Image description

১৪ বছরের নির্মাণ যন্ত্রণা। ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ। ৯৭ শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন। প্রকল্প বাতিল। ঠিকাদারদের হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা। নির্মাণ চলাকালে দুর্ঘটনায় সাত মৃত্যু। টঙ্গীর যানজট বনানীতে নিত্য আসা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মেরুদণ্ড ভঙ্গুর করা— সবকিছুই এক প্রকল্পের ঘটনা। ভয়াবহ এই দুর্ভোগের নাম বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। নির্মাণ জটিলতা, ভুল ভাবনা, ভুল সমীক্ষা, ভুল ভবিষ্যৎ নির্ণয়সহ নানা ভুলে ভরা প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। যাদের কারণে এমন পরিস্থিতি, তাদের চিহ্নিত করতে তদন্ত হবে। পেছনের এই কারিগরদের শাস্তির আওতায় আনতে ভাবছে সরকার।

যে বিশেষায়িত বাস চলাচলের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে করিডরটিকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে এখন। এতে বিআরটির কিছু অবকাঠামো অপসারণ করা হবে। খরচ যাবে ১২০ থেকে ১৩০ কোটি টাকা। আর মহাসড়কে রূপান্তরে লাগবে আরও ৮০ কোটি। তবে অবকাঠামো পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবসান হচ্ছে বিআরটির। কিন্তু শেষ হচ্ছে না সরকারের দায়। স্থানীয় বাসিন্দারা যে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে এতটা বছর পার করল, এই মহাসড়ক থেকে তাদের বঞ্চিত হওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সেই সঙ্গে অর্থায়নকারী বিদেশি সংস্থার ঋণ ও চুক্তির নিষ্পত্তি সরকারকে নতুন করে জটিলতায় ফেলবে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক আদালতে যাচ্ছে বিআরটি নির্মাণের সঙ্গে জড়িত চীনা দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্তের পর চায়না গেজহুবা গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড (সিজিজিসি) ৭৫৮ কোটি এবং জিয়াংসু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ (জেটিইজি) ৪০০ কোটি টাকা সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। সিজিজিসি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে অভিযোগ করেছে। শিগগির এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে।

যদিও সড়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বলা হচ্ছে, যাচাই-বাছাই করে ঠিকাদারদের বৈধ পাওনা পরিশোধ করবে সরকার। তবে অযৌক্তিক দাবি মোকাবিলা করতে সরকারের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে।

দায়ীদের শাস্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে এই সড়কে বিআরটি উপযোগী কি না, তা যাচাই করা হয়েছিল কি না— সেটি তদন্ত করা প্রয়োজন। যারা সম্ভাব্যতা যাচাই করেছেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা উচিত। ভুল সিদ্ধান্ত বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এটি শুধু প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নয়; এটি জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রশ্নও। শাস্তির বিষয়টি আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।’

গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সিদ্ধান্তটি এখন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায়। আলোচনাটি শেষ পর্যন্ত সংসদে গিয়েও গড়াতে পারে। অপসারণ করা হলে, বিআরটির জন্য সড়কে নির্মিত প্রতিবন্ধক ভাঙা হবে। নতুন করে সড়কের মাঝে বিভাজক নির্মাণ করতে হবে। নিচের ১৮টি বাসস্টেশন ভাঙা হবে। উড়াল অংশে থাকা সাতটি স্টেশন ভাঙা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।

২০১২ সালে কাজ শুরু হওয়া ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট)’ ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। কয়েক দফায় মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে সর্বশেষ অনুমোদিত ব্যয় দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সাড়ে ২০ কিলোমিটার করিডর নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে চার কিলোমিটার উড়ালপথ। রয়েছে তুরাগ নদের ওপর ১০ লেনের সেতু, ছয়টি উড়ালপথ, ফুটপাত, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বাস রাখার ডিপো।

এদিকে বিআরটির অর্থায়নে থাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) ঋণ চুক্তির শর্তের কী হবে? এই প্রশ্নের জবাবও সরকারকে খুঁজতে হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের ঋণ ও চুক্তি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে। ঋণ পরিশোধ ও অন্যান্য বিষয় চুক্তির শর্ত এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে নিষ্পত্তি করতে কাজও শুরু করেছে সরকার।

বিআরটি ব্যর্থ হওয়ার পেছনে দীর্ঘসূত্রতার দায় অনেক। এক প্রকল্পে কাজ করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রাথমিক তদন্তে সমন্বয়হীনতা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং পরিচালনাগত প্রস্তুতির অভাবের বিষয়গুলো সামনে আসে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) করা তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, বর্তমান নকশা ও বাস্তব পরিস্থিতিতে বিআরটি চালু করলে যানজট ও জনভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। তাই বিআরটি হিসেবে চালুর পরিবর্তে করিডরটিকে উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহার এবং রেলভিত্তিক গণপরিবহন জোরদার করাই বেশি বাস্তবসম্মত সমাধান। আর আসন্ন মহাসড়কে টোল যুক্ত করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বুয়েটের টেকনিক্যাল সার্ভিসেস উইং মনে করে, প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় মহাসড়কের প্রকৃত ট্রাফিক চাপ, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক মালবাহী যান চলাচল, ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং সড়কের বাস্তব অবস্থা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এই ত্রুটিগুলোই বর্তমান যানজট ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতার অন্যতম কারণ।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের বর্তমান সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী সম্ভাব্যতা যাচাই পরামর্শক (ফিজিবিলিটি স্টাডি কনসালট্যান্ট) এবং নকশা তৈরির পরামর্শক (ডিজাইন কনসালট্যান্ট) প্রতিষ্ঠান। আর বিআরটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ দক্ষতার অভাব ছিল সরকারি কোম্পানির। বর্তমানে কোম্পানিটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।

কমিটির প্রধান বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হক এসব নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন। তার ভাবনায়, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। দায়ীদের শাস্তি দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোটাই উচিত। আর ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান এডিবির সঙ্গে আলোচনা করলেই এটি সমাধান হয়ে যাবে।

যদিও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) প্রকল্পের অবকাঠামো সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির মতে, এই সিদ্ধান্ত টেকসই ও জ্বালানি সাশ্রয়ী গণপরিবহন পরিকল্পনার পরিপন্থী এবং ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর যাতায়াতকে উৎসাহিত করতে পারে। গাজীপুরের নাগরিক সংগঠন গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়নও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে অবশিষ্ট কাজ শেষ করে বিআরটি চালুর দাবি জানিয়েছে।