Image description

রাজধানীর আব্দুল্লাহপুরসংলগ্ন টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে মাজার বস্তি। প্রায় পাঁচ একর জমিতে গড়ে ওঠা এ বস্তিতে বাস করেন কমবেশি ৩০ হাজার মানুষ। তবে ঘনবসতিপূর্ণ এই জনপদটির পরিচিতি কেবল বসতি হিসেবে নয়, মাদক বেচাকেনা ও সেবনের ‘হটস্পট’ হিসেবেও। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বস্তির মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণও হাতবদল হয়েছে। আগে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই বস্তিতে এখন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতার প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গত বুধবার রাতে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরি ওই বস্তিতেই ঢুকেছিলেন। রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে হোন্ডা রোডে আরাফাতের টং দোকানের বিপরীতে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল রেখে পাশের সরু গলি দিয়ে তিনি সেখানে ঢোকেন। পরদিন তুরাগ নদ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। বলা হচ্ছে, মাদক সেবনের উদ্দেশ্যে তিনি বস্তিতে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

বস্তির মাঝখানে রয়েছে হযরত সৈয়দ শাহ বোগদাদী (রহ.)-এর মাজার ও মসজিদ। এর চারপাশে টিনের খুপরি ঘর থেকে শুরু করে দোতলা ও তিনতলা বস্তিঘরও রয়েছে। জমির প্রায় তিন বিঘা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এবং বাকি অংশ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও জেলা প্রশাসনের খাস জমি।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বস্তিটি নিয়ন্ত্রণ করতেন টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রজব আলী। তার গডফাদার ছিলেন সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, আওয়ামী লীগ নেতা আজমত উল্লাহ খান এবং সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের চাচা মতিউর রহমান মতি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতারা আত্মগোপনে গেলেও স্থানীয় মাদক কারবারিরা থেকে যান। বদলে যায় শুধু নিয়ন্ত্রণের নেতৃত্ব।

এখন বস্তির নিয়ন্ত্রণ শাহাবুদ্দীন দাবারুর হাতে। তার সঙ্গে রয়েছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাজারপাড়া ইউনিট বিএনপির নেতা সিদ্দিকুর রহমান ডুবলী, রবিউল ইসলাম বাবু ওরফে কিং বাবু, আরাফাত ওরফে ইয়াবা আরাফাত, ক্যাসেট শামীম, স্থানীয় বিএনপি নেতা রাশেদুল ইসলাম কিরণ, ৫৭ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আলকাস মিয়া ও মাজারপাড়া ইউনিট বিএনপির নেতা নজরুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন।

বস্তির পাশের হোন্ডা রোডে টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির হাজীর মাজার ইউনিটের একটি সুসজ্জিত দোতলা কার্যালয় রয়েছে। সরেজমিনে বস্তির বিভিন্ন গলির মুখেও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সুসজ্জিত ইউনিট কার্যালয় দেখা গেছে। এসব কার্যালয়ে দিনভর নেতাকর্মীদের আড্ডা চলে। স্থানীয়দের দাবি, বস্তিতে বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৫১০ জন ক্যাডার রয়েছে। তাদের কারো কারো কাছে অবৈধ অস্ত্রও আছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এসব কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ছিল। জুলাই বিপ্লবের পর রাতারাতি সেগুলোতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সাইনবোর্ড ওঠে। বস্তির বিভিন্ন স্থানে বিএনপি নেতা ও সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিলবোর্ডও দেখা যায়।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যাসেট শামীম ও কিং বাবু আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জুলাই বিপ্লবের পর ক্যাসেট শামীমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। তিনি গোপনে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকে আশ্রয় দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় বিএনপি নেতা রাশেদুল ইসলাম কিরণের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ক্যাসেট শামীম বস্তির আশপাশে চাঁদা তোলেন বলে অভিযোগ। আর কিং বাবু মাদকের আখড়াগুলো থেকে চাঁদা সংগ্রহ করেন বলে স্থানীয়দের দাবি। কিং বাবুর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আরাফাত ওরফে ইয়াবা আরাফাত।

অভিযোগ রয়েছে, মাদক কারবারের আখড়া ও ফুটপাত থেকে আদায় করা চাঁদার বড় অংশ স্থানীয় বিএনপি নেতা জাবেদ আহমেদ সুমন ওরফে সুমন সরকারের কাছে যায়। তাদের দাবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করা এবং বস্তি উচ্ছেদ ও মাদকবিরোধী অভিযান ঠেকানোর কাজ করেন তিনি। এ ছাড়া মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে কয়েকজন প্রভাবশালী নারীর সম্পৃক্ততার কথাও জানান স্থানীয়রা। ক্যাডাররা তাদের ‘ভাবী’ বলে সম্বোধন করেন। তবে তাদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

ক্যামেরা ও পাহারায় নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ

সরেজমিনে দেখা গেছে, বস্তির প্রবেশপথগুলোতে মাদক কারবারিদের লোকজন পাহারা দেয়। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয় মানুষের চলাচল। অপরিচিত কেউ প্রবেশ করতে চাইলে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে মোবাইল ফোনে অনুমতি নিতে হয়। এ ব্যবস্থায় কারা কখন বস্তিতে ঢুকছেন বা বের হচ্ছেন, তা নজরদারিতে রাখা সম্ভব।

টঙ্গীর দুটি সড়ক এবং তুরাগ নদের তীর দিয়ে বস্তিতে প্রবেশ করা যায়। স্থানীয়দের দাবি, সড়ক পথে বাধা বা পুলিশি তল্লাশি থাকলে নৌপথে বস্তিতে মাদক আনা হয়।

বস্তিতে প্রবেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন যুবক ঘিরে ধরে পরিচয় জানতে চান। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তারা সহযোগিতার মনোভাব দেখান। তাহসিফ সাউরির মোটরসাইকেল কোথায় রাখা হয়েছিল, কোন গলি দিয়ে তিনি ঢুকেছিলেন এবং কোথায় গিয়েছিলেন, তা দেখিয়ে দেন। তবে প্রকাশ্যে মাদকসেবী বা বিক্রেতাদের ছবি-ভিডিও ধারণ করতে নিষেধ করেন তারা।

বস্তির বিভিন্ন স্থানে নারী-পুরুষকে প্রকাশ্যে জটলা করে বসে থাকতে দেখা যায়। পাশেই রয়েছে দুটি বড় পোশাক কারখানা। সেখান থেকে ইজতেমা মাঠ পর্যন্ত সড়ক গেছে। ইজতেমা মাঠের ২৬ ও ২৭ নম্বর টয়লেট ভবনের মাঝখান দিয়ে মাঠে প্রবেশ করা যায়।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতে ওই এলাকা মাদকসেবীদের দখলে চলে যায়। টয়লেট ভবনের পেছনে দিনের বেলাতেও মাদক সেবন করতে দেখা যায়। বস্তির ভেতরে কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের একটি কার্যালয় রয়েছে। ওই ভবনের আশপাশেও মাদকসেবীদের আড্ডা দেখা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকে রাত যত গভীর হয়, বস্তিতে মাদক কারবার তত বাড়ে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মাদকসেবীরা সেখানে এসে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক কেনেন ও সেবন করেন। মাদক কারবারিদের ভয়ে পুলিশও সেখানে সহজে অভিযান চালাতে পারে না। এর আগে বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে ডিবি ও থানা পুলিশের সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন। মাদক কারবারিদের লাঠিয়াল বাহিনীর হামলায় পুলিশের পরিদর্শকসহ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মাদক কারবার নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য গেলে গত ২৬ অক্টোবর দিনের বেলায় স্থানীয় এক সাংবাদিককে অপহরণ করে বস্তিতে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। প্রায় দুই ঘণ্টা নির্যাতনের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

 

উচ্ছেদের পর ফের দখল

গত ৩১ আগস্ট টঙ্গী বাজারের কলকারখানা অধিদপ্তরসংলগ্ন এলাকায় রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে অংশ নেওয়া রাজউকের উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) লিটন সরকার বলেন, হাজী মাজার বস্তি এলাকায় রাজউকের প্রায় তিন বিঘা জমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব জমি মাদকসেবী ও কারবারিদের দখলে ছিল। মাদকের বিস্তার ঠেকাতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে জমি বুঝে নেওয়া হয়েছে।

 

‘মাদক কারবার ৯৫ শতাংশ কমেছে’

মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার চলে—এমন অভিযোগের বিষয়ে টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও গাজীপুর মহানগরীর ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী রাশেদুল ইসলাম কিরণ বলেন, বিএনপি কখনো মাদক কারবারকে প্রশ্রয় দেয় না। পুলিশ কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বস্তির যেসব এলাকায় মাদকের কারবার হতো, সেগুলো উচ্ছেদ করেছি।

কিরণের দাবি, বস্তিতে মাদক কারবার ৯৫ শতাংশ কমে গেছে। এখন বহিরাগত কিছু লোক ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা মাদক বিক্রি করছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনের কোনো নেতাকর্মী মাদক কারবারে জড়িত নন বলেও দাবি করেন তিনি।

ইউনিট বিএনপির নেতা সিদ্দিকুর রহমান ডুবলি বলেন, আগে আওয়ামী লীগের লোকজন বস্তি চুষে খেয়েছে। আমরা তাদের তাড়িয়েছি। এখন আমরা বস্তির পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখছি।

 

মাদকের আখড়া গুঁড়িয়ে দিয়েছি

বস্তিতে প্রকাশ্যে মাদক কারবার ও ক্যাডার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের বিষয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুর রহমান আমার দেশকে বলেন, বস্তির মূল মাদকের আস্তানা আগেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ নিয়মিত সেখানে টহল ও তল্লাশি অভিযান চালায়। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মাদক কারবারিরা যতই শক্তিশালী হোক, কাউকে মাদক কারবার করতে দেওয়া হবে না।