Image description

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) শতকোটি টাকার আলাদা কেনাকাটায় অনিয়ম ও ভাগাভাগির প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। তবে কোনো শাস্তি বা জরিমানা ছাড়াই মামলা দুটি নিষ্পত্তি করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন।

 

দুই কেনাকাটায় মোট অর্থের পরিমাণ ১১০ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮ কোটি ৫৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার কাজ দুই লটে ভাগ করা হয়। আর বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) জন্য এক হাজার মোটরসাইকেল কিনতে কার্যাদেশ দেওয়া হয় দুই প্রতিষ্ঠানকে।

 

মোটরসাইকেলের দাম সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছে, প্রতিটির বাইকের দাম ধরা হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার টাকা। সেই হিসাবে এক হাজার মোটরসাইকেলের দাম দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

 

পৃথক দুই ঘটনায় প্রতিযোগিতা কমিশনে মামলা হয়। তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা মেলে। এরপর অভিযোগকারীরা মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন এবং কমিশন তা মঞ্জুর করে। বিআরইবির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় অভিযুক্তদের শুধু ‘ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার পরামর্শ’ দেওয়া হয়।

 

পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. দেলোয়ার হোসেনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তদন্ত শেষ করে। প্রতিবেদন পাঠানো হয় বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটিতে (বিপিপিএ)।

 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দরপত্র

 

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন ও আদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি তহবিলে ওএমআর ফরম ও উত্তরপত্র কেনার দরপত্র আহ্বান করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ওএমআর ফরমে পরীক্ষার্থীর উত্তর যন্ত্রের মাধ্যমে পড়া হয়। এই ফরম ও উত্তরপত্রে লিথো কোড ও কিউআর কোড থাকার কথা ছিল। দরপত্রের মোট মূল্য ধরা হয় ১০৮ কোটি ৫৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

 

বিজ্ঞপ্তিতে ওটিএম পদ্ধতিতে কাজের কথা বলা হয়েছিল। ওটিএম হচ্ছে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি, যেখানে যোগ্য যে কেউ অংশ নিতে পারেন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পরে কারিগরিভাবে জটিল ‘দুই ধাপ দুই খাম’ পদ্ধতি এবং ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট বা কাঠামোগত চুক্তির মতো নিয়মবহির্ভূত কৌশল ব্যবহার করা হয়।

 

দরপত্রে বিগত তিন বছরে ৪০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতাসহ নানা শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। একটি কাজকে ভাগ করা হয় দুটি লটে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি সরকারি ক্রয় আইন ২০০৬ এবং ২০০৮ সালের ক্রয় বিধিমালার লঙ্ঘন।

 

কমিশন বলছে, দাপ্তরিক প্রাক্কলন মূল্য বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি ধরা হয়। ঠিকাদারদের যোগ্যতার শর্তে কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। এ ছাড়া মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ও প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডকে কাজ পাইয়ে দিতে দরদাতার সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে।

 

প্রথম লটে মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকায় কার্যাদেশ পায়। দ্বিতীয় লটে প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড কার্যাদেশ পায় ৫৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকায়।

 

এই দরপত্রে উপাচার্য ড. এ. এস. এম. আমানুল্লাহ, ট্রেজারার ড. এ. টি. এম. জাফরুল আজম এবং প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর ১৫ (১) ও (২) ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ‘দরপত্র জালিয়াতি’র প্রাথমিক সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

 

জালিয়াতির প্রমাণ মিললেও বিচার হয়নি। অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন’ মামলা না চালানোর আবেদন করলে গত ৮ জানুয়ারি কমিশন সেই আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি নিষ্পত্তি করে। তবে কোনো অভিযুক্তদের কোনো জরিমানা বা শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। কমিশন অভিযুক্তদের শুধু ‘ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার পরামর্শ’ দেয়।

 

বিআরইবির এক হাজার মোটরসাইকেল

 

বিআরইবির জন্য এক হাজার হোন্ডা এসপি ১২৫ মোটরসাইকেল কেনার সিদ্ধান্ত হয় ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ। কমিশনের আদেশ ও তদন্ত সূত্র বলছে, হোন্ডার বাংলাদেশি সরবরাহকারী এবং বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডকে (বিএমটিএফ) সমানভাবে মোটরসাইকেল সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রথম প্রতিষ্ঠানটি এটলাস বাংলাদেশ।

 

সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কিছু কিনতে হলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়। অথচ কার্যাদেশ পাওয়া দুই প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেল তৈরি বা সংযোজন করে না।

 

গত বছরের ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেড (বিএইচএল) ও এটলাসের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। চুক্তির ১.১ অনুচ্ছেদে বলা আছে, এটলাস সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে হোন্ডা মোটরসাইকেল বিক্রি করবে।

 

একই সময়ে বিএইচএল বিএমটিএফের কাছে মোটরসাইকেল সরবরাহে অস্বীকৃতি জানায়। এটলাস বাংলাদেশের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানকে মোটরসাইকেল দিতে রাজি হয়নি তারা।

 

এমন পরিস্থিতিতে বিএইচএলের বিরুদ্ধে সরকারি ক্রয় নীতিমালা ভঙ্গের অভিযোগে প্রতিযোগিতা কমিশনে মামলা করে বিএমটিএফ। তদন্তে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা মিললেও মামলা নিষ্পত্তি হয় অভিযোগকারীর আবেদনের ভিত্তিতে।

 

বিএমটিএফ ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর ‘স্বেচ্ছায়’ মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করে। ২০ অক্টোবর কমিশন তা মঞ্জুর করে। আদেশে বিএইচএল, এটলাস, বিএমটিএফ ও বিআরইবিকে প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলা হয়।

 

দুই আদেশে স্বাক্ষর করেন কমিশনের চেয়ারপারসন এ এইচ এম আহসান এবং সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার ও ড. আফরোজা বিলকিস।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার (বাঁয়ে) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. দেলোয়ার হোসেন।
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার (বাঁয়ে) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. দেলোয়ার হোসেন।

 

মামলা দুটি নিষ্পত্তির পর বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. দেলোয়ার হোসেনকে। কমিশনের দেওয়া দায়মুক্তির সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন তিনি।

 

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়মে জড়িতদের শাস্তি না দিয়ে মামলা দুটি নিষ্পত্তিতে মূল ভূমিকা রাখেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেছেন, কমিশনের প্রশাসনিক অভিভাবক বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হওয়ায় দেলোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে ‘স্বার্থের সংঘাতের’ অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অভিযুক্ত সদস্যকে রেহাই দিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।

 

নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. দেলোয়ার হোসেন। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত। কর্তৃপক্ষের কাছে তিন সদস্যের কমিটির প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এটি কোনোভাবেই একক সিদ্ধান্তে হয়নি।’

 

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থে‌কে দুজনের আর্থিক বিষয় তদন্তের জন্য বলা হ‌য়ে‌ছি‌ল। কিন্তু আমরা যখন তদন্ত শুরু ক‌রি তখন কোনো অভিযোগকারী পাইনি। অর্থাৎ, বেনা‌মি অভিযোগ। আমরা কিছু পর্যবেক্ষণ দি‌য়ে‌ছি।’