পুলিশ চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান আন্দোলনে আক্রমণের শিকার হয়েছিল। থানা লুট হয়েছিল। পুড়িয়েও দেওয়া হয়েছিল কয়েকটি। এ সময় পুলিশকে পাহারা দিয়েছিলেন আনসার সদস্যরা। এতে ভেঙে যায় পুলিশের মনোবল। প্রাথমিকভাবে কী পরিমাণ অস্ত্র লুট হয়েছে পুলিশ তা বুঝতেও পারেনি। একপর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে পুলিশের ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছে। এরপর ১৭ মাস পেরিয়ে গেলেও বেহাত রয়েছে অনেক আগ্নেয়াস্ত্র। এসব লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে এ পর্যন্ত তিনবার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাড়া পাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো-এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা না করে, অজ্ঞাত কারণে যেসব গণমাধ্যমের প্রচার-প্রসার কম-অস্ত্র উদ্ধারের পুরস্কারের খবরটি প্রচার করতে সেসব গণমাধ্যমের ওপর ভর করছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশের অন্যান্য স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, লুট, অগ্নিসংযোগ করা হয়।
পুলিশের এসব স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ লুট হয়। গণভবন এলাকা থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি অস্ত্রও খোয়া যায়। পরবর্তী সময়ে অভিযানে অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনো ১ হাজার ৩৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৯টি গুলি উদ্ধার করা যায়নি।
যার মধ্যে রাইফেল, এসএমজি (স্মল মেশিনগান), এলএমজি (লাইট মেশিনগান), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান, কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার, কাঁদানে গ্যাসের শেল, কাঁদানে গ্যাসের স্প্রে, সাউন্ড গ্রেনেড ও বিভিন্ন বোরের গুলি রয়েছে। অপারেশন ডেভিল হান্ট চালিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও এসব অস্ত্র-গুলি এখনো বেহাত রয়ে গেছে। বর্তমান অপারেশন ডেভিল হান্টের ফেজ-২ চলছে। কিন্তু এই অভিযানেও পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্রের বিষয়ে তেমন সফলতা দেখা যাচ্ছে না। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অস্ত্র অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব অস্ত্র ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১০ আগস্ট স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই ঘোষণার সময় পুলিশের হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৭৫টি এবং গোলাবারুদ ছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৪৯টি। এরপর গত ৬ নভেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানানো হয় প্রকৃত সন্ধানদাতাকে পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার, চায়না রাইফেলের জন্য ১ লাখ, এসএমজির জন্য দেড় লাখ, এলএমজির জন্য ৫ লাখ ও প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য ৫০০ টাকা করে পুরস্কার দেবে সরকার। এ ক্ষেত্রে সন্ধানদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে। এরপর সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আবারও পুরস্কার ঘোষণার কথা জানানো হয় গণমাধ্যমে। এরপরও তেমন সাড়া মিলছে না।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে মাঝেমধ্যে কিছু উদ্ধার হচ্ছে। তবে যতটা প্রত্যাশা করা হচ্ছে তেমন হচ্ছে না। এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেম লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে লং ব্যারেল অস্ত্র রয়েছে অনেক। ফলে লুণ্ঠনকারী বা অপব্যবহার করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি সেগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে বের হতে পারছে না। বারবার পুরস্কার ঘোষণার পরেও কেন সাড়া মিলছে না? জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, এগুলো পুরস্কার ঘোষণার পরেই যে উদ্ধার হয়ে যাবে বিষয়টি সেরকম নয়। অস্ত্র উদ্ধারে আলাদাভাবে সোর্স মেইনটেইন করতে হয় দীর্ঘদিন ধরে। ফলে পুরস্কার ঘোষণার পরও তেমন সাড়া মেলেনি। এদিকে অভিযোগ রয়েছে, অতীতে যতবার অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে ততবারই দেখা গেছে পূর্বের উদ্ধার করা অস্ত্র পরবর্তী সময়ে উদ্ধার দেখিয়ে পুরস্কার ও পদক হাতিয়ে নিয়েছেন পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা।