Image description

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। এ তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একতরফা বিজয়ের নেপথ্যে প্রশাসনের বড় ভূমিকা ছিল—এমন প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও মাঠ প্রশাসনে যেসব কর্মকর্তা ও কর্মী কাজ করবেন, তাদের ভূমিকার ওপর নির্ভর করবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা। এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহায়তা দিতে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের ওপর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ সহায়তার আওতায় পড়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসন, রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ পুরো প্রশাসনিক কাঠামো। নির্বাচনের সময়ে এসব কর্মকর্তা কার্যত নির্বাচন কমিশনের অধীনে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের পদোন্নতি, বদলি ও শৃঙ্খলাজনিত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে নির্বাহী বিভাগ। এখানেই নির্বাচন ব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা।

তবে এবারের নির্বাচনেও প্রশাসনিক ও আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে থাকা শীর্ষ নির্বাহীরা। তারা মনে করেন আসন্ন নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। এবারো ব্যতিক্রম নয়। নানা ধরনের চ্যালেঞ্জই রয়েছে। তবে প্রশাসন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে পূর্ণমাত্রায় প্রস্তুত রয়েছে। আমরা আশাবাদী যে এবারই একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’

আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করা হলেও মূলত আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে নেপথ্যে ভূমিকা রাখে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় একটি অংশ। তারাই মূলত নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোকে দমন-পীড়ন, ভয়-ভীতি প্রদর্শন এবং ভোট কেন্দ্রে দখল নিতে তৎকালীন সরকারি দলের কর্মীদের সুযোগ করে দেয়।

বিতর্কিত এ তিন নির্বাচন নিয়ে ‘জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে তদন্ত কমিশন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবশিষ্ট ১৪৭টিতে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১৪ সালের ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সারা বিশ্বে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করতে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলকে ব্যবহার করা হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ কৌশলী পরিকল্পনায় অংশ নেয় তারা। ২০১৮ সালের ওই নির্বাচনে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বলে জানায় তদন্ত কমিশন।

পরপর দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ বিজয় ২০২৪ সালেও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এ নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ‘ডামি’ প্রার্থী দেয়ার অপকৌশল গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার।

বিগত তিনটি নির্বাচনে রাজনৈতিক এসব অপকৌশল বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ নির্বাচনী সেলও গঠন করা হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত নির্বাচন ব্যবস্থাকে ইসির কাছ থেকে প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে প্রশাসনই মূলত হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা কলুষিত ও বিতর্কিত হওয়ার বেশকিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা কারণগুলো হলো নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ ও নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং সশস্ত্র বাহিনীর মনোনীত একটি অংশকে ব্যবহার; বিরোধী প্রার্থী ও কর্মীদের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের; বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অজামিনযোগ্য মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার ও গুম; জাল ভোট প্রদান; নির্বাচনী কারচুপিতে নির্বাহী বিভাগকে ব্যবহার; ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো; ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের প্রবেশে বাধা; অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সংসদীয় সীমানা নির্ধারণ; আগে থেকেই ব্যালট বাক্সে ভোট ভরে রাখা; ভোট প্রদানের হারে পরিবর্তন; ভোট কেন্দ্রে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ; একতরফাভাবে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ; প্রার্থীদের ভয়ভীতি, প্রলোভন দেখিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার; নির্বাচনের পরে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী পরিসংখ্যান প্রকাশ না করা; নির্বাচনের পরে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য ধ্বংস করা; নির্বাচনী অভিযোগ সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে তদন্ত না করা; নির্বাচনে ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো; বিরোধী রাজনৈতিক দলে ভাঙনের চেষ্টা; নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ নিবন্ধনে পক্ষপাতিত্ব; রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনে বৈষম্য এবং নির্বাচনের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের সাবেক এক সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাগজে-কলমে প্রশাসন কমিশনের অধীন থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় আনুগত্য কাজ করে। রাজনৈতিক চাপ বা ক্যারিয়ারসংক্রান্ত বিবেচনা নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে একই আইনি কাঠামোর ভেতর থেকেও ভিন্ন ভিন্ন নির্বাচনে ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেখা যায়।’

শুধু মন্দ নির্বাচন নয়, দেশে ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও নজির রয়েছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সব দলের ঐকমত্যে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। সে সময় তার নেতৃত্বেই একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয় এবং মাত্র ৭৮ দিনের মাথায় একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পন্ন করেন তিনি। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ বিরোধী কোনো পক্ষই কোনো প্রশ্ন তোলেনি। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা হয়ে দাঁড়াননি প্রশাসনের কর্মীরা।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনকালে দায়িত্বে থাকা সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কমিশনের নির্দেশনায় কাজ করেন। ভোট গ্রহণ ও ফলাফল প্রক্রিয়ায় যুক্ত কর্মকর্তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর থেকে এলেও নির্বাচনের সময় তারা কমিশনের কাছে জবাবদিহি করেন। তবে চাকরির মূল্যায়ন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে হওয়ায় এসব দপ্তরের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটা সমন্বিতভাবেই অনুষ্ঠিত হয়।’