Image description

রাজধানীর একটি স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম। নিয়মিত অধ্যয়ন করলে ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল অনার্স। প্রথম কয়েকটি সেমিস্টারে ভালো ফলও করেছিলেন আরিফুল। এরপর ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন জুয়ার নেশায়। বর্তমানে নিজ জেলায় থাকেন। বেকার অবস্থায় চাকরির সন্ধান করে বেড়াচ্ছেন। মানবজমিনকে তিনি বলেন, আমরা মেসে আটজন ছিলাম। নতুন ঢাকায় এসে নিয়মিত ভার্সিটি যেতাম। কিন্তু মেসের সবার সঙ্গে থাকতে থাকতে বাজিতে জড়িয়ে পড়ি। যখন টাকা পাই এসব টাকা চলে যায়। কিন্তু যখন কোনো ম্যাচে হারতাম জিদ কাজ করতো টাকা উঠানোর। এভাবে করে অনেক টাকা হেরেছি। প্রথমে ভার্সিটির সেমিস্টারের টাকা দিয়ে বাজি খেলতাম। টাকা যে পেতাম না তা নয়। কিন্তু পাওয়া টাকা থাকতো না। বাবা-মায়ের কাছে নানা মিথ্যা কথা বলে টাকা নিতাম।

আরিফুল বলেন, আমার মা দীর্ঘদিন কিডনির সমস্যায় ভুগে মারা গেছেন। মায়ের চিকিৎসা আমাদের দুই ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ চালানো আব্বুর জন্য মুশকিল হয়ে পড়ে। এরপর আমাদের বাজারের একটা জায়গা বিক্রি করা হয়। প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এই টাকা দিয়ে আপুর বিয়ের খরচ, আম্মুর চিকিৎসা চলে। আমি এই টাকা থেকেও প্রায় চার লাখ টাকা নষ্ট করি, ভার্সিটির বিভিন্ন কথা বলে। আম্মু মারা যাওয়ার পর আমি বাড়ি চলে আসি। এক বছর হলো বাড়িতে থাকি, কিন্তু এখনো আব্বু বা কেউ জানে না যে আমি ভার্সিটিটাই শেষ করতে পারি নাই। এখন না পারছি কোনো সাধারণ কাজ করতে, না পারছি কোনো যোগ্য চাকরি জোটাতে।

আরিফুলের মতো অনেক শিক্ষার্থীরই জীবনে নেমে এসেছে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। জুয়ার কারণে লেখাপড়া শেষ করতে না পারা তাদের চারজনের সঙ্গে কথা হয়। তারা বন্ধু, একই কলেজ থেকে একই সঙ্গে এইচএসসি শেষ করেন। তাদের দু’জন ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং আর দু’জন রংপুর কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় কীভাবে জড়ালেন জুয়ায়? তারা জানান, মূলত আইপিএল ও বিপিএল খেলায় বেশি বাজি ধরা হয়। কিছু নিশ্চিত ম্যাচে টাকা আয়ের সুযোগ বেশি থাকে। পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা দলের সঙ্গে নিচের দলের খেলা হলে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে ১৫শ’ থেকে ২ হাজার টাকা আয় করা যায়। এভাবে কিছু রিস্ক ফ্রি ম্যাচে আয়ের মাধ্যমে নেশায় পরিণত হয়। নেশা যখন চেপে বসে তখন, প্রতি ম্যাচে কখন ওভারে, টস এমনকি জোড়-বিজোড় নিয়েও বাজি ধরা শুরু হয়। একটা সময় বাজির টেনশনে প্রত্যেকেই মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

চারজনের একজন বলেন, আমি ২০১৬ সালের টি- টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ডকাপে টানা হারা শুরু করি। ধার করে কয়েক হাজার টাকা হারাই। এই টাকা উঠানোর জন্য ভারত-নিউজিল্যান্ড ম্যাচে ২০ হাজার টাকায় আমার মোবাইল বন্ধক রাখি। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে শক্তিশালী ভারত হেরে যায়। আমার তখন প্রায় ৩৫/৩৬ হাজার টাকা ঋণ। মোবাইলটাতো যায়। টাকা সময়মতো না দিতে পারায় মারধর করা হয়। আমার বাবাকে ফোন দিয়ে বলে, মেয়ে নিয়ে ধরা খেয়েছি। টাকা না দিলে ছাড়া হবে না। আমার বাবা টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এরপর আমাকে রংপুরের মেস ছাড়িয়ে দেই। কলেজে আর যাওয়া হয় নাই। লেখাপড়াও আর হয়নি।

এই জুয়াগুলো এতোটাই নিয়ন্ত্রিত যে, যেকোনো অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গেও ধরা যায়। তারা খেলার আগে একটা রেট ঠিক করেন। লেনদেনের বিপরীতে তা উঠা-নামা করে। তাদের বিপরীতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ টাকা তারা নেন। এ নিয়েও রয়েছে ব্যাপক সমস্যা। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার এক ছেলে পরিচিতজনের কাছে টাকা জমা না নিয়েই বাজি ধরেছিলেন। এরপর সেই টাকা দিতে না পারায় প্রতিপক্ষ বাড়িতে হামলা পর্যন্ত চালায়। তিনি বলেন, ২০২২ সালের ঘটনা। আমার কাছে ২৩ হাজার টাকা পেতো। এরপর আমি আমার ছাগল নিয়ে যায়। আমি বাধ্য হয়ে আমার গরু বন্ধক রেখে টাকা পরিশোধ করি। কিন্তু আমার ছাগলটা তারা খেয়ে নেয়।

নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে এই প্রবণতাটা বেশি। রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে নিয়মিত দেখা মেলে এই চিত্র। রাজধানীর ৬০ ফিট এলাকার একটি সেলুনে টিভিতে চলছিল বিপিএল খেলা। সেলুনে কাজ করেন নরেশ। তিনি রোববারের একটি খেলায় এক হাজারের বিপরীতে ১২শ’ টাকা বাজি ধরেন। তিনি বলেন, এইবার আমার এখনো ৬ হাজার টাকা লস। এই টাকা উঠান লাগবো। তিনি আরও বলেন, কত মানুষ যে, ধ্বংস হইছে। আমার এক ভাই, সেলুনের জায়গা বেইচা দিছে। এখন মানুষের দোকানে কাজ করে। আরেক ব্যক্তি বলেন, আমার ১২ হাজার টাকা লস হইছিলো। আমি বউয়ের আংটি বিক্রি করে সেই টাকা পরিশোধ করেছি। আশরাফুল নামে সেই ব্যক্তি বলেন, বাজির টাকা কারও কাছে থাকে না। খরচ হয়ে যায়। আমি চট্টগ্রামে রিকশা চালাইতাম। এরপর ধার-দেনা হওয়ার কারণে ঢাকায় চলে আসছি। এখন এই টাকা শোধ না করে আমি এলাকাতেও যেতে পারি না। কেন বারবার ধরেন বাজি? এর জবাবে সবার উত্তর, এটা নেশা। একবার পা দিলে আর ছাড়া যায় না।

সরকারি হিসেবে দেশে ৫০ লাখ মানুষ জুয়ায় আসক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে। খেলার পেজ বা অ্যাপে দেয়া হয় চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে জুয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। ফাঁদে পড়ে অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার। অনলাইন জুয়ার সাইট বা বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে টেক জায়ান্ট গুগল, ফেসবুক ও টিকটককে আলাদা চিঠি দিয়েছে বিটিআরসি। গত বছরের ৩রা নভেম্বর পাঠানো চিঠিতে, পারিবারিক বিরোধ, আত্মহত্যাসহ আর্থিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে পর্নোগ্রাফি ও অনলাইন জুয়াকে দায়ী করা হয়। ডিজিটাল প্লাটফর্ম ছাড়া মোবাইল অপারেটর, এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইন জুয়া বন্ধে কঠোর নজরদারি ও ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান মানবজমিনকে বলেন, সিআইডি’র সেন্টারের পেট্রোলিং টিম আছে। তারা ২৪ ঘণ্টাই এসব বিষয় মনিটরিং করেন। মনিটরিং করার সময় জুয়ার সাইট শনাক্ত করলে সেটি বন্ধের জন্য বিটিআরসিকে চিঠি লিখেন। বিটিআরসি চিঠির প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়। এছাড়া কোনো ভুক্তভোগী যদি মামলা করতে চায় তবে সেটি আমলে নিয়ে সিআইডি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসে।