বিএনপি সরকার গঠনের পর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অপরাধমূলক কাজে সংশ্লিষ্টতার দায়ে মন্ত্রী বা এমপি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু এই পদত্যাগের মাধ্যমেই কি তাদের রাজনৈতিক ও আইনি দায় শেষ হয়ে যাচ্ছে–এখন সেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কিছু ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী এবং সংরক্ষিত আসনের একজন নারী সংসদ সদস্যকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে সংশয় থেকে যাচ্ছে।
সম্প্রতি, মাদকবিরোধী একটি অভিযানে অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ‘সিনেমাটিক অ্যাকশন’-এর ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। এই ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে নাটকীয়তা। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে প্রধান করে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ উপকমিশনার টাইমসকে জানিয়েছেন, এখনো তিনি এ সংক্রান্ত কোনো লিখিত নির্দেশ বা চিঠি পাননি।
অন্যদিকে, একটি হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন। তবে এক মাস পার হয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা করা হয়নি। ইতোমধ্যে খালি হওয়া ওই আসনে পিরোজপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এলিজা জামানকে দল থেকে নতুন সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারে শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি কঠোর বার্তা দিলেও বাস্তবে আইন প্রয়োগের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে সারা দেশে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি ও মাদক কারবারিদের দাপট আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা টাইমসকে জানান, অপরাধের পর প্রথম কাজ হলো প্রতিরোধ করা এবং তারপর আইন অনুযায়ী প্রতিকার। যে ঘটনাগুলোর স্পষ্ট ও প্রকাশ্য প্রমাণ রয়েছে, সেগুলোতে ব্যবস্থা নিতে দেরি করার অর্থ হলো অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করা।
তার মতে, সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করিয়ে প্রধানমন্ত্রী কড়া বার্তা দিয়েছেন সত্য। তবে সেটি মাঠে বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে পুলিশের তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশের এক কর্মকর্তাকে বদলি করার ঘটনা ঘটে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তারের অভিযানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র শাহাদাত হোসেন তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এরপরই খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রহিমকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করে চট্টগ্রামের বাইরে বদলি করা হয়।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও টানা আট মাস মেয়রের পদ ধরে রেখেছিলেন শাহাদাত। গত রোববার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে তাকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আদেশ জারি করা হয়।
এর আগে, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সুপারিশে (ডিও লেটার) চট্টগ্রামের সদরঘাট থানার ওসি মুহাম্মদ শরীফকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জনপ্রতিনিধিদের এমন হস্তক্ষেপ ও প্রভাবে মাঠপর্যায়ের পুলিশ অফিসারদের মনোবল ভেঙে পড়ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে যদি কোনো ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে এরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতাদের মতামত জানার চেষ্টা করা হলে স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং জ্যেষ্ঠ নেতারা প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে চাননি। তবে দলের এক যুগ্ম মহাসচিব জানান, দলীয় প্রধান তার জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন, এখন বাকি পদক্ষেপ নেবে পুলিশ ও প্রশাসন।
অস্ত্র হাতে ইশরাকের অভিযান ও তদন্ত নাটকীয়তা
গত ১৭ অক্টোবর ঢাকার গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন দয়াগঞ্জ এলাকায় মাদকবিরোধী একটি অভিযানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে অস্ত্র হাতে দেখা যায়। সেই ঘটনার ভিডিওটি তিনি নিজের ফেসবুকে পোস্ট করলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, ইশরাক অস্ত্র হাতে কয়েকজন মানুষকে তাড়া করছেন। অবশ্য পরবর্তীকালে ভিডিওটি মুছে ফেলে তিনি দাবি করেন, নিজের ও সঙ্গীদের আত্মরক্ষার্থেই তারা অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন।
এই ঘটনার পর ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাক হোসেনকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ইশরাক মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও নিজের কাজের জন্য কোনো দুঃখপ্রকাশ বা ভুল স্বীকার করেননি।
ঘটনার পর ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, বিষয়টি তদন্ত করতে ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং আইনি লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী টাইমসকে জানান, তদন্ত করার বিষয়ে তিনি এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত আদেশ হাতে পাননি।
হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এমপির পদত্যাগ ও মামলার প্রশ্ন
গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার মিরপুরে ‘রাড্ডা’ নামের একটি মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র লুটের পর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার নানা সেবা দিত। এই ঘটনার পর দেশজুড়ে চরম সমালোচনা শুরু হয়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে প্রমাণ পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ১ অক্টোবর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন। এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় বিএনপির সাবেক নেতা মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাত ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তরের পর ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, সেই মিষ্টির নাম মামলায় রাখা হয়নি।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার রাকিব খান টাইমসকে বলেন, মিষ্টির বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। যা বলার তদন্তের পর বলা যাবে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, মিষ্টির বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী চার্জশিট দেওয়া হবে। তিনি বলেন, দলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা আর আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবু হেনা রাজ্জাকী টাইমসকে জানান, অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ ছিল বলেই মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। দেশে আইন নিজের মতো চললে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতো। মামলা না হওয়ার অর্থ হলো আইনের স্বাভাবিক গতি কোথাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিনিধিদের আচরণ ও জবাবদিহি নিয়ে সংশয়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শাহাদাত হোসেনকে নিয়ে সম্প্রতি একাধিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর সন্ত্রাসী বগাকে গ্রেপ্তার করতে নগর ভবনে অভিযান চালায় পুলিশ। এই ঘটনার পর দিন শাহাদাত খুলশী থানার ওসির বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে সেই ওসিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শাহাদাত প্রকাশ্যে ওই সন্ত্রাসীকে ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে আখ্যা দেন।
এ ছাড়া ৭ অক্টোবর অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে এক গাড়িচালককে কান ধরে উঠবস করান শাহাদাত হোসেন। একই দিনে তাকে সড়ক ও ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানে এক ট্রাফিক পুলিশ অফিসারকে শাসাতে দেখা যায়।
অন্য এক ঘটনায়, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নিজের এলাকা না হওয়া সত্ত্বেও সুপারিশ করে সদরঘাট থানার ওসি মোহাম্মদ শরীফকে সরিয়ে দেন। যোগদানের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় গত ৫ জুলাই ওই অফিসারকে সরিয়ে দেওয়ায় প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এলাকাটি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সংসদীয় এলাকা হওয়ায় এই ঘটনা নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।