Image description
এলপিজি সংকট চরমে

দেশে জ্বালানি গ্যাস এলপিতে চরম সংকট বিরাজ করছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের কারসাজির কাছে গ্রাহকরা জিম্মি হয়ে পড়ছেন। এলপিজি সিলিন্ডার বিভিন্ন জায়গায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি করার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। দেশে আমদানি করা ৯৮ শতাংশ এলপিজি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে আসে। তবে এবার  সংকট সামলাতে এলপিজি আমদানি করতে চায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসি।

এদিকে, সংকট কাটাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এ জন্য অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। চিঠিতে বলা হয়েছে, এলপিজি’র পুরো বাজার বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় সংকটে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত। এলপিজি আমদানির অনুমতি চেয়ে ১০ই জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেন বিপিসি’র চেয়ারম্যান মো. আমিন-উল আহসান।

চিঠিতে বলা হয়, সামপ্রতিক সময়ে দেশের এলপিজি বাজারে সরবরাহ ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। তাতে কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার স্থিতিশীল করার সরকারি কোনো হাতিয়ার নেই। এ বাস্তবতায় নীতিগত অনুমোদন পেলে বিপিসি জি-টু-জি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি অপারেটরদের মাধ্যমে দ্রুত বাজারে সরবরাহ করবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি খাতকে সরবরাহ করলে একই পরিস্থিতি থাকবে। বেসরকারি খাতে এলপিজি’র দাম প্রতি মাসে নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। তবে সেই দামে এলপিজি বিক্রি হয় না। তাই আমদানি করে বিপিসি সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি না করলে বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। আগেও এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার, তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

বিপিসি’র ওই চিঠিতে বলা হয়, দেশের এলপিজি আমদানির জন্য বিপিসি’র নিজস্ব পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এ মুহূর্তে নেই। তবে বেসরকারি অপারেটররা কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র এলাকায় এলপিজিবাহী বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করে নিজেদের টার্মিনালে নিয়ে গিয়ে সংরক্ষণ ও বিতরণ করে থাকে। বিপিসিও একই পদ্ধতিতে বেসরকারি অপারেটরদের সুবিধা ব্যবহার করে আমদানি করা এলপিজি খালাস ও বণ্টন করতে পারে। 

সূত্র মতে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি দু’ভাবে এলপিজি বাজারে আসে। সরকারি পর্যায়ে সীমিত এলপিজি সরবরাহ করে বিপিসি’র তিনটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারিভাবে এলপিজি বিক্রি হয়েছে ১৯ হাজার টন। সরকারি এই বিক্রির বিপরীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই চাহিদার বড় অংশ জোগান দেয়। লোয়াব ও বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে ২৯টি কোম্পানির আমদানি সক্ষমতা আছে। লাইসেন্স নিয়েছে অর্ধশতাধিক। তবে বড় পরিসরে আমদানি করে মূলত পাঁচ ছয়টি কোম্পানি। আর নিয়মিত এলপিজি আনে ৭ থেকে ৮টি কোম্পানি। গত বছর আমদানি হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টন। চলতি মাসে বেসরকারি পর্যায়ে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের ঘোষিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্র্র্ধারণ করেছে বিইআরসি। তবে বাজারে এ দামে সিলিন্ডার বিক্রি হয় না। দ্বিগুণ দামেও অনেক জায়গায় এলপিজি পাওয়া যায় না বলে ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় সংকট ও সরবরাহের চাপে বাজারে সিলিন্ডারের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিগত সরকারগুলো এলপিজি খাতকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক করে ফেলেছে। তাই ভোক্তাবান্ধব সিদ্ধান্ত দরকার। প্রয়োজনে সরকারিভাবে আমদানি করে সরবরাহ বাড়াতে হবে। যাতে গ্রাহকরা ন্যায্যমূল্যে গ্যাস পেতে পারেন। মূল্য নির্ধারণে থাকতে হবে স্বচ্ছতা।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এলপিজি’র এই সংকট থেকে যেন আমরা শিক্ষা নেই, ভবিষ্যতে যেন এমন সংকট না হয়। সরবরাহ বাড়াতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। 

ক্যাব’র সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, এলপিজিকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য্য হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এলপিজি’র দাম সর্বনিম্ন পর্যায় রাখার কথা বলেন তিনি। এলপিজি’র মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। বেশি টাকা দিলে গ্যাস পাওয়া যায়, কোথায় গ্যাপ। বাড়তি টাকা কাদের পকেটে চলে যাচ্ছে, এটা খুঁজে বের করা দরকার।