হয়। গত বছর নিষ্পত্তি হওয়া অধিকাংশ মামলাই ৮ থেকে ১০ বছর পুরোনো ছিল, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল উচ্চপর্যায়ের আলোচিত মামলা।

কতগুলো মামলায় কী পরিমাণ জরিমানা

দুদকের সংশ্লিষ্ট শাখার তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৬৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এরমধ্যে ১৩৪টি মামলায় সাজা হয়েছে। বাকীগুলোয় খালাস পেয়েছেন আসামিরা। সাজা হওয়া মামলাগুলোয় জরিমানা করা হয়েছে ৫ হাজার ৬০ কোটি ৫৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের ৪১টি মামলায় চূড়ান্ত রায়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে আদায় করেছে দুদক, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে। 

সে তুলনায়, ২০২৪ সালে ১ হাজার ১৪৭ কোটি ৩৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। ওই বছর ২৯৫টি মামলা নিষ্পত্তি করে আদালত, এরমধ্যে ১৩৮টি মামলায় শাস্তি ও জরিমানা করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ১ হাজার ৬০০ কোটি ৮৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকার জরিমানা করেছেন আদালত। ওই বছর ৩১৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়, এরমধ্যে শাস্তি ও জরিমানা হয় ১৯৫টিতে। ২০২২ সালে ২ হাজার ৬০০ কোটি ৩২ লাখ ৪১ হাজার টাকার জরিমানার রায় এসেছে। সেবছর ৩৪৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। ২০২১ সালে ৭৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা জরিমানা আদায়ে রায় এসেছে। ওই বছর ১৭৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

গত বছর নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে যেগুলোতে কারাদণ্ড ও জরিমানা দিয়েছেন আদালত, ওই মামলাগুলোর রায়ে গত বছর ৩২১.৮৮ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। যেখানে ২০২৪ সালে বাজেয়াপ্তের অঙ্ক ছিল মাত্র ১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা; ২০২৩ সালে ১৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা; ২০২২ সালে ১৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং ২০২১ সালে ১০ কোটি ২০ লাখ টাকা।

আলোচিত মামলা

অতীতে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের জড়িত থাকার কারণে বড় পরিসরের দুর্নীতি নির্বিঘ্নেই চলেছে। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মো. মইদুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অতীতে বড় ধরনের দুর্নীতি ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল, যার ফলে তখন দুদকও কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

তিনি বলেন, "২০১৫ সালের আগে দুদক সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করার উদ্যোগ নেয়নি, আর এরপরও এসব পদক্ষেপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছোটখাটো দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেই সীমিত ছিল।"

তিনি আরও বলেন, "৫ আগস্টের পর দুদক আগে যাদের স্পর্শ করা যেত না, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। সে কারণেই এ বছর এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দ ও ফ্রিজ করা সম্ভব হয়েছে।"

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আদালতের আদেশ কার্যকর করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। "আদেশ দেওয়া প্রথম ধাপ মাত্র, সঠিক বাস্তবায়ন আলাদা একটি বড় কাজ," বলেন তিনি।

জরিমানার অর্থ যেভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়

দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, কোনো দুর্নীতির মামলায় জরিমানা ও বাজেয়াপ্তের রায় হলে আইন অনুযায়ী এসব অর্থ সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হয়। তিনি জানান, যেসব মামলায় হাইকোর্টে ও আপিল বিভাগে আপিল হয়, সেগুলো নিষ্পত্তির পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন আদালত।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এত পরিমাণ জরিমানা ও বাজেয়াপ্ত নিশ্চয় একটি ভালো খবর। এসব সম্পদ যাতে করে চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রের কাজে আসে, সেজন্য দুদককে আরো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে।

রেকর্ড পরিমাণ সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ

গত বছর প্রায় ৩০ হাজার ৩৫২ কোটি টাকার বেশি সম্পদ আদালতের আদেশে জব্দ ও অবরুদ্ধ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), যা এপর্যন্ত রেকর্ড। এর আগের পাঁচ বছরে মাত্র ৩ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করেছিল দুদক।

দুদকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ৩৬১ কোটি টাকা; ২০২৩ সালে ৪১৫ কোটি টাকা; ২০২২ সালে ৮১০ কোটি; ২০২১ সালে ১,৪৮৮ কোটি এবং ২০২০ সালে মাত্র ৩৩৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই যে পরিমাণ সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে—তা আগের পাঁচ বছরের প্রায় দশগুণ।

মইদুল ইসলাম বলেন, কোনো মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর আসামি দোষী সাব্যস্ত হলে সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়, আর খালাস পেলে তা ফেরত দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী এ সময়ের জন্য একজন রিসিভার বা তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দেওয়া হয়।

দুদকের একজন সাবেক কমিশনার টিবিএসকে বলেন, জব্দকৃত, ফ্রিজকৃত সম্পদের কার্যকর, স্বচ্ছ এবং ঝুঁকিমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা—যাতে রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়, এমন উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।

তিনি বলেন, বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে যেসব অর্থ বা সম্পদ জব্দ করা হয়, সেগুলো সাধারণত ব্যাংকের চলতি বা সঞ্চয়ী হিসাবে ফ্রিজ অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে থাকে। এসব অ্যাকাউন্ট সাধারণত সুদ-বিহীন হওয়ায় তহবিলের প্রকৃত মূল্য সময়ের সঙ্গে কমে যায়। 

যেহেতু কোনো দুর্নীতি বা মানিলন্ডারিং মামলা নিষ্পত্তি হতে নূনতম ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগে, তাই এসব তহবিল সঠিকভাবে কাজে লাগাতে আইনের সংস্কার করা জরুরি। যাতে অন্তুর্বর্তী সময়ে এসব সম্পদের সুদ আয়ও সরকার পেতে পারে।