Image description

দৈনন্দিন বাজারের পরিচিত মাছগুলোই হয়ে উঠছে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ। ঢাকার সাভার ও মানিকগঞ্জের বাজার থেকে সংগ্রহ করা মাছের প্রায় অর্ধেক নমুনায় মিলেছে খাদ্যবাহিত রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া সালমোনেলা। এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, শনাক্ত হওয়া এসব জীবাণুর প্রায় ৪৩ শতাংশই আবার একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী বা মাল্টিড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের করা একটি গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের ২৪ জুলাই নেচার পোর্টফোলিওর ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।

এতে খুচরা মাছের বাজারকে বহু ওষুধ প্রতিরোধী সালমোনেলার লুকানো হটস্পট বলা হয়েছে। সালমোনেলা মূলত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া, পেটব্যথা, জ্বরসহ নানা অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রুই

গবেষকেরা ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাভার উপজেলা ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বাজার থেকে মোট ৩৪২টি মাছের নমুনা সংগ্রহ করেন। প্রতি এলাকা থেকে রুই, পাঙাশ ও তেলাপিয়ার ১৭১টি করে নমুনা নেওয়া হয়। প্রতিটি মাছের অন্ত্র ও ত্বক থেকে আলাদাভাবে নমুনা নিয়ে বিএলআরআইয়ের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার পর ১৬২টি বা ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ মাছে সালমোনেলা নিশ্চিত হওয়া যায়।

 

গবেষকেরা জানান, সবচেয়ে বেশি জীবাণুর উপস্থিতি মিলেছে রুই মাছে। মোট ১১৪টি রুইয়ের মধ্যে ৯০টিতে বা ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ নমুনায় সালমোনেলা পাওয়া গেছে। পাঙাশে এই হার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং তেলাপিয়ায় ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। এলাকাভিত্তিক সংক্রমণের হারেও খুব একটা পার্থক্য নেই। সাভারে সংক্রমণের হার ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মানিকগঞ্জ সদরে ৪৮ শতাংশ। গবেষকদের মতে, অভিন্ন মাছ চাষ পদ্ধতি, পরিবেশ বা বাজারের স্বাস্থ্যবিধি এর কারণ হতে পারে।

তবে রুই মাছে জীবাণুর উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে মানেই এই নয় যে রুই স্বভাবগতভাবেই সালমোনেলা সংক্রমণের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপিতে পিএইচডি গবেষণারত আবু বকর সিদ্দিক এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দেন।

তিনি স্ট্রিমকে জানান, রুই স্বভাবগতভাবেই সালমোনেলা সংক্রমণের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এমন কোনো জোরালো প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া যায়নি। মাছ চাষের পরিবেশে দূষিত পানির সংস্পর্শ, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং একই সরঞ্জাম দিয়ে বিভিন্ন মাছ প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কাজে আসছে না হাতের কাছের ওষুধ

গবেষণায় ১২টি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিক্রিয়া যাচাই করা হয়। এতে দেখা যায়, সালমোনেলার সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ সক্ষমতা রয়েছে অ্যাম্পিসিলিনের বিরুদ্ধে যা প্রায় ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ। শরীরে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ চিকিৎসায় ব্যবহৃত টেট্রাসাইক্লিন ও সিপ্রোফ্লক্সাসিনের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ দেখা গেছে ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ করে। অন্যদিকে মূত্রনালির সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যবহৃত নাইট্রোফুরানটোইনে ৩১ দশমিক ৭১ শতাংশ প্রতিরোধ মিলেছে।

তবে আশার কথাও আছে। নালিডিক্সিক অ্যাসিডে জীবাণুর সংবেদনশীলতা ৯২ দশমিক ৬ শতাংশ, অ্যাজিথ্রোমাইসিনে ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ, সেফেপাইমে ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং জেন্টামাইসিন ও সেফট্রিয়াক্সোনে ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ এসব ওষুধ এখনো জীবাণু দমনে তুলনামূলক কার্যকর।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বহু ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর হার রুইয়ে ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ, পাঙাশে ৪২ শতাংশ ও তেলাপিয়ায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

আবু বকর সিদ্দিক বলেন, এসব জীবাণু একাধিক শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে এগুলোর মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটলে চিকিৎসার বিকল্প সীমিত হয়ে যেতে পারে। তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো, পরীক্ষায় কোনো সালমোনেলা ব্যাপকভাবে ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট বা প্যানড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট হিসেবে শনাক্ত হয়নি।

 

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

গবেষকেরা শুধু জীবাণু গোনেননি, এর প্রতিরোধক্ষমতা কীভাবে ছড়াতে পারে তারও সূত্র খুঁজেছেন। তাঁরা জানান, ক্লাস ১ ইন্টিগ্রন নামের একটি জেনেটিক উপাদান জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী জিন ধরে রাখতে এবং এক জীবাণু থেকে আরেকটিতে চালান করতে সহায়তা করে। ১৬২টি জীবাণুর নমুনার ১৮ দশমিক ৫ শতাংশে এটি মিলেছে।

তবে এই ফলাফল ঘিরে আতঙ্ক ছড়ানোর সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের ভাষ্য, মানুষের শরীরে প্রতিরোধী জিন সরাসরি বা দ্রুত ছড়ানোর কথা বলা অনুমাননির্ভর এবং এই উপাত্ত তা সমর্থন করে না।

আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের গবেষণার মূল উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা নয়। বরং খাদ্যনিরাপত্তা এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা।’

তিনি আরও জানান, মাছের নমুনায় সালমোনেলা জীবাণু শনাক্ত হলেও এসব প্রতিরোধী জীবাণু বা জিন সরাসরি মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে এমন কোনো প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

গবেষকেরা নিয়মিত নজরদারি, জলজ চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের বিবেচনাপূর্ণ ব্যবহার এবং বাজারে স্বাস্থ্যবিধি ও খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারের সুপারিশ করেছেন। মাছ বিপণনের কোন ধাপে দূষণ ঘটছে তা খুঁজে বের করতে আরও গবেষণার তাগিদও দিয়েছেন তাঁরা।

এই গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন বিএলআরআইয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. নিয়ামুল শাহাদাত ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. নাজমুস সাকিব শুভ ও আবু মুসা এবং গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারা-ক্লিনিক্যাল কোর্সেস বিভাগের উত্তম কুমার রায়।