‘কোনো তদন্ত ছাড়াই আমারে রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেট কোনো তদন্ত রিপোর্ট পায়নি।’ প্রিজন ভ্যানে ওঠার আগে গণমাধ্যমের সামনে এভাবে আর্তনাদ করছিলেন জুলাইযোদ্ধা তাহমিনা জান্নাত সুরভী। বেশি শব্দের কারণে পরের কথাটি স্পষ্ট বোঝা না গেলেও একটু পরেই শোনা গেল ‘....উপর মহলের চাপ আছে এই জন্য।’
আজ সোমবার (৫ জানুয়ারি) গাজীপুরের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ১৭ বছর বয়সী সুরভীর ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের পরপ্রিজন ভ্যানে ওঠার আগের দৃশ্য এটি। জন্ম নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী, ১৭ বছর ১ মাস ৭ দিন বয়সী সুরভীকে ২১ বছর বয়সী দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার পর খুব দ্রুততার সঙ্গে প্রিজন ভ্যানে ওঠাতে ব্যতিব্যস্ত পুলিশ সদস্যদের তোড়জোড়ের মধ্যেই কথাগুলো বলেন তিনি। প্রিজন ভ্যানে ওঠার পর সুরভী বলেন, তার মামলায় চারজন আসামী থাকলেও কেবল তাকেই গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রিজন ভ্যানে ওঠার আগে আরেকটি অভিযোগ করেন সুরভী। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মাকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, ‘মা... ওই ফারুক আছে না? ফারুক রিমান্ডে চাইছে ওকে টাকা দিই নাই এজন্য।’
ফারুকের পুরো নাম মো. ওমর ফারুক। তিনি গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার অন্তর্গত মৌচাক পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) ও সুরভীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। তবে সুরভীর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। জানতে চাইলে এসআই ওমর ফারুক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এর কোনো ভিত্তি নেই।
১৭ বছরের কিশোরীকে ২১ বছর বয়স দেখানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, মামলার বাদির বর্ণনা অনুযায়ী ২১ বছর দেখানো হয়েছে। তবে বাদি মামলার এজাহারে সুরভীর বয়স ২০ বছর উল্লেখ করেছে জানালে তিনি বলেন, ‘তাহলে এজাহারটা দেখতে হবে। আর আমরা জন্ম সনদ চেয়েছি। চার্জশিটে বয়স ঠিক থাকবে।’
বাংলাদেশের শিশু আইন-২০০৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী সকলেই শিশু হিসেবে গণ্য হবে এবং তাদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে শিশু আদালতে। এ ক্ষেত্রে তাদের কারাগারে রাখার বিধান নেই, সুযোগ নেই রিমান্ডে নেওয়ারও। কিন্তু সুরভীর ক্ষেত্রে আইনের অনুসরণ করা হয়নি। আইনের বিষয়টি উল্লেখ করে তাকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেওয়া, কারাগারে প্রেরণ এবং রিমান্ডে নেওয়া হলো কেন তা জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। তবে আগেও জন্ম সনদ চাইলেও পাননি বলে জানিয়েছেন।
এর আগে দুপুরে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার নাসির উদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আসামীর বয়স ২১ নাকি ১৭, সেটির সত্যতার বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। আমার এ থানায় জয়েনিং হয়েছে মামলাটি এন্ট্রি হওয়ার পরে। আর এটি এখনো তদন্তাধীন। বাদী এজাহারে যে বয়স উল্লেখ করেছে, আসামির বয়স পুলিশ সেভাবেই হয়তো রেকর্ড করেছে। যদি উনার বয়স কম হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে বিষয়টি আইন দেখবে।
সুরভীর মামলা ও রিমান্ডের বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সুরভী তার মাকে জানিয়েছে ওমর ফারুক তার কাছে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট তদন্ত ছাড়াই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটি মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে ওই পুলিশ সদস্য।
তিনি বলেন, অভিযুক্ত এই এসআই কবে চাকরিতে যোগদান করেছেন, গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী ধরনের এবং জুলাই মাসে তার ভূমিকা কী ছিল। এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দেখা হোক।