Image description

গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর রোডের এক নম্বর বাড়িটির নাম ‘ফিরোজা’। ২০১০ সালের স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের  বাসভবন থেকে উচ্ছেদের পর সেই ভাড়া বাড়িটিতেই উঠেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ দেড় দশক এই ফিরোজাতেই নিঃসঙ্গ জীবন কাটান সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। সেই ‘ফিরোজা’ এখন একেবারে নীরব, নিস্তব্ধ, সুনসান। গত ২৩শে নভেম্বর রাতে এই ফিরোজা থেকেই অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। দীর্ঘ ৩৭ দিনের লড়াই শেষে চলে যান না ফেরার দেশে। এরপর আর ফিরোজায় যেতে পারেননি তিনি।

হাসপাতাল থেকে কফিনবন্দি তার মরদেহ নেয়া হয়েছিল ফিরোজা সংলগ্ন বড় সন্তান তারেক রহমানের বাসভবনে। সেখান থেকেই খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় দেয়া হয়।  ফিরোজার নিরাপত্তা কর্মীরা এখনো পাহারা দিচ্ছেন বাড়িটি। প্রহরী ছাউনি রয়েছে ঠিক আগের মতোই। বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের অনেক স্মৃতি এই বাসায় লেগে আছে। যারা বাড়ির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত তাদের আবেগ-অনুভূতিও রয়েছে উনাকে ঘিরে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে যারা দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময়ে বিশেষ করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে ভালোবাসার পরশ নিয়ে এখনো আছেন ফিরোজার চারপাশে। চেয়ারপারসনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমিও সেই অনুভূতিটা উপলব্ধি করছি যা ভাষায় প্রকাশ করার এই মুহূর্তে মানসিকতা আমার নেই। সত্যিই এই বাসা যেন ম্যাডামকে এখন দেখি জীবন্ত ম্যাডাম হিসেবে। 

বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)-এর একজন সদস্য বলেন, ‘ম্যাডামের ডিউটি করতাম। আজকে ম্যাডাম নেই, পুরো বাড়িটাই খালি। বাড়ির ভেতরে ঢুকলে কেমন জানি একটা শূন্যতা, কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতা কানে আসে। এই কষ্ট ও বেদনার কথার বলার ভাষা নেই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ম্যাডামকে ভালো রাখেন পরপারে। আরেক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ম্যাডাম সব সময় আমাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। বিকাল অথবা দুপুরে খবর নিতেন আমরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেছি কিনা। উনি ছিলেন আমাদের প্রাণের মা। ফিরোজায় দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তার কর্মীরা বুকে কালোব্যাজ ধারণ করেছেন। তাদের চোখে-মুখে শোকের ছায়া।

এদিকে ফিরোজার পাশের লাগোয়া ১৯৬নং বাসা। এটি খালেদা জিয়ার নামে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার বরাদ্দ দিয়েছিল ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পরে তার পরিবারকে। এই বাড়িটির দলিলসহ কাগজপত্র বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ফিরোজায় এসে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন কয়েক মাস আগে। সেই বাসাটিতে উঠেছেন তার বড় সন্তান বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই বাসার সামনে নিরাপত্তাকর্মীরা যারা দায়িত্বরত তাদের মধ্যেও শোকের ছায়া দেখা গেছে। গুলশান এভিনিউ ডিপ্লোমেটিক জোনের মধ্যপড়ায় সেখানে নেতাকর্মীদের ভিড় সেভাবে নেই। তবে যৎসামান্য যারা আছেন তাদের মধ্যে গুলশানের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন, এই কাছাকাছি থাকি। বিকালে হেঁটে একটু আসলাম এই বাড়ির সামনে। কঠোর নিরাপত্তা দেখতেই পারছেন। ‘ম্যাডাম নেই, এখন ভরসার জায়গাটা তারেক রহমান। সেজন্য এখানে এসে কিছু শোকের সঙ্গী হচ্ছি। জানি লিডারের এই শোক শুধু তার একার শোক নয়, এটা আমাদের সকলের শোক, এটা আমাদের গণতন্ত্রপ্রিয় বাংলাদেশিদের শোক।

এদিকে মায়ের চলে যাওয়ার শোকে আচ্ছন্ন তারেক রহমান। বহস্পতিবার সারাদিন পার করেছেন দোয়া-দরুদ ও নামাজে। বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গতকাল রাতে এবং আজকে বিকাল পর্যন্ত বাসায় ম্যাডামের আত্মার মাগফেরাত কামনায় ইবাদত-বন্দেগিতে ছিলেন। দোয়া-দরুদ, কোরআন তেলোয়াত করেছেন। আত্মীয়স্বজনরা অনেকে বাসায় এসেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সান্ত্বনা জানাতে। সেই সময়ে পারিবারিক পরিমণ্ডলে ম্যাডামের স্মৃতিময় ঘটনার কথা বলেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাদেরকে, আবেগতাড়িত হয়েছেন, শোকাচ্ছন্ন হয়েছেন সেই সময় স্বজনরা তাকে সান্ত্বনাও দিয়েছেন। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বাসা থেকে গুলশান চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আসেন।  

গুলশান কার্যালয়ে শোকের ছায়া:
গুলশান চেয়ারপারসন কার্যালয়ে কালো পতাকা উড়ছে। বিএনপি’র পতাকা এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হয়েছে। এখানে শোক বই খোলা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনীতিবিদরা আসছেন তাদের শোক জানাতে। বৃহস্পতিবার সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ,  যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্যা এফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছীনা দরবার শরিফের পীর মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। পরে এসব অতিথি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সন্ধ্যার পর গুলশান কার্যালয়ে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমান, জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান, শিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। পরে তারা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গুলশান কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, কার্যালয়ের বাইরে নেতাকর্মী ও গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড়। যারা শোক বইতে স্বাক্ষর করতে যাবেন তাদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে।

রাস্তার দুই ধারেই কর্মীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বনানী যুবদলের কর্মী আলতাফ হোসেন বলেন, ‘নেত্রী নাই, মনটা ভালো নেই। কতোদিন এই নেত্রীর দূর থেকে দেখে নিজে শক্তি সঞ্চয় করেছি, শত নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যে আশা দেখেছি সেই নেত্রী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন এই শোক কীভাবে কাটাবো জানি না। কৃষক দলের সহ-সভাপতি ভিপি ইব্রাহিম বলেন, ম্যাডামের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই আল্লাহর হুকুম। তবে একটা ঠিক বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ম্যাডামের জনপ্রিয়তার রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারবে না। তিনি চলে গেছেন ঠিকই তবে তিনি আমাদের মনের ভেতরে থাকবেন চিরঞ্জীব হয়ে সবসময় প্রতিক্ষণে। উল্লেখ্য, বিএনপি চেয়ারপারসন  ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩০শে ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ৩১শে ডিসেম্বর মানিক মিয়া এভিনিউতে ঐতিহাসিক জানাজা শেষে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।