২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অনুসন্ধান প্রায় শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ তুলে ২০২১ সালের নভেম্বরে কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ (কেএসআর) ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল এই দুটি এনজিওর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক হাজার কোটি ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
এছাড়া তার স্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা, শ্যালক রেজাউল আলম শাহীন ও শ্যালিকার ব্যাংক হিসাবেও তাস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। দুদক বলছে, পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের চেষ্টা করেছেন মনিরুল।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এই দুটি এনজিও রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ও পুনর্বাসনের নামে বিদেশ থেকে প্রচুর অর্থ অনুদান আনে। কৌশলে ওই টাকা মনিরুল তার শ্যালক
রেজাউল আলম শাহীনের প্রতিষ্ঠান এস এস এন্টার প্রাইজসহ নিকটাত্মীয়দের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে হয়ান্তর করেন। এনজিও থেকে অর্থ আত্মসাৎ এবং ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করে স্ত্রী, শ্যালক ও শালিকা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে সেই অর্থে বৈধ করার চেষ্টা করেন তিনি।
দুদক জানিয়েছে, মনিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী সায়লা ফারজানা অবৈধভাবে অর্থে উপার্জন করে ওই টাকা মনিরালের শ্যাদাক শাহীন, এস এস এন্টারপ্রাইজ, তানভীর ডেইরি ফার্মাসহ বিভিন্ন নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ এবা মানিলন্ডারিং আইনে অপরাধ করেছেন। ব্যাংকের নথিপত্রসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথিপত্র সংগ্রহের কাজ শেষ করেছে দুদক। শিগগিরই দুদক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে মামলা দায়ের করবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন আমার দেশকে জানান, অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অনুসন্ধানী কর্মকর্তা অনুসন্ধান শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
দুসনা জানায়, এসবির প্রধান হওয়ার পর মনিরুল ইসলাম কুয়েত সোসাইটি কর রিলিফ (কেএসআর) ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামের দুটি এনজিও নিয়ন্ত্রণে নেন। এই দুই এনজিওতে জঙ্গি অর্থায়ন হয় অভিযোগ এনে তিনি প্রতিাচান দুটির বিরাজে বাবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। কিন্তু, দায়িত্ব পালনকালীন তিনি এই প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি। তিনি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন বলেও দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে।
গত ১১ বছরে এই দুই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে বড় অঙ্কের অনুদান এসেছে। এস এস এন্টারপ্রাইজের লেনদেনের ধরন এন। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে এনজিও দুটি থেকে বড় অঙ্কের অর্থ জমা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দুদকের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ (কেএসআর) প্রতিষ্ঠানটির নামে ২০ সালের ১৬ অক্টোবর কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের উত্তরা শানায়া হিসাব খোলা হয়। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. গাজী মো. জহিরুল ও প্রজেক্ট ইনচার্জ এ কে এম রফিকুল হক হিসান পরিচালনাকারী কলে উল্লেখ আছে। এই হিসাবে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা এবং ৮৬৭ কোটি নয় লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমান স্থিতি রয়েছে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির হিসাব হতে ড্রিম স্ট্রাকচার, মেসার্স এস এস এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স গোলাম রব্বানী অ্যাড কন্ট্রাক্টর, সাজা ট্রেডিং, সানি এন্টারপ্রাইজ, রেক্সন। ট্রেডিং করপোরেশন এবং ডি ডি বিল্ডার্সের হিসাবে ছোট ছোট কিন্তু বারবার অর্থ পাঠানোর কথা উল্লেখ আছে। ২০২০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কেএসআার ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল হতে এস এস এন্টারপ্রাইজের
একটি হিসাবে ২৩ কোটি টাকা এবং আরেকটি হিসাবে ১৬ কোটি জেমার বিষয়টি দেখা গেছে।
স্ত্রী ও শ্যালকের নামে ৩৫ ফ্ল্যাট
মনিরুলের স্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা জুলাই বিপ্লবের পর নচিবালয়ে যান। পরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তোপের মুখে তিনি বের হয়ে আসেন। এরপর তিনি স্বামীর সঙ্গে ভারতে পালিয়ে যান। সরকার তাকে ওএসডি করেছে। পরবর্তী সময়ে মনিরুলের স্ত্রী সায়লা ও অ্যালকের নামে ৩০টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে দুদক। সায়লার নামে ২০২০ সালে কমিউনিটি ব্যাংক পিএলসির হিসেবে ১১ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা হয় এব: প্রায় সমপরিমাণ টাকা উত্তোলনও করা হয়। এছাড়াও তার সাড়ে ২৩ লাখ টাকার ৩টি ডিপিএস এবং সাড়ে ছয় কোটি টাকার দুটি এফভিমার তথ্য পেয়েছে দুদক।
শালেক-শ্যালিকার অ্যাকাউন্টে
অস্বাভাবিক লেনদেন
মনিরুলের শ্যালক শাহীনের নামে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব দিলন ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ১১টি হিসাব পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কমাশিয়াল ব্যাংক অব সিলনে সাড়ে তিন কোটি ঢাকার দুটি এফডিআরসহ প্রায় সাত কোটি টাকার হিস্যাবের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ২৮৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা জমা ও ২৮৫ কোটি ৮ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রমাণ নিলেছে। তার শ্যালিকা টুম্পার নামে সাউথইস্ট ব্যাংকের মিরপুর শাখায় ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে এক কোটি ৩০ লাখ
ঢাকা জনা হয়। ধূর্ত মনিরুলের চালাকি
দুদকের হাত থেকে বাঁচার জন্য মনিরুল নিজের নামে অ্যাকাউন্ট না খুলে স্ত্রী ও শ্যামাক-শালিকার নামে অ্যাকাউন্ট খুলে অবৈধভাবে টাকা স্থানান্তর করেছেন। এসবি প্রধানের দায়িত্বে থাকাকালে তার প্রভাবের কারণে দুদক তার আয় ও ব্যয় এবং সম্পদ অর্জনের বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান চালাতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুর হয়। দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শিগগিরই তার বিবৃদ্ধে মামলা দায়ের করতে যাচ্ছে
কমিশন।
সান্ত্রীক মনিরুল ত্রিপুরায়, মেয়ে লন্ডনে
শেখ হাসিনার আমলে কর্মরত মনিরুলের একজন আস্থাভাজন এমপি (বর্তমানে পলাতক) জানান, 'জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ সদর দপ্তরে আটকা পড়েন মনিরুল। ফলে হেলিকপ্টারে করে ঢাকা বিমানবন্দরে বান। সেখান থেকে বিমানবন্দরের ভেতরের সড়ক দিয়ে ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেন। ২০১৪ সালের ১৬ আগস্ট ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে একটি প্রাইভেট কারে করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় যান। সেখান দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তিনি বর্তমানে ত্রিপুরার বলাই জেলার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাতার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন। তবে তার মেয়ে লন্ডনে অধ্যয়নরত আছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ডিএমপিতে জঙ্গি নাটকের মূল হোতা ছিলেন মনিরুল। তার সময় কথিত 'জদি অভিযান' শুরু হয়। ভারতে পালিয়ে দিয়েও মনিরুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। প্রায়ই তিনি দেশের সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিবা দল নিয়ে কটূক্তি করছেন। পাশাপাশি ভারতে পালিয়ে বাওয়া পতিত স্বৈরাচার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত হাসিনার প্রশংসার মত্ত রয়েছেন।