Image description

পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতি— এ যেন ভূমি খাতের একরকম স্থায়ী সংস্কৃতি; যা চলছে যুগ যুগ ধরে। জমি নিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও জটিলতায় পড়েননি— এমন লোক খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। সমস্যা সমাধানে বিগত সরকারগুলো নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও পৌঁছাতে পারেনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। এবার স্থায়ীভাবে জটিলতা নিরসনে বিশ্বের সফল মডেল দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমি ব্যবস্থাপনার আদলে সাজানো হচ্ছে দেশের ভূমি প্রশাসন।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ভূমির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম)। পাশাপাশি দেশ জুড়ে করা হবে ডিজিটালাইজড খতিয়ান ও নকশা জরিপ এবং সমন্বিত আধুনিক ভূমি তথ্য ব্যবস্থা। আর গড়ে তোলা হবে সেন্ট্রাল ডেটা ব্যাংক ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস। এগুলোর বাস্তবে রূপ দিতে দ্বিপক্ষীয় উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত আলোচনায় অংশ নিতে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্দেশে চলতি সপ্তাহে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে বৈঠক করবেন দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমি, অবকাঠামো ও পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং দেশটির এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে। এ ছাড়া দেশটির প্রেসিডেন্ট, উপ-প্রধানমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।

এর আগে ২০১৬ সালে ভূমি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় স্বল্প পরিসরে নেওয়া হয়েছিল একটি ম্যানুয়াল প্রকল্প। যেটি বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এবার পুরো খাতকে ডিজিটালাইজড করতে নতুন করে দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমি ব্যবস্থাপনা মডেল ও ঋণ সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। যার ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কোরিয়া সরকারের কাছে ঋণ হিসেবে ৮ হাজার কোটি ও অনুদান ৮৭৫ কোটি টাকা চাওয়া হবে। বাকি ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব।

ভূমি সচিব (ভারপ্রাপ্ত) মো. এমদাদুল হক চৌধুরী গতকাল সোমবার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ভূমি নিয়ে একাধিক কাজ চলছে। বর্তমান বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ নেই। যে কারণে জমি কেনাবেচা হলেও বাস্তবতার সঙ্গে মিল থাকছে না।  এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে আর সেই সুযোগে বিনিয়োগ হচ্ছে কালো টাকা। আমরা একটি বাজারভিত্তিক জমির মূল্য নির্ধারণ করব। একইভাবে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বললেন, ‘সারা দেশে ডিজিটালভাবে জমির খতিয়ান ও নকশা জরিপ করা হবে। এজন্য একটি নির্ভুল সমীক্ষা করা হচ্ছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, দুর্নীতি ও কালো টাকার বিনিয়োগ কমবে। সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে।’ ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার ফর্মুলায় দেশে যে ভূমি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে কমপক্ষে ১৫ বছর (২০২৮-২০৪২)। এর মধ্যে (২০২৮-২০৩৩) সাল পর্যন্ত ছয় বছরে নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে ‘ডিজিটালাইজড ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে’ অপারেশনের মাধ্যমে ২০টি জেলার খতিয়ান ও নকশা জরিপ রেকর্ড প্রস্তুত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০৩৪-২০৩৯ সাল— এ সময়ে ৩৫টি জেলার খতিয়ান ও নকশা জরিপ রেকর্ড এবং তৃতীয় ধাপের (২০৪০-৪২) তিন বছরে ছয়টি জেলা এবং তিনটি পার্বত্য জেলার মৌজা ম্যাপ এবং খতিয়ান রেকর্ড প্রস্তুত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

সূত্রমতে, কোরিয়ান ফর্মুলার মাধ্যমে ভবিষ্যতে জমির মালিকানা পরিবর্তন বা কেনাবেচার সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হবে। যাকে বলা হয় ‘সিঙ্গেল সোর্স অব ট্রুথ’ বা তথ্যের একক নির্ভরযোগ্য উৎস। এটি ভূমিসংক্রান্ত যেকোনো জালিয়াতি বা দ্বৈত মালিকানার সুযোগ বন্ধ করবে।

এ পদ্ধতি কার্যকর হলে স্থাবর সম্পত্তি বা জমির মূল্য নির্ধারণে ম্যানুয়াল পদ্ধতি বন্ধ হবে। তখন রিয়েল এস্টেট বাজারের ডেটা এবং লেনদেনের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে একটি আধুনিক মডেলের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমির সঠিক বাজারমূল্য নির্ধারিত হবে। ভূমি অধিগ্রহণে সঠিক ক্ষতিপূরণ এবং সরকারের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হবে।

এ ছাড়া নাগরিকদের হয়রানিমুক্ত ও দ্রুত সেবা দিতে পুরোপুরি ‘ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সার্ভিস’ চালু থাকবে। বিশেষ করে সার্টিফিকেট অব ল্যান্ড (সিএলও) ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই সম্পূর্ণ নিরাপদ ও ডিজিটাল উপায়ে জমির সনদ ও সেবা পাবেন। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমি ব্যবস্থাপনা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক, ডিজিটাল এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। দেশটির ভূমি প্রশাসনের এ উন্নতির পেছনে রয়েছে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জিআইএস এবং সুনির্দিষ্ট ডেটা গভর্ন্যান্সের সফল প্রয়োগ।

 

জানা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়নে প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। সেটি সরকারের ‘সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্ক’ (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১) দলিলেও যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে অগ্রাধিকার পেয়েছে দেশব্যাপী ডিজিটালাইজড খতিয়ান ও নকশা জরিপ সার্ভে পরিচালনা এবং সমন্বিত ভূমি তথ্যব্যবস্থা উন্নয়ন, ভূমি অধিগ্রহণে সঠিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। লিজ ফির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে স্থাবর সম্পত্তির বাজারভিত্তিক মূল্যায়ন ও দুর্নীতি কমাতে জমির মালিকানার সার্টিফিকেট অব ল্যান্ড (সিএলও) প্রবর্তনের মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা। এ ছাড়া সরকারের উন্নত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এবং সুচারুভাবে সেবার জন্য একটি ভূমি ডেটাব্যাংক নির্মাণ করা। তবে দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে সংস্কৃতি এবং ভূমি প্রশাসন ইতিহাসের মিল থাকায় দুই দেশ ২০১২ সাল থেকে একসঙ্গে কাজ শুরু করেছে। ওই সময় একটি সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা হয়। এরপর ২০১৬ সালে ঋণ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার ওপর একটি প্রকল্প পরিচালনার জন্য কোরিয়া এক্সিম ব্যাংককে সম্পৃক্ত করা হয়। এ চুক্তির অধীনে ‘ডিজিটাল ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থা স্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়, যা বর্তমানে বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কোরিয়ার সিউলে বাংলাদেশের ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল সফর করে। ওই সময় কোরিয়ার ভূমি, অবকাঠামো ও পরিবহন মন্ত্রণালয়, কোরিয়া এক্সিম ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব কোরিয়া এবং কোরিয়ান রিয়েল এস্টেট বোর্ডের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশে ডিজিটালাইজড খতিয়ান ও নকশা জরিপ সার্ভে পরিচালনা ও সমন্বিত ভূমি তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়।