Image description
পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের

সম্প্রতি ডাকসু, জাকসু, চাকসু, রাকসু ও জকসুসহ দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছে। আগামী ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন (শাকসু)। অন্য দিকে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে ছাত্র রাজনীতির সাম্প্রতিক এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে-তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণ।

পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার ছিল সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ শতাংশ। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা বেশির ভাগ পদে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন, কোনো কোনো পদে এই হার আরো বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত এক লাখ শিক্ষার্থী সরাসরি ভোট দিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারাকে সমর্থন করেছে। এই শিক্ষার্থীদের বয়স সাধারণত ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার। তারা দেশের ৬৪ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও অঞ্চল থেকে আসা-সব ধর্ম, সব নৃগোষ্ঠী এবং সব শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে তাদের মধ্যে। কোটিপতির সন্তান থেকে শুরু করে রিকশাচালকের সন্তান, শহুরে মধ্যবিত্ত কিংবা গ্রামীণ পরিবারের সন্তান- সবাই এই ভোটার গোষ্ঠীর অংশ।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, শিবির তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও কর্মভিত্তিক রাজনীতির কারণে যেমন এগিয়েছে, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও পুরনো রাজনৈতিক ধারা থেকে বের হতে না পারাও এই ফলাফলের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পরও ছাত্রদল কাক্সিক্ষত সংস্কার ও আধুনিক রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পরিবর্তন ও গুণগত রূপান্তর চায়, অথচ ছাত্রদল এখনো পুরনো রাজনৈতিক আচরণ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির মধ্যেই আবদ্ধ-এমন ধারণা তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। অনেকের ভাষায়, তারা যেন ছাত্রলীগের অনুকরণে যেতে চাচ্ছে।

চলতি বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় চার কোটি তরুণ ভোটার অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কিংবা সদ্য উচ্চ শিক্ষা শেষ করা যুবক-যুবতী। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল তাদের রাজনৈতিক মনোভাব ও ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অতীতের দৃষ্টান্তও সামনে আনছেন। নব্বইয়ের দশকে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচন ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র সংসদ নির্বাচন, যেখানে ছাত্রদল নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করেছিল। অথচ ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পক্ষে দেশজুড়ে একটি গণজোয়ার তৈরি হয়েছিল। তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। সে সময় ডাকসু নির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। তখন তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন সীমিত ছিল; মানুষ প্রধানত বিটিভি, রেডিও ও পত্রিকার ওপর নির্ভর করত। সংবাদ ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগত। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে মুহূর্তের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ে, যা জনমত গঠনে আরো দ্রুত ও গভীর প্রভাব ফেলছে।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইকতেদার আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন একেবারে সামনে চলে এসেছে। এর মধ্যেই ডাকসু, জাকসুসহ বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে শিবির সমর্থিত প্যানেলগুলো বেশির ভাগ পদে জয়লাভ করেছে। এর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে- তবে কতটা পড়বে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।’

তিনি আরো বলেন, ‘গত তিনটি নির্বাচনে তরুণ প্রজন্ম কার্যকরভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি। এবার তারা ভোট দিতে আগ্রহী। তরুণরা ইতিবাচক পরিবর্তন চায়, পুরনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে গুণগত রূপান্তর দেখতে চায়। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সেই মানসিকতারই প্রতিফলন।’ তার মতে, টেকসই উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও সুশাসনের প্রত্যাশা থেকেই তরুণরা একটি নির্দিষ্ট ধারার প্রতি আস্থা দেখিয়েছে। আগামী নির্বাচনে এই তরুণ ভোটারদের ভূমিকা পুরো ফল পাল্টে না দিলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। অন্য দিকে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, যারা বলছেন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না, তারা হয়তো নিজেদের বিজয় নিশ্চিত ভেবেই এমন মন্তব্য করছেন। তিনি বলেন, “তারেক রহমান নিজেই বলেছেন তরুণ প্রজন্ম তাদের সাথে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলকে বাদ দিয়ে বিকল্প শক্তিকে বেছে নিয়েছে। দেশে বর্তমানে চার কোটির বেশি তরুণ ভোটার রয়েছে। তারা শুধু ভোটারই নয়, পরিবার ও সমাজের ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। ফলে তরুণ ভোট আগামী নির্বাচনে বিজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো: রবিউল ইসলাম কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তার মতে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব নাও ফেলতে পারে, তবে কিছুটা প্রভাব পড়বে- এটা অস্বীকার করা যায় না। তিনি বলেন, “পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসে। তারা প্রত্যেকেই একটি পরিবারের অংশ। চায়ের দোকান, মুদি দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এসব নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এসব আলোচনা মানুষের মনোজগতে প্রভাব ফেলছে, যা জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হতে পারে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান জামি আরো দৃঢ়ভাবে মনে করেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল আগামী জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এসব ফলাফল মুহূর্তের মধ্যেই সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। মানুষ পাড়া-মহল্লার চায়ের টেবিলে এসব নিয়ে আলোচনা করছে, বিশ্লেষণ করছে। এর একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।’ পাশাপাশি তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ভোট দিয়েছে, তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পরিবারে ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করবে। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রজন্ম আরো সচেতন, প্রযুক্তিসম্পন্ন এবং পরিবর্তনমুখী। তাদের চিন্তার সাথে যাদের রাজনীতির মিল রয়েছে, তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়ী হচ্ছে এবং জাতীয় নির্বাচনেও এই তরুণ ভোট বড় ভূমিকা রাখতে পারে।