Image description

গাজীপুরে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হয়েছেন সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় ধারণা করা হয়েছে বিকেলে চাঁদাবাজি নিয়ে লাইভকে কেন্দ্র করে রাতে তাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে এমন তথ্য উঠে এসছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। তবে তাকে হত্যার পিছনে চাঁদাবাজি নিয়ে লাইভ করার বিষয়টি সত্য নয় বলে নিশ্চিত হওয়া যায় পুুলিশ এবং সিসিটিভির ফুটেজ থেকে। এছাড়াও জনপ্রিয় ফ্যাক্ট চেকার প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্ট ওয়াচের অনুসন্ধানেও ‘চাঁদাবাজি নিয়ে লাইভ করার জেরে খুনের’বিষয়টিকে ভুয়া দাবি করা হয়।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, প্রতিদিনের কাগজের সাংবাদিক মোঃ আসাদুজ্জামান তুহিনের ফেসবুক আইডিটি সনাক্ত করে দেখা গেছে, ওই দিনে কিংবা নিকট অতীতে তিনি চাঁদাবাজি সম্পর্কিত কোনো লাইভ বা পোস্ট করেননি।

ফেসবুক প্রোফাইল পর্যালোচনায় ৭ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে তুহিন একটি ‘লাইভ’ ভিডিও করেছেন—কিন্তু সেটি ১ মিনিট ৫ সেকেন্ডের একটি সংলাপবিহীন ক্লিপ, যেখানে কেবল রাস্তার মাঝ দিয়ে যানবাহন ও মানুষজনের চলাচল দেখানো আছে এবং ক্যাপশনে লেখা ছিল ‘যেমন খুশি তেমন রাস্তা পার হওয়ার দৃশ্য। গাজীপুর চৌরাস্তা’। ওই ভিডিওতে চাঁদাবাজির কোনো দৃশ্য বা চুনসানি দেখা যায় না। একই দিনে সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিটে তিনি একটি জলাবদ্ধ ড্রেন ও সন্নিহিত রাস্তার ছবি আপলোড করেছিলেন এবং দুপুর ১টা ৫৮ মিনিটে গাজীপুর চৌরাস্তার বৃষ্টির একটি ১৭ সেকেন্ডের ভিডিও পোস্ট করেন। অর্থাৎ ঘটনার দিনে বিকালে তিনি চাঁদাবাজি নিয়ে কোনো কিছু পোস্ট করেননি।

প্রাথমিকভাবে কিছু প্রতিবেদন চাঁদাবাজির কারণে খুন ঘটার কথা জানালেও পরে সেই প্রতিবেদনগুলো সংশোধন করে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজির কোনো ভিডিও পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর, ক্রাইম) রবিউল ইসলাম বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাদশা মিয়া নামে এক ব্যক্তি চান্দনা চৌরাস্তা মোড়ে এক নারীর সঙ্গে বিবাদে জড়ান। এ সময় বাদশা মিয়া ওই নারীকে আঘাত করেন। তখন একদল দুর্বৃত্ত নারীর পক্ষ নিয়ে ধারালো চাপাতি হাতে বাদশা মিয়াকে আঘাত করলে তিনি দৌড়ে পালিয়ে যান। আর এ ঘটনাটি রাস্তার পাশ থেকে মোবাইলে ভিডিও করছিলেন সাংবাদিক তুহিন। তখন সন্ত্রাসীরা তুহিনকে দেখে ভিডিও মুছে ফেলতে বলে। তবে তুহিন ভিডিও মুছতে অস্বীকার করলে তাকে ধাওয়া দেয় সন্ত্রাসীরা। এসময় তুহিন দৌড়ে পালাতে থাকে। সন্ত্রাসীরাও তার পিছু নিয়ে ধাওয়া করে। এক পর্যায়ে চান্দনা চৌরাস্তার মসজিদ মার্কেটের সামনে একটি দোকানের কাছে সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তুহিনের মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়।’

পুলিশ জানায়, বাদশা মিয়ার গ্রামের বাড়ি শেরপুরে এবং তিনি স্থানীয় রোজ সোয়েটার কারখানায় কাজ করেন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় বাদশা মিয়া শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। বাদশা মিয়া পুলিশকে বলেছেন, ‘ওই মেয়েসহ একটা টিম আছে। ওরা আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে গেছে।’

পুলিশ আরও জানায়, যে নারীটির সঙ্গে বাদশা মিয়ার বিবাদ হয়েছে। ওই নারী মানুষের সঙ্গে কৌশলে সম্পর্ক তৈরি করে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে সব লুটে নেওয়ার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। সিসিটিভি ফুটেজে যাদের দেখা গেছে, তারা সবাই পুলিশের কাছে পরিচিত—গাজীপুর নগরের বাসন, ভোগরা ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় সক্রিয় একটি চক্রের সদস্য হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। ভিডিওতে যে নারীকে দেখা গেছে, তিনিও ওই চক্রের সদস্য হতে পারেন; পুলিশ এ দিকটি তদন্ত করছে।

এদিকে, এ ঘটনায় বাসন থানায় দুটি মামলা দায়ের হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচজনকে আটক করেছে। তবে আটকদের তাৎক্ষণিকভাবে নাম পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

এ বিষয়ে বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন খান জানান, নিহত তুহিনের বড় ভাই মো. সেলিম ও আরেকজন বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা করেছেন। আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে যাচাই চলছে। তাদের সম্পৃক্ততা মিললে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

উল্লেখ্য, নিহত তুহিন (৩৮) দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ পত্রিকার গাজীপুরের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। তিনি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের হাসান জামালের ছেলে। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে তুহিন চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।