Image description
বিএনপি ও জামায়াত বলয়ের কাছাকাছি অবস্থান : ভোটে প্রভাব বিস্তারে এনসিপির জোটবদ্ধতা কার্যকর, কিন্তু চরমোনাইয়ের সম্ভাবনা সীমিত

ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে তার কেন্দ্রে রয়েছে বিএনপি ও জামায়াত এবং তাদের সম্ভাব্য জোট কাঠামো। দীর্ঘ দুই দশকের কাছাকাছি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এখন আবার জনমত জরিপে শীর্ষ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পথ সহজ নয়, কারণ জোট রাজনীতিই এখন বিএনপির জন্য একই সাথে সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

অন্যদিকে নতুন মেরুকরণে অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ঘিরে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য জোটরাজনীতি। দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ও প্রান্তিক অবস্থায় থাকা জামায়াত এখন জনমত জরিপে দ্বিতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসায় তাদের জোটনীতি একই সাথে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলছে, আবার গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটও তৈরি করছে। নির্বাচনী সমঝোতা তৈরির ক্ষেত্রে এনসিপিকে কাছে পাওয়া তাদের জন্য অর্জন, আবার চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনের সাথে আসন বণ্টন নিয়ে বিরোধও সামনে চলে এসেছে। যদিও বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, ভোটে প্রভাব বিস্তারে এনসিপির জোটবদ্ধতা কার্যকর কিন্তু চরমোনাইয়ের দলের প্রভাব বিস্তারের সীমিত সম্ভাবনা রয়েছে। জরিপে ইসলামী আন্দোলনের চেয়ে দ্বিগুণ সমর্থন দেখানো হচ্ছে এনসিপিকে।

মেরুকরণের পটভূমি : ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের কারণে আওয়ামী লীগ কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে নির্বাচনটি পরিণত হয়েছে ‘পোস্ট-আওয়ামী’ রাজনৈতিক পর্বের প্রথম বড় পরীক্ষাতে। এই শূন্যতায় বিএনপি স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার প্রধান দাবিদার। জনমত জরিপে দলটির সমর্থন ৩৯ থেকে ৪৩ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। কিন্তু এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিএনপিকে নির্ভর করতে হচ্ছে জোট রাজনীতির ওপর। আর এখানেই শুরু হচ্ছে মেরুকরণের জটিলতা।

কেন বিএনপি জোট এখনো শক্তিশালী : এক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। দীর্ঘ আন্দোলন, কারাবরণ ও দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা বিএনপিকে জনগণের চোখে একটি ভিকটিমাইজড কিন্তু টিকে থাকা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফলে বিভিন্ন ছোট দল ও ইসলামী শক্তি বিএনপিকে জোটের নেতৃত্বে দেখতে আগ্রহী।

এ ছাড়া বিএনপির রয়েছে বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি। বিএনপির ভোটব্যাংক গ্রাম-শহর, মধ্যবিত্ত-নি¤œবিত্ত, ব্যবসায়ী-শ্রমিক-সবখানেই বিস্তৃত। এই বৈচিত্র্য জোট রাজনীতিতে বিএনপিকে স্বাভাবিকভাবে শীর্ষ দল বানিয়েছে।

জোট ছাড়াও নেতৃত্বের ক্ষমতা রয়েছে বিএনপির। দলটি এমন একটি অবস্থানে আছে যেখানে তারা নির্বাচনের পর জামায়াতকে নিয়ে জোট করতে পারে, আবার প্রয়োজনে দূরত্বও বজায় রাখতে পারে। এই কৌশলগত স্বাধীনতা অন্য কোনো দলের নেই।

আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রেও বিএনপি এগিয়ে। এখনো পশ্চিমা বিশ্ব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে বিএনপি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি বিকল্প। এটি জোট রাজনীতিতে বিএনপির জন্য বড় কূটনৈতিক পুঁজি।

জোট মেরুকরণের ঝুঁকি : জামায়াত ইস্যুতে দ্বিধা এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। বিএনপির জোটরাজনীতির সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো জামায়াতকে কতটা ও কিভাবে যুক্ত করা হবে- এই প্রশ্ন। জামায়াত ছাড়া সরকার গঠন বিএনপির জন্য কঠিন হতে পারে, কিন্তু জামায়াতকে দৃশ্যমানভাবে সাথে নিলে আন্তর্জাতিক চাপ ও মধ্যপন্থী ভোটার হারানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই দ্বন্দ্ব বিএনপির ভেতরেও মতভেদ তৈরি করছে।

নতুন রাজনৈতিক শক্তির সাথে দূরত্ব বিএনপির জন্য একটি সমস্যা। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বা জুলাই অভ্যুত্থান-উত্তর তরুণ নেতৃত্বাধীন দলগুলো বিএনপির সাথে একই জোটে থাকতে অনাগ্রহী। ফলে বিএনপি যদি পুরনো জোট কাঠামোতে আটকে থাকে তবে নতুন ভোটার ব্লক হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

অতিরিক্ত মেরুকরণে নির্বাচনী ঝুঁকিও রয়েছে। নির্বাচন যদি ‘বিএনপি বনাম ইসলামপন্থী জোট’ বা ‘ইসলাম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’ দ্বন্দ্বে রূপ নেয়, তবে শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটার বিমুখ হতে পারে, ভোটের অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে যা বিএনপির সম্ভাব্য বিজয়কেই দুর্বল করবে।

এছাড়া জোট শাসনের ভবিষ্যৎ সঙ্কটও একটি বিবেচ্য বিষয়। নির্বাচনে জিতলেও বড় জোট নিয়ে সরকার চালানো- নীতিগত সমঝোতা; মন্ত্রিসভা বণ্টন ও সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্য-এসব ক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, কোন পথে বিএনপি : বিএনপির সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ স্পষ্ট-

ক. নিয়ন্ত্রিত জোট : জামায়াতের সাথে বোঝাপড়া থাকবে, কিন্তু দৃশ্যমান জোট নয়। খ. দ্বিস্তরীয় জোটনীতি : নির্বাচনী জোট একরকম, সরকার গঠনের সময় আরেকরকম। গ. কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পুনঃস্থাপন : ‘বিএনপি প্রথম, জোট দ্বিতীয়’-এই বার্তা স্পষ্ট করা। এই তিনটির সমন্বয়ই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু ক্ষমতায় ফেরার লড়াই নয়; এটি তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা প্রমাণের নির্বাচন। জোট মেরুকরণ বিএনপিকে ক্ষমতার দরজায় পৌঁছে দিতে পারে, আবার ভুল হিসাব পুরো সম্ভাবনাকেই বিপন্ন করতে পারে।

শেষ বিচারে প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি জোটকে ব্যবহার করবে ক্ষমতায় যেতে, নাকি জোটই বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

জামায়াত জোটের মেরুকরণ : সঙ্কট ও সম্ভাবনা : ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সম্ভাব্য জোটরাজনীতি। দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থায় থাকা জামায়াত এখন দ্বিতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসায় তাদের জোটনীতি সম্ভাবনার পাশাপাশি গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটও তৈরি করছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে আওয়ামী লীগ কার্যত মূলধারার বাইরে চলে যাওয়ায় রাজনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ক্ষমতার শূন্যতা। এই শূন্যতার মধ্যে বিএনপি প্রধান শক্তি হলেও জামায়াত দ্রুত নিজেদের সংগঠিত ভোটব্যাংক, মাঠপর্যায়ের কাঠামো ও আদর্শিক ঐক্যের কারণে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

জনমত জরিপে জামায়াতের সম্ভাব্য ভোটসমর্থন ২৬ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে দেখানো হচ্ছে। যা তাদেরকে জোট রাজনীতিতে কিংমেকার অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এর সাথে এনসিপি ও অন্যান্য ইসলামী দলের ভোট হার যুক্ত হলে বিএনপির সমপর্যায়ে চলে যায়।

কেন জামায়াত জোটের কেন্দ্রবিন্দু : শক্ত সংগঠিত ভোটব্যাংক জামায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের ডিসিপ্লিনড ও আদর্শভিত্তিক ভোটার। অন্য অনেক দলের ভোটার যেখানে পরিস্থিতিনির্ভর, সেখানে জামায়াতের ভোটার তুলনামূলকভাবে স্থায়ী।

জোটে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা রয়েছে যথেষ্ট। বিএনপি ও জামায়াত এখন সরকার গঠনে সম্ভাব্য প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি। দুই দলের নেতৃত্বাধীন জোট অবয়ব নিলে যে কোন পক্ষের সরকার গঠনের মতো ফলাফল করা অসম্ভব হবে না। ফলে অন্য দলগুলোর পক্ষে বিএনপি বা জামায়াতকে উপেক্ষা করে সরকারের অংশ হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এতে জামায়াত আসন সমঝোতা, মন্ত্রিসভায় অংশগ্রহণ, নীতিগত ছাড় (পিআর পদ্ধতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ইস্যু)- এসব বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

ঐক্য সরকারের ধারণা নিয়েও এখন আলোচনা হচ্ছে। জামায়াতের নেতৃত্ব থেকে ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’-এর প্রস্তাব রাজনৈতিকভাবে কৌশলগত। এটি তাদেরকে ক্ষমতালোভী নয়, বরং স্থিতিশীলতার অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে যা দেশী ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

জোট মেরুকরণের ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা : সমঝোতা বা সরকারে জামায়াতকে সাথে নেয়া নিয়ে বিএনপির ভেতরেই স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে। একাংশ মনে করে, জামায়াত জোটে থাকলে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে আর অন্য অংশ মনে করে, জামায়াত ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন। এই দ্বিধা জোটকে দুর্বল ও অস্থির করে তুলতে পারে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো নতুন রাজনৈতিক শক্তির দলগুলোর ভেতরে জামায়াতের সাথে জোট নিয়ে বিদ্রোহ ও বিভাজন দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও সামনে আসছে। পশ্চিমা শক্তি ও কিছু আঞ্চলিক অংশীদারের কাছে জামায়াত এখনো সংবেদনশীল নাম। জোটে জামায়াতের দৃশ্যমান আধিপত্য- আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, অর্থনৈতিক কূটনীতি ও মানবাধিকার ইস্যু- এসব ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত মেরুকরণকেও সঙ্কট হিসেবে দেখানো হচ্ছে। জামায়াতকে কেন্দ্র করে নির্বাচন যদি ‘ইসলাম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’ দ্বন্দ্বে রূপ নেয়, তাহলে মধ্যপন্থী ভোটার সরে যেতে পারে এবং ভোটার অংশগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কৌশলগত হিসাব, জামায়াতের সামনে কোন পথ : জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল হলো- আধিপত্য নয়, অংশীদারিত্বের রাজনীতি, জোটে নীতিগত প্রভাব বাড়ানো, কিন্তু প্রকাশ্য নেতৃত্বে সংযম এবং পিআর পদ্ধতি বা সংসদীয় সংস্কারকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ করা। এই পথে গেলে তারা পরাজিত না হয়েও রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোর অংশ হতে পারে।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচন জামায়াতের জন্য শুধু একটি ভোটের লড়াই নয়- এটি তাদের রাজনৈতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরীক্ষা। জোট মেরুকরণে জামায়াতের সামনে যেমন রয়েছে ক্ষমতার দরজা খোলার সম্ভাবনা, তেমনি রয়েছে অতিরিক্ত উচ্চাকাক্সক্ষায় সেই দরজাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই- জামায়াত কি ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠবে, নাকি মেরুকরণের বোঝা টানতে গিয়ে নিজের সম্ভাবনাকেই সঙ্কুচিত করবে?

জনমত জরিপে ভোটারের পছন্দ ও প্রবণতা

সর্বশেষ জরিপভিত্তিক প্রধান প্রধান দলের সমর্থন পর্যালোচনায় দেখা যায়- বিএনপি ভোটারের বড় অংশের সমর্থন পাচ্ছে এবং বেশির ভাগ সার্ভেতে দলটি প্রথম অবস্থানে আছে- প্রায় কমবেশি ৪১ শতাংশ সমর্থন দেখাচ্ছে। বিভিন্ন পেশাভিত্তিক জরিপেও দেখা গেছে, ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে বিএনপির সমর্থন বেশি।

জামায়াতে ইসলামী অনেক জরিপে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করছে (প্রায় কমবেশি ৩২ শতাংশ পর্যন্ত)। নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটি কামব্যাক করছে ও ভোটব্যাংক শক্তিশালী করছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তরুণ/ছাত্র শ্রেণীর সমর্থন পাচ্ছে কিন্তু সামগ্রিক ভোটে তুলনামূলক কম (৪-৫ শতাংশ) দেখা যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মতে, দলটির অনেক নিজস্ব সমর্থক মনে করছে তারা জামায়াত-সহযোগিতায় স্বাভাবিক পরিচয় হারাচ্ছে, যা সমর্থনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জামায়াত জোটে থাকার পক্ষ সমর্থন করেছে।

আওয়ামী লীগ নতুন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ এবং জরিপে এখন দলটির আর আগের অবস্থান নেই। কিছু জরিপে আংশিক সমর্থন পাওয়া হলেও তা খুব কম (১৯ শতাংশ)। আওয়ামী লীগ ভোট বর্জনের ডাক দিলেও সাধারণ মানুষের জনমত জরিপে ৮৬-৮৭ শতাংশ ভোটার মনে করেন নির্বাচন সময় মতো ফেব্রুয়ারিতে হওয়া উচিত এবং ৯৪ শতাংশ ভোট দিতে চান অর্থাৎ ভোটে অংশগ্রহণের ইচ্ছা ব্যাপক আর তাতে আওয়ামী লীগের আহ্বানের কোনো প্রভাব নেই।

সামগ্রিক জনমত জরিপ : দলভিত্তিক অবস্থান (সঙ্কলিত গড়)

(বিভিন্ন জরিপ: টিবিএস, রয়টার্স উদ্ধৃত জরিপ, এনডিটিভির বিশ্লেষণ, স্থানীয় থিংকট্যাংক-২০২৫ শেষ ভাগ)

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: জনগণ নির্বাচন চায়, কিন্তু একক দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার বদলে ভারসাম্যপূর্ণ সরকারের পক্ষে ঝুঁকছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়-এখনকার জনমত জরিপ অনুসারে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলে বিএনপি সবচেয়ে এগিয়ে, জামায়াত দ্বিতীয় শক্তি। ভোটাররা চাইছে অংশগ্রহণমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ সরকার।

জনমত জরিপে জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দলের অবস্থান : ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) মতো প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুসারে-জামায়াতে ইসলামী প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ ভোটার সমর্থন পাচ্ছে নির্বাচনে, যা বিএনপির পরে দ্বিতীয় স্থান দেখাচ্ছে। একই জরিপ অনুসারে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই)-এর মতো অন্যান্য ইসলামী দলগুলো মিলিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ৩-৫ শতাংশ পর্যন্ত সমর্থন থাকতে পারে।

অর্থাৎ সাধারণ জনমতের ভিত্তিতে ইসলামী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে জামায়াতের অবস্থান ১:৬। এনসিপির ৩০ আসন বাদ দিলে ২৭০ আসনে জামায়াত এই হিসাবে ২৩১টি আসনে এবং ইসলামী দলগুলো ৩৮টি আসনে প্রার্থী দিতে পারে। বাস্তবে যতদূর জানা যায় তাতে জামায়াত ১৯০টি নিজের কাছে রেখে বাকি দলগুলোকে ১১০টি আসন দিতে চায়। এতে এনসিপি ৩০ এবং অন্য দলগুলো ৮০টি আসন পায়। সর্বশেষ খবর অনুসারে চরমোনাইয়ের দল এককভাবে ৭০ থেকে ৮০টি আসন চাইছে।

জামায়াতের জন্য সমস্যা হলো এভাবে আসন ছাড়া হলে সেসব আসনে জেতার সম্ভাবনা একবারে কমে যাবে। একই সাথে পিআর ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে জামায়াতের আসন নি¤œ পর্যায়ে চলে আসবে। এ বিবেচনায় জামায়াত ৪০ এর বেশি আসন ইসলামী আন্দোলনকে দিতে আলোচনায় আগ্রহী নয় বলে জানা যাচ্ছে।

জনমত জরিপে ইসলামী আন্দোলনের সামগ্রিক অবস্থান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, দলটির আনুমানিক ভোট সমর্থন ২-৪ শতাংশ। জাতীয় পর্যায়ে আসন সম্ভাবনা সীমিত বলা যায়-জোট ছাড়া একপ্রকার কঠিন। এর ভোটব্যাংকের ধরন নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক। আর জরিপ অনুসারে মূল বাস্তবতা ইসলামী আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে ম্যাস পার্টি নয়, তবে কিছু অঞ্চলে তারা স্থিতিশীল কোর ভোট ধরে রেখেছে। এতে স্পষ্ট হয় যে-ইসলামী আন্দোলন জামায়াতের বিকল্প নয়, বরং একটি ক্ষুদ্র পরিসরের আইডিওলজিক্যাল শক্তি।

নির্বাচন-সম্পর্কিত উদ্বেগ : নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে জামায়াত কিছু সতর্কতাও প্রকাশ করেছে। তারা বিশ্বাস করে যে পুরো ভোট-প্রক্রিয়া সত্যিই ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ হবে কি না তা নিয়ে দলটির প্রশ্ন রয়েছে। সংঘর্ষ, হামলা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্বাচনী পরিবেশে বাধা আসতে পারে। এটি একটি জনমতভিত্তিক উদ্বেগও। কয়েকটি সামাজিক-গবেষণা জরিপে ৮০ শতাংশ ভোটার মনে করেছেন ভোট ‘মুক্ত ও অবাধ’ হবে। কিন্তু ইসলামী দলগুলো কিছু নির্দিষ্ট ইস্যুতে সংশয় প্রকাশ করেছে।

এত কিছুর পরও জামায়াত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণে উদ্যোগী ও অনড়। জামায়াতে ইসলামী মনে করছে নির্ধারিত ফেব্রুয়ারি-২০২৬ নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত এবং তারা এই নির্বাচনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান দেখাচ্ছে। দলটির অবস্থান সংস্কারের পক্ষে জোরালো এবং গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেয়ার পক্ষে।

জামায়াতে ইসলামী জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনে আগ্রহী এমন বক্তব্য দিয়েছে এবং বিভিন্ন দলের সাথে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও রয়েছে। দলটি মনে করে দেশের স্থায়িত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একক শক্তির পরিবর্তে অন্য দলগুলোর সাথে কাজ করতে হবে। জামায়াত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো নতুন দলগুলোর সাথে নির্বাচনী সমঝোতা ও জোট গড়ে তুলেছে, যা ভোটব্যাংককে প্রভাবিত করতে পারে।