বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে ১২ তারিখ। বলা হচ্ছে—একদিন আগেও নয়, একদিন পরেও নয়, ভোট হবে ঠিক সেদিনই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু তারিখ ঘোষণা করলেই কি নির্বাচন অর্থবহ হয়ে ওঠে? নির্বাচন মানে তো কেবল ভোটগ্রহণের দিন নয়; নির্বাচন মানে একটি ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া, নিরপেক্ষ প্রশাসন, দৃশ্যমান নির্বাচন কমিশন এবং সবচেয়ে বড় কথা-ভোটারদের আস্থা।
তিনি বলেন, ভয়মুক্ত পরিবেশ, মব সন্ত্রাস দমন, প্রশাসনিক কারসাজি বন্ধ এবং নির্বাচনের ওপর মানুষের বিশ্বাস ফেরানোর মতো প্রধান শর্তগুলো এখনো পূরণ হয়নি।
সম্প্রতি গ্লোবাল টেলিভিশনের নিয়মিত আয়োজন ‘প্রশ্নগুলো সহজ’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রুহিন হোসেন প্রিন্স এসব কথা বলেন।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন নির্বাচন ১২ তারিখেই হবে—একদিন আগেও না, একদিন পরেও না। আমি অন্তত এই কথাটির ওপর এখনো পর্যন্ত ভরসা রাখতে চাই।
তিনি বলেন, তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) ভালো নির্বাচনের কথা বলেছেন। আমরা তর্কে যেতে চাই না, এখন সেই তর্কে যাওয়ার অবস্থাও নেই। কারণ নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা যায়নি, এবং বাস্তবে তা হয়নি—এটাই মূল কথা।
পোস্টাল ব্যালট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পোস্টাল ব্যালটে এইবার প্রথমবারের মতো আমাদের বিদেশি বন্ধুরা ভোট দেবেন এবং দেশের মধ্যেও অনেকে ব্যালটে ভোট দেবেন। প্রায় ১৫ লাখের বেশি ভোটার এভাবে ভোট দেবেন বলে জানা যাচ্ছে। এটি যেহেতু প্রথমবার হচ্ছে, তাই আরো বেশি নজরদারি প্রয়োজন। ভোটের সময় কীভাবে কী করা হবে, তাও এখনো অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়। এরপর গণভোট নামক যে বিষয়টি রয়েছে, সেটি নিয়েও আলাদা আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমি এসব জায়গায় খুবই ক্ষুব্ধ, কারণ আমরা চেয়েছিলাম—নির্বাচনের সময় পুরো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ঢেলে সাজিয়ে এমনভাবে গঠন করা হোক, যেন তারা সত্যিকার অর্থে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের দায়িত্ব পালন করতে পারে। এ ব্যাপারে তো সবাই একমত। ওই ধরনের সরকার না হলে ভোট নিরপেক্ষ হতেই পারে না—এই দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন হয়েছে। আর আগের নির্বাচন বাতিল হওয়ার মধ্য দিয়েই তো মূল সংকটের উৎপত্তি। এবার ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায়ও সবাই একমত হয়েছেন যে, নির্বাচনকালীন সময়ে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তদারকি সরকার থাকতে হবে। আমরা বলেছিলাম, সরকারকে ঢেলে সাজাতে হবে অথবা অন্তত আচরণে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেটি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এমনকি প্রধান উপদেষ্টাকে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলতে শুনেছি, তরুণরা নির্বাচিত হবে, এমনকি তারা মন্ত্রিসভায় সুযোগ পাবে—এ ধরনের বক্তব্যও এসেছে। ফলে অনেকেই আমাদের প্রশ্ন করছেন, তাহলে কি উনি ভোটের আগেই ফলাফল ঘোষণার কাজ করছেন? এটা তো উনার দায়িত্ব না। এটা কোন দিকে যাচ্ছে—সেই প্রশ্নও উঠছে।
তিনি বলেন, ১৫ লাখ ভোট নিঃসন্দেহে বড় একটি সংখ্যা। এই ভোট নিয়ে আলাদা আলোচনা হওয়া দরকার। কিন্তু ‘হ্যাঁ ভোট দেব’—এ ধরনের প্রচার সরকার যেভাবে করছে, ব্যাংক থেকে শুরু করে এনজিও পর্যন্ত, মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে নানা জায়গায় যেভাবে সক্রিয় প্রচার দেখা যাচ্ছে—অতীতে আমরা এরকম নজির দেখেছি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে “হ্যাঁ ভোট দেব” ধরনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া দরকার, সেটাও কমিশনের দায়িত্ব হতে পারে না। ভোট দেব কি দেব না—এটা জনগণের বিষয়, এটা কমিশনের প্রচারণার বিষয় নয়।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমরা এই ভোটকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেছি সে আলোচনা অন্য প্রসঙ্গ। তবে প্রশ্ন হলো, কেন এমন প্রচার ও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে? কারণ আমরা জানি অতীতে ভোটের ফলাফল নিয়ে কী কী হয়েছে, ‘ম্যানিপুলেশন’-এর বহু সুযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ম্যানিপুলেশনের জন্য কিছু সুযোগ আবার নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে—এ ধরনের প্রশ্নও উঠছে। এসব প্রশ্নের সমাধান সরকারকে দিতে হবে। তবে আমি এর দায় নির্বাচন কমিশনের ওপরই দিতে চাই, কারণ এখন সবকিছু নির্বাচন কমিশনের অধীনেই হচ্ছে। তাই এই সব প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশনকেই দিতে হবে।