Image description

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন আগামী ২৯ অক্টোবর। ওই উপনির্বাচন ঘিরে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় ওই আসন শূন্য হয়। এ উপনির্বাচনে প্রার্থীরা হলেন–রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মো. দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ মো. খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।

নির্বাচনের মাঠে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরেফিরে উঠছে, বিএনপি আসনটি ধরে রাখতে পারবে, নাকি এটি বিরোধীদল জামায়াতের ঘরে যাবে?

Map

 

আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ৫৩ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭২ জন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, আসনটির ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের ৯৮৯টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার চলবে ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত।

জামায়াতের অভিযোগ

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সুষ্ঠু নাও হতে পারে বলে এরই মধ্যে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। গত রোববার মোট ৯টি অভিযোগ ও তিনটি দাবি ইসিতে দিয়েছে জামায়াত। দলটির অভিযোগ–নির্বাচনে প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছেন না, আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং ভোটারদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, “আমরা দাবি করে যাচ্ছি, নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে আমরা নির্বাচনে অংশ নেব। আমরা এখনো নির্বাচন থেকে উঠে যাইনি। আমরা নির্বাচন করার জন্যই এখানে এসেছি। আমাদের প্রার্থী মাঠে আছে।” তিনি ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের মতো নির্বাচন না করতে ইসিকে সতর্ক করেন।

জামায়াতের তিনটি দাবির মধ্যে রয়েছে, তাদের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভোটকেন্দ্রে পুলিশের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েন করা। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ও তাকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে দলটি।

জামায়াত হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদেরও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছে। এ ছাড়া মসজিদে নির্বাচনী সভা, রঙিন প্রতীক ব্যবহার, নির্ধারিত সময়ের আগে মাইক বাজানো এবং ভোটারদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মাধ্যমে আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে দাবি দলটির।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।

দুই প্রার্থী ভোট চাচ্ছেন যে প্রতিশ্রুতিতে

বিএনপি প্রার্থী ফয়সাল আমিন ভোটের মাঠে উন্নয়নের ধারাবাহিকতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন। অন্যদিকে দুর্নীতিমুক্ত ঠাকুরগাঁও ও হিন্দু সম্প্রদায়কে সুরক্ষাসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী। উপনির্বাচন হওয়ায় শুরুতে উদ্দীপনা স্বাভাবিক সংসদ নির্বাচনের চেয়ে কম ছিল। তবে শেষ মুহূর্তের প্রচার ছিল জমজমাট।

 

জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচিত হলে এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি সব সম্প্রদায়ের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন তারা।

আগের নির্বাচনের ফলও আলোচনায়

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট।

তবে সাধারণ নির্বাচন ও উপনির্বাচনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। প্রার্থী পরিবর্তন, দলীয় অবস্থান, স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ভোটার উপস্থিতির পার্থক্য নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আগের নির্বাচনের ফলকে বর্তমান নির্বাচনের ফলের সরাসরি পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

jamat

ভোটে জয়ে বড় ফ্যাক্টর কী হবে?

সব শেষ পর্যন্ত বিএনপির ও জামায়াত ইসলামীর দুই প্রার্থীই শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার চালিয়েছেন। বড় ধরনের সংঘাতও হয়নি।

স্থানীয় অনেকেই মনে করছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগ যেহেতু নির্বাচনে নেই, সে কারণে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সাল আমিন এগিয়ে থাকবেন। পৌর এলাকার হলপাড়া, হাজিপাড়া, তাঁতীপাড়া, বাজারপাড়াসহ একাধিক এলাকার মানুষজন এ রকম ধারণা করছেন। তবে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের ফাঁড়াবাড়ি কলেজের একজন শিক্ষক চরচাকে বলেন, “ক্ষমতার সঙ্গে থাকলে তাদের যে সুবিধা বেশি, এটা এলাকার মানুষ মনে করেন। এ জন্য বিএনপি প্রার্থীই জয়লাভ করার সম্ভাবনা আমি বেশি দেখি। আর রাষ্ট্রপতি যেহেতু এ এলাকায় একজন স্বনামধন্য মানুষ, তার ছোট ভাই হিসেবেও তার (বিএনপি প্রার্থী) নামটিই আসছে।”

তবে গত ১৭ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হয় ওই দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে। জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রাণ ভোটারদের ‘উসকানি দিয়ে বিভ্রান্ত’ করা এবং সাধারণ ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয় ব্যবহারের অভিযোগ আনে বিএনপি।

প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের নির্বাচনী গণসংযোগে বাধা ও তাকে হেনস্তার চেষ্টার অভিযোগে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ঐতিহাসিকভাবেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট একটি নির্ণায়ক। নির্বাচন এলেই তাদের নিয়ে চলে নানা হিসাব-নিকাশ।

 

স্থানীয় ভোটাররা মনে করেন, নির্বাচনে একটি জনগোষ্ঠী গুরুত্ব পেলেও তাদের সংখ্যা ছাড়াও ভোটদানের হার, প্রার্থীদের প্রতি সমর্থনের ধরন এবং সামগ্রিক ভোটের ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটাররা যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন, তাহলে তাদের ভোটের বণ্টন নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তাদের সবাই একই প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন–এমন ধারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।

এ ছাড়া ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় উন্নয়নের মতো বিষয় ভোটারদের বিবেচনায় আসতে পারে। বিএনপি বিগত সময়ে; অর্থাৎ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সময়ে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেগুলোকে সামনে এনে ভোট চাইছে।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচনী আলোচনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটের পাশাপাশি সব শ্রেণি-পেশার ভোটারের প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ। এলাকার উন্নয়ন, কৃষির সমস্যা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রার্থীদের পরিকল্পনা ভোটারদের মূল্যায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

ভোটার ও স্থানীয় রাজনীতি সচেতনরা বলছেন, কোনো একটি সম্প্রদায়ের ভোটকে নিশ্চিতভাবে একক ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনার পরিবর্তে ভোটারদের বাস্তব সমস্যা, রাজনৈতিক পছন্দ ও অংশগ্রহণের প্রবণতা বোঝা জরুরি। এ জন্য কেন্দ্রভিত্তিক পূর্ববর্তী ফলাফল, হালনাগাদ ভোটার পরিসংখ্যান এবং নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে স্থানীয়রা বলছে, ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ভোটের ব্যবধান, ভোটার উপস্থিতি এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভোটের বণ্টন নির্বাচনী ফলাফলের বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে। সব মিলিয়ে, এই উপনির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট একটি আলোচ্য নির্বাচনী উপাদান হলেও চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে বৃহত্তর ভোটের সমীকরণ, প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।