রাজধানীর মগবাজারে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে সামনে এসেছে একটি সবুজ রঙের সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অটোরিকশাটি ব্যবহার করে এক ব্যক্তি আসিফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যান বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর আশপাশের বিভিন্ন ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ শুরু করে পুলিশ। তবে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত হামলাকারীকে শনাক্তের মতো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঘটনার ফুটেজে অটোরিকশার নম্বর প্লেট স্পষ্ট না হওয়ায় সেটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সবুজ রঙের অটোরিকশার সঙ্গে নম্বর প্লেটের রঙের মিল থাকায় ক্যামেরায় নিবন্ধন নম্বর পড়া যাচ্ছে না। ফলে কোন সিএনজিটি ব্যবহার করে হামলাকারী পালিয়েছেন তা নিশ্চিত করতে তদন্তকারীদের বেগ পেতে হচ্ছে।
পুলিশ বলছে, শুধু অপরাধী শনাক্তের তদন্ত নয়, রাজধানীর সড়কে ট্রাফিক আইন প্রয়োগেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরায় যানবাহনের আইন লঙ্ঘনের দৃশ্য ধরা পড়লেও নম্বর প্লেট স্পষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট গাড়ির নিবন্ধিত মালিককে শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা বা প্রসিকিউশনের নোটিশ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশার অধিকাংশই সবুজ রঙের। এসব যানবাহনের নম্বর প্লেটও সবুজ, তার ওপর কালো রঙে লেখা থাকে নিবন্ধন নম্বর। ফলে দূর থেকে, বিশেষ করে কম আলোতে, নম্বরের অক্ষর ও সংখ্যা আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন
আসিফের সিএনজি শনাক্ত করা গেছে কি না—জানতে চাইলে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা চলছে। তবে এখনো সিএনজি শনাক্ত করা যায়নি। আশা করি শনাক্ত হবে এবং আসামিও শনাক্ত হবে।
রঙের মিলেই নম্বর পড়তে সমস্যা
রাজধানীতে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার অধিকাংশই সবুজ রঙের। এসব যানবাহনের নম্বর প্লেটও সবুজ, তার ওপর কালো রঙে লেখা থাকে নিবন্ধন নম্বর। ফলে দূর থেকে, বিশেষ করে কম আলোতে, নম্বরের অক্ষর ও সংখ্যা আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন। রাতে নম্বরগুলো খালি চোখেই দেখা যায় না।
ট্রাফিক বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কিছু ক্ষেত্রে নম্বর প্লেটের কালো অক্ষর ও সংখ্যা ঘষে তুলে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। এতে নম্বরের দৃশ্যমানতা আরও কমে যায়। কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন ভাঙলে কিংবা অপরাধে ব্যবহৃত হলে ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নিবন্ধন নম্বর উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশ বলছে, এআই ক্যামেরার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। প্রযুক্তি কোনো যানবাহনকে শনাক্ত করার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু নম্বর প্লেটের অক্ষরই যদি পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান না হয়, তাহলে সঠিক নিবন্ধন নম্বর বের করা কঠিন। ভুল নম্বর শনাক্ত হলে নিরপরাধ গাড়ির মালিকের কাছে নোটিশ যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার পাশাপাশি নম্বর প্লেটের মান ও দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাড়ছে অপরাধ তদন্তেও জটিলতা
সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে অপরাধীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়া এবং পরে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিচ্ছে। ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ কিংবা প্রতারণার ঘটনায় ব্যবহৃত যানবাহনের পরিচয় শনাক্ত করা তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছে, অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহনের নম্বর প্লেট ভুয়া হলে কিংবা দৃশ্যমান না হলে তদন্তকারীদের বিকল্প উপায়ে গাড়ি ও এর ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করতে হয়।
ঢাকায় নিবন্ধিত অটোরিকশার পাশাপাশি অবৈধ যানবাহনও চলাচল করে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত ব্যবহারের অটোরিকশার নিবন্ধন নিয়ে রং পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক যানবাহন হিসেবে চালান।—শেখ হানিফ
এক্ষেত্রে আশপাশের ক্যামেরার ফুটেজ, যাতায়াতের সম্ভাব্য পথ, ঘটনার সময় ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্য মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নিতে হয়। কোনো ঘটনায় ব্যবহৃত সিএনজির নম্বর স্পষ্টভাবে পাওয়া গেলে নিবন্ধিত মালিকের তথ্য ধরে তদন্তের একটি সূত্র তৈরি হতে পারে। তবে নিবন্ধিত মালিকই যে অপরাধের সময় গাড়িটি চালাচ্ছিলেন এমন না-ও হতে পারে।
একইভাবে, নম্বর প্লেট স্পষ্ট থাকলেই অপরাধী নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়ে যাবেন এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে নম্বরটি নির্ভুলভাবে পড়া গেলে তদন্তের প্রাথমিক ধাপ সহজ হয়। বিপরীতে নম্বর অস্পষ্ট হলে একটি সম্ভাব্য সূত্র যাচাই করতেই বাড়তি সময় ও জনবল ব্যয় করতে হয়।
ঢাকায় একই নম্বরে একাধিক সিএনজি
সিএনজির নম্বর প্লেট নিয়ে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় ভুয়া নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার এবং একই নম্বর একাধিক গাড়িতে লাগানো।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে একই নম্বর প্লেটে পাঁচ থেকে সাতটি অটোরিকশা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নিবন্ধিত যানবাহনের তথ্য, চেসিস নম্বর, ইঞ্জিন নম্বর, মালিকানার নথি এবং মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই নম্বর একাধিক গাড়িতে ব্যবহার করা হলে শুধু ক্যামেরায় নম্বর শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিবন্ধিত গাড়ির তথ্যের সঙ্গে বাস্তবে চলাচলকারী গাড়ির পরিচয় মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে ভুয়া নম্বর প্লেটের ব্যবহার শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে গাড়ি বিক্রির পর মালিকানা হস্তান্তর না করা, নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ না থাকা এবং অনুমোদিত শ্রেণির বাইরে যানবাহন ব্যবহার করার মতো বিষয়ও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পুলিশ সদস্যরা।
নম্বর প্লেটের রং পরিবর্তনের উদ্যোগ
ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শেখ হানিফ জাগো নিউজকে বলেন, ঢাকায় নিবন্ধিত অটোরিকশার পাশাপাশি অবৈধ যানবাহনও চলাচল করে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত ব্যবহারের অটোরিকশার নিবন্ধন নিয়ে রং পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক যানবাহন হিসেবে চালান।
তিনি বলেন, নম্বর প্লেটের রং পরিবর্তন করলে যদি সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সহজ হয়, তাহলে সেটি সবার জন্যই ভালো হবে।
এ বিষয়ে ডিএমপির কোনো চিঠি এখনো তারা পাননি। সড়ক পরিবহন বিধিমালা অনুযায়ী নম্বর প্লেটের রং নির্দিষ্ট রয়েছে। ডিএমপি আপত্তি জানালে বিধি অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।—মো. ফারুক আহমেদ
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, সিএনজির রঙের সঙ্গে নম্বর প্লেটের রং মিলে যাওয়ায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। দিনের বেলা নম্বর প্লেট কিছুটা বোঝা গেলেও রাতে তা একেবারেই স্পষ্ট হয় না। সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বিআরটিএর উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং-২) মো. ফারুক আহমেদ জানান, এ বিষয়ে ডিএমপির কোনো চিঠি এখনো তারা পাননি। সড়ক পরিবহন বিধিমালা অনুযায়ী নম্বর প্লেটের রং নির্দিষ্ট রয়েছে। ডিএমপি আপত্তি জানালে বিধি অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
গত শনিবার ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এসময় আসিফ আকবর বিশাল সেন্টারের তিনতলায় তার স্টুডিওতে ছিলেন। চালকও গাড়ির কাছে ছিলেন না।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, ঘটনার সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিশাল সেন্টারের সামনে এসে থামে। সেখান থেকে একজন নেমে এসে আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি করে আবার অটোরিকশায় উঠে মালিবাগের দিকে চলে যান। তবে অটোরিকশায় আরও কেউ বসা ছিল কি না, সে বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
চালকের আসন বরাবর পেছনের আসন লক্ষ্য করে গুলি করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, গুলি এক রাউন্ড করা হয়েছিল। গুলিতে গাড়ির গ্লাস ভেঙে যায়।