নাম দেওয়া হয়েছে ‘নাগরিক মতবিনিময় সভা’, আর আয়োজক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কিন্তু রাজধানীর গ্রিনরোডের কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টার কমিউনিটি সেন্টারে সোমবার অনুষ্ঠিত এই সভায় সাধারণ নাগরিকদের দেখা মেলাই ছিল ভার।
প্রথমে মন্ত্রী বক্তব্য দিয়ে চলে যেতেই দর্শকসারির এক-তৃতীয়াংশ খালি হয়ে যায়। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম কথা বলেন এবং দর্শকসারিতে মাইক দেওয়া হয়। কিন্তু যাদের কথা শোনার জন্য এই আয়োজন, সেই সাধারণ বাসিন্দাদের সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি। দর্শকসারিতে উপস্থিত প্রায় সবাই ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মী।
মাইক হাতে নিয়েই নেতারা প্রশাসনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে প্রশাসক নিজেই বলে ওঠেন, ‘আপনারা প্রশংসার বদলে এলাকার সমস্যার কথা বলুন। এখানে সব বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আছেন, তারা তাৎক্ষণিক সমাধান দেবেন।’
পুরো ঘটনাটি দেখলে মনে হতে পারে এটি একটি নাগরিকবান্ধব উদ্যোগ, কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি আসলে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগাম দলীয় প্রস্তুতি।
কাগজে-কলমে ধানমন্ডি, কলাবাগান, নিউমার্কেট, শাহবাগ ও রমনা এলাকার বাসিন্দাদের নিয়ে এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংবাদকর্মীদের দাওয়াত দেওয়া ছাড়া সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এলাকার সাধারণ মানুষদের এই সভার বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। মিলনায়তনে উপস্থিত লোকজনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে। আর বাকিদের অনেকেই আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হতে আগ্রহী। এমনকি প্রশাসক আবদুস সালাম নিজেও মেয়র নির্বাচন করতে চান। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এরই মধ্যে তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রকাশ্যে ঘোষণাও দিয়েছেন।
যাদের সমস্যার কথা শোনার জন্য এই আয়োজন, সেই সাধারণ মানুষ এর কিছুই জানতেন না। ধানমন্ডির মধুবাজারের বাসিন্দা আব্দুর রায়হান মিলন জানান, এমন কোনো সভার খবর সাধারণ নাগরিক হিসেবে তারা পাননি বা কোনো প্রচারও তাদের চোখে পড়েনি। নিউ এলিফ্যান্ট রোডের বাসিন্দা ফাইয়াজ আহমেদ সামিনও একই কথা বলেন। জানলে তিনি নিজের এলাকার কিছু সমস্যার কথা জানাতে সেখানে যেতেন।
ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও রমনা এলাকার অন্তত ২৫ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবাই একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তাদের মতে, সভা হওয়া ভালো, কিন্তু প্রচার না চালিয়ে কেবল দলীয় লোকদের নিয়ে সভা করার কোনো যুক্তি নেই।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান টাইমসকে জানান, নতুন প্রশাসক আসার পর এটি এ ধরনের ষষ্ঠ আয়োজন। আগের পাঁচটি সভার নাম ছিল ‘গণশুনানি’। উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় প্রশাসক সরাসরি নাগরিকদের ভোগান্তির কথা শুনতে চেয়েছেন।
তিনি জানান, সভায় প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাসহ সব বিভাগের প্রধানেরা উপস্থিত থাকেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সাধারণ নাগরিকদের না জানিয়ে কেবল দলীয় লোকদের উপস্থিতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্বীকার করেন, আগের সভাগুলোতে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হলেও এবার তা করা হয়নি। বাসিন্দারা কীভাবে জানবেন–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সাবেক প্রতিনিধি ও স্থানীয় এমপির লোকজনের মাধ্যমে খবর পৌঁছানোর কথা ছিল। আর উপস্থিত লোকজন দলীয় হলেও দিনশেষে তারাও এই শহরেরই নাগরিক।
সভা শেষে সিটি করপোরেশন থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। বিজ্ঞপ্তির শিরোনাম ছিল: ‘নাগরিকদের সরাসরি মুখোমুখি ডিএসসিসি প্রশাসক: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে ১৫-২১ নম্বর ওয়ার্ডের নাগরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত।’
এতে বলা হয়, ওয়ার্ড প্রতিনিধি ও বাসিন্দারা জলাবদ্ধতা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন এবং প্রশাসক ধৈর্য ধরে তা শুনে দ্রুত সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, কোনো প্রচারণা না চালিয়ে আগেই নেতাদের নামের তালিকা করে সভায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ফলে সাধারণ মানুষের কথা কেউ শুনতেই পায়নি।
রাজনৈতিক দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে এই নাগরিক সংলাপে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক আবু হোসাইন মুহাম্মদ আহসান টাইমসকে বলেন, এমন আয়োজন হলে সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যা উঠে আসে না। বরং নেতাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চাওয়া-পাওয়াগুলোই প্রাধান্য পায়। ফলে রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো ঢাকা পড়ে যায়।
এদিকে সভার প্রধান অতিথি মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বেলা ১১টা ৫ মিনিটে আসেন। তিনি মাত্র ৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ড বক্তব্য দেন। তিনি জানান, তিনি সারা দেশের পরিবহন ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করলেও নিজের নির্বাচনী এলাকায় কাজ করতে সিটি করপোরেশনের প্রয়োজন হয়। তিনি সবাইকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে পুরো শহরের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সত্যিকারের সমস্যা তুলে ধরার আহ্বান জানান। বক্তব্য শেষ করেই বেলা ১১টা ২০ মিনিটে তিনি বের হয়ে যান। মন্ত্রী নামার সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রটোকল দিতে আসা অন্তত ২৫ জন সমর্থকও দৌড়াদৌড়ি করে তার পেছনে বেরিয়ে যান।
মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর মিলনায়তনে প্রায় ৫০ জনের মতো উপস্থিত ছিলেন, যাদের সবার গলায় ঝুলছিল বিশেষ কার্ড। পরবর্তী এক ঘণ্টায় কথা বলা অন্তত ছয়জন বক্তার সবাই ছিলেন এলাকার বিএনপির পদধারী নেতা–কেউ সভাপতি, কেউ আহ্বায়ক, আবার কেউ সাধারণ সম্পাদক। তারা এলাকার কিছু সমস্যার কথা বললেও প্রশাসক সালামের প্রশংসায় বেশি ব্যস্ত ছিলেন।
এমনকি এক নেতা দাবি করেন, তার এলাকায় আর কোনো মশা নেই। যদিও বাস্তবে এই দাবির কোনো সত্যতা মেলেনি।
তারা নিজেদের ‘জনপ্রতিনিধি’ দাবি করে কথা বললে প্রশাসক আবদুস সালাম তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আগে নির্বাচনে জিতে কাউন্সিলর হন, তারপর দায়িত্ব দেওয়া হবে।’ তবে তিনি প্রকৌশলীদের উদ্দেশে বলেন যে অভিযোগের ফাইলে নেতাদের নাম আছে, তারা তাদের সঙ্গেই যোগাযোগ করে কাজ সম্পন্ন করবেন।
সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে এই ধরনের দলীয় সভার সমালোচনা করেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ টাইমসকে বলেন, দলীয় লোকদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিলে এমন আচরণই স্বাভাবিক। জনগণের সম্পদ ব্যবহার করে নাগরিক সভার নামে দলীয় সভা করা অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক, অন্যায় ও নিন্দনীয়। অধ্যাপক আবু হোসাইন মুহাম্মদ আহসানও যোগ করেন, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকারি সেবা বা স্থাপনা ব্যবহার করা দুর্নীতির শামিল।