সরকারি চাকরিতে অনুমোদিত পদের চেয়ে খালি আছে এক-চতুর্থাংশের বেশি। অঙ্কের হিসাবে খালি প্রায় ৫ লাখ পদ। এ সংখ্যা অনুমোদিত পদের ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ পদের মধ্যে ২৬ বা ২৭টিতে জনবল নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব পদে দ্রুত নিয়োগের কাজ চলছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি চাকরিতে লোক নিয়োগে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খালি পদে জনবল নিয়োগ পেলে সরকারি সেবা যেমন সহজ হবে, তেমনি বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান হবে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যপত্র সূত্রে জানা যায়, দেশের সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে। মোট অনুমোদিত ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। এসব শূন্য পদ পূরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী নিজ দপ্তরে সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার শূন্য পদ পূরণ নিয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করতে সব প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে চাইলেও অনেক সময় দ্রুত করা যায় না। একটি পদের বিপরীতে শত শত আবেদন করা হয়। যাচাইবাছাই, লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা-এসব করতে সময় লাগে। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কার্যক্রমে মামলা, রিট এসব আইনি জটিলতা থাকে। এসব বাধা কাটিয়ে সরকার কাজ করছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর-সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে শূন্য পদ পূরণে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে ২ হাজার ৮৭৯টি শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এ সময়ে পূরণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬১টি পদ। সরকারের ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রায় জনপ্রশাসনে ৩৫, দপ্তর/সংস্থায় ১০৪৫ এবং মাঠ প্রশাসনে ৯৮১টি শূন্য পদে নিয়োগ দিয়েছে। নিয়োগ নিয় বড় সংকট রয়েছে দেশের মাঠ প্রশাসনে। বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়সহ মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে ৪১ হাজার ৭৫৫টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত জনবল ২৭ হাজার ১৭৭ জন। ১৪ হাজার ৫৭৮টি পদ খালি।
সেখানে শূন্যতার হার প্রায় ৩৫ শতাংশ, যার ফলে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগরিক সেবা। তবে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান এবং মাঠ প্রশাসনে ৪ হাজার ৪৫৯টি শূন্য পদে নিয়োগ দিতে চায় সরকার। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ঝুলে থাকা নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারি শূন্য পদ পূরণ করলে যে পরিবার থেকে চাকরি পাচ্ছে সেই পরিবার আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, দেশের বেকার কমবে। তাই দ্রুত এসব পদে নিয়োগে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একটা পরিবার থেকে একজন চাকরি পেলে ওই পরিবার গড়ে চারজন করে উপকার পেলেও কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন।
জানা গেছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিপুলসংখ্যক মামলা। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীও বলেন, মামলা এবং রিটের কারণে অনেক স্থানে নিয়োগ কার্যক্রমে বিলম্বের কথা। জানা গেছে, বর্তমানে জনপ্রশাসন সচিবের নামে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১ হাজার ৬১৮টি মামলা এবং ২৭৬টি আদালত অবমাননার মামলা চলমান, যা নিয়োগ প্রক্রিয়া গতিশীল করার ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মামলাগুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এই বিশাল শূন্য পদের খবর এবং তা পূরণে সরকারের নতুন কর্মপরিকল্পনা দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত বেকারের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকলে এক বছরে শূন্যপদ পূরণ সম্ভব : সরকারি প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদ পূরণে সদিচ্ছা আর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকলে এক বছরের মধ্যে সব শূন্যপদ পূরণ সম্ভব বলে মনে করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে। এ নিয়ে করণীয় জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে সাবেক এই সচিব বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠানে নানা কারণে পদ ফাঁকা থাকে। এর মধ্যে সরকারকে ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণও করতে হয়। যদি প্রতিষ্ঠানটির জন্য অনিবার্য হয়ে পড়ে তবে ওই ১০ শতাংশও পূরণ করা যায়।’ কী কী কারণে পদ ফাঁকা থাকে তা বলতে গিয়ে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করে এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে অনেক সময় শূন্যপদের হিসাব আপডেট থাকে না। কে কোন সময় অবসরে যাচ্ছেন সে মোতাবেক আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া থাকে না। প্রতিষ্ঠানগুলোর সদিচ্ছার অভাব থাকে। এ ছাড়া রাজনৈতিক চাপের ভয়ে অনেকের নিয়োগ পরীক্ষা বা কার্যক্রম নিয়ে অনীহা থাকে।’
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘সিভিল সার্ভিস বলতে শুধু আমলাদের বোঝায় অনেকে। তবে আমি বলব সব বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী যাদের অনেকেই ভালো, অনেকেই দুর্নীতির সুযোগও খোঁজেন। যারা দুর্নীতিবাজ তারা হিসাব মেলান এই নিয়োগ দিলে তার কী লাভ হবে। আর্থিকভাবে বা কোনো স্বজনকে নিয়োগ দিতে না পারলে ওই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারও নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে আগ্রহ থাকে না। তবে সরকার একান্তভাবে চাইলে, প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হলে মাত্র এক বছর লাগবে এসব পদ পূরণ করতে।’
তিনি বলেন, ‘৫ লাখ পদ একক কোনো প্রতিষ্ঠানে খালি নয়। সরকারি অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে খালি। সবাই আলাদা উদ্যোগ নেবে এবং দ্রতই পূরণ করতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘একটি চাকরি শুধু বেকারকে স্বাবলম্বী করা নয়, ওই পরিবার এমনকি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও কয়েকটি পরিবার উপকৃত হয়। একটি পরিবারে চাকরির মাধ্যমে অনেকের স্বজনরাও উপকৃত হয়। তাই শূন্যপদ পূরণ করা জরুরি। দেশে বেকারত্ব বাড়ছে এবং শিক্ষিত বেকার বাড়ছে এটি কমিয়ে রাখতে হবে।’