Image description

টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতায় বিপর্যস্ত দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। চাল, ডাল, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য কিনতেই সীমিত আয়ের মানুষের হাত খালি হয়ে যাচ্ছে। দিনশেষে সঞ্চয় থাকছে না কিছুই। নিত্যপণ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে কাটছাঁট করতে হচ্ছে পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, আবাসন কিংবা ভ্রমণের মতো অনাবশ্যক খাতগুলোতে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শুধু পোশাকের বাজারেই নয়, খুচরা ও সেবা খাতের প্রায় সব ধরনের ব্যবসাবাণিজ্যেও।

অর্থনৈতিক সূচকগুলোর সার্বিক নিম্নমুখী প্রবণতায় সংকুচিত হচ্ছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যার চাপ অনুভূত হচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, গত চার বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ ছাড়া, দেশে প্রায় সোয়া ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থনীতির দুর্বলতার চাপ সরাসরি পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রায়। দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানিসংকট, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এতে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

শুধু আইএমএফ নয়, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) তুলনামূলক কম প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এডিবি বলেছে, এবার প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ শতাংশ। এই দুই সংস্থার পূর্বাভাসের চেয়ে কম প্রবৃদ্ধির কথা বলেছে আইএমএফ। সরকার চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছে। গত অর্থবছরে সরকারি হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জন্য আইএমএফ যে পূর্বাভাস দিয়েছে, গত সাড়ে তিন দশকে বাংলাদেশে এত কম প্রবৃদ্ধি হয়নি। 

আবার মূল্যস্ফীতির যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, গত দেড় দশকের মধ্যে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতিতে সর্বোচ্চ। টানা কয়েক মাস ধরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের ওপরে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ থেকে ১১ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। খাদ্যের চড়া দামেই পিষ্ট ভোক্তা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধীর গতি এখনই টের পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরগতি হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে গেছে এবং প্রকৃত আয় কমেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়ের কারণে নতুন করে বহু নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। অতি প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাওয়া এই জনগোষ্ঠীর কাছে পোশাক বা ইলেকট্রনিক্স পণ্য কেনা এখন বিলাসিতার শামিল।

ধস নেমেছে গৃহস্থালি ইলেকট্রনিক্স ও টেকনোলজি খাতে : অন্যান্য খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইলেকট্রনিক্স ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজার। রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন ও ওভেনের মতো দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার্য পণ্যের বিক্রি বিগত সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট ও স্টেডিয়াম মার্কেটের ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীরা জানান, কিস্তি সুবিধায় পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকলেও কিস্তির টাকা জোগাড় করার দুশ্চিন্তায় ক্রেতারা নতুন কেনাকাটা এড়িয়ে চলছেন।

বিশেষজ্ঞ মতামত : অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবাহ সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত সঞ্চয়কে শেষ করে দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে খাদ্যপণ্যের দর সহনীয় না করা পর্যন্ত এবং সামগ্রিক বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও প্রকৃত আয় বৃদ্ধি না পেলে শুধু পোশাক নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ খুচরা ও বহুমুখী সেবা খাতের এই স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিট। এটা অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ। সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না। মূল্যস্ফীতি বশে আনতে হবে। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য জরুরিভাবে কাজ করতে হবে। বেসরকারী বিনিয়োগ প্রায় স্থবির। জ্বালানি দীর্ঘমেয়াদে আমদানি করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা কঠিন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানিসংকট, বিশৃঙ্খল বাজেট ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এসব বিষয়ে সংস্কার প্রয়োজন। পরিস্থিতি এভাবে চললে আগামীতে সংকট আরও বাড়বে।