কক্সবাজারের আলোচিত ও আত্মস্বীকৃত ইয়াবা কারবারি শাহজাহান আনসারী। ইয়াবা কারবার করে কয়েক বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে তার। মাদক কারবারের কালোটাকা সাদা করতে নেমেছে হোটেল ব্যবসায়। কক্সবাজারের কলাতলী এলাকায় নির্মাণ করে লেগুন বিচ এবং জামান হোটেল নামে দুটি হোটেল। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শাহজাহান আনসারী ও তার স্ত্রী জিগারুননেছা জিনিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। শুধু শাহজাহান আনসারী নয়, পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ ধরে কলাতলী ও ইনানী সৈকতের অসংখ্য বিলাসবহুল হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ করেছে মাদক কারবারিরা। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই বিলাসবহুল হোটেল-রিসোর্টগুলোর বড় একটি অংশের নির্মাণ ব্যয় মেটানো হচ্ছে মাদক কারবারের কালোটাকায়। অবৈধ ইয়াবা কারবারের টাকা সাদা করতেই মাদক মাফিয়ারা অভিনব এ কৌশল অবলম্বন করছে।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ-মাদক কারবারিরা অবৈধ অর্থ বৈধ করতে পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিআইডি এবং দুদকের গোপন নথিপত্র ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানেও এই অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। কক্সবাজারের ৮০ জন মাদক কারবারির অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে অনুসন্ধান করছে দুদক। এ বিষয়ে কক্সবাজার অঞ্চলের উপপরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মাদক কারবারির অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। আবার কিছু মামলার চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে মাদক কারবারিরা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছে মাদক থেকে অর্র্জিত কালোটাকা। যার মধ্যে হোটেল-রিসোর্ট খাতও রয়েছে।’ কক্সবাজারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দায়ের হওয়া কিছু মামলার তদন্ত এবং কিছু অনুসন্ধান করছে সিআইডি। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে নানান খাতে বিনিয়োগ করেছে কারবারিরা। তদন্তগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।’ অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজারের মতো পর্যটন এলাকায় জমির দাম ও হোটেলের চাহিদা কয়েক দশক ধরে ঊর্ধ্বমুখী। ফলে এ খাতে বিনিয়োগ লাভজনক ও নিরাপদ। এ ছাড়া দৃশ্যমান একটি বৈধ ব্যবসা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহ এড়িয়ে চলা সহজ হয়।
হোটেলের আড়ালে ইয়াবার বড় চালান লেনদেন ও গোপন বৈঠক করাও কারবারিদের জন্য সুবিধাজনক। মাদকের কালোটাকা সাদা বা বৈধ করার জন্য হোটেল ব্যবসাকে একটি নিখুঁত ‘লন্ড্রোম্যাট’ হিসেবে ব্যবহার করছে কারবারিরা। হোটেল, রিসোর্ট, কটেজে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মাদক কারবারিরা কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করে। প্রথমে নিজেদের নামে জমি না কিনে স্ত্রী, শ্যালক, ভাই বা দূরের কোনো আত্মীয়ের নামে জমি কেনে। পরে ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে বস্তা ভর্তি নগদ টাকায় রড, সিমেন্ট ও নির্মাণসামগ্রী কেনা হয়। ফলে এই টাকার কোনো বৈধ উৎস দেখাতে হয় না। হোটেল বা কটেজ নির্মাণের পর তারা কাগজপত্রে দেখায় যে সারা বছর তাদের হোটেল পর্যটকে ভরপুর থাকে। খাতায় ভুয়া অতিথিদের নাম লিখে বুকিংয়ের টাকা হিসেবে মাদকের টাকা ব্যাংকে জমা করা হয়।
এভাবেই ইয়াবা বিক্রির কালোটাকা হোটেলের ‘বৈধ আয়’ হিসেবে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবেশ করে এবং পুরোপুরি সাদা হয়ে যায়। সিআইডি (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট অনুসন্ধানকারী বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, কক্সবাজার ও টেকনাফকেন্দ্রিক অন্তত তিন শতাধিক ইয়াবা গডফাদার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। কলাতলী কটেজ জোন এবং মেরিন ড্রাইভ এলাকায় এদের অন্তত ১৫০টি বেনামি কটেজ ও রিসোর্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। জানা যায়, ২০০০ সালে কক্সবাজারে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজ ছিল দুই শতাধিক। ২০১০ সালে সংখ্যা বেড়ে হয় প্রায় ৫০০।
২০২০ সালে তা বেড়ে হয় ১ হাজার। বর্তমানে কক্সবাজারে হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। এর মধ্যে কক্সবাজার শহরের প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে ৫৩৭টি। শহরের বাইরে মেরিন ড্রাইভ ধরে হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক ও টেকনাফেও ব্যবসা ছড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের মেরিন ড্রাইভ এলাকায় নতুন করে গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মাদক কারবারের অবৈধ টাকা বৈধ করতেই হোটেল এবং রিসোর্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে কারবারিরা। অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় তাদের এ কৌশলকে বলা হয় রেশনাল চয়েজ।’
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজার অঞ্চলের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, ‘মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বেশ কয়েকটি অনুসন্ধান এবং দায়েরকৃত মামলার তদন্ত করছে। অনুসন্ধানে কক্সবাজার অঞ্চলের মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদ এবং বিনিয়োগ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে মাদক কারবারিরা হোটেল, রিসোর্টসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছে মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থ।’ এ বিষয়ে কথা হয় মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে অনুসন্ধান করছেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদক কারবারি হিসেবে সমাজে যে নেতিবাচক পরিচিতি থাকে, একজন হোটেল মালিক হিসেবে তা সহজেই ঢাকা পড়ে। এই পরিচয়ের আড়ালে তারা স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের প্রভাবশালী মহলে জায়গা করে নেয়।
কেস স্টাডি : ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাদক কারবারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমদ ভুট্টোর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। একই সময় হৃীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী এলাকার মাদক কারবারি মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করে। দুইজনেরই হোটেল ব্যবসায় বিনিয়োগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৫ জুন ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন কক্সবাজারের মেরিন ইকো রিসোর্টের মালিক কাজী জাফর সাদেক ওরফে রাজু। অভিযানে তার আরও চার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৮ হাজার ৮১২টি ইয়াবা। একই বছরের ২ নভেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পাঁচ মাদক কারবারির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। তারা হলেন টেকনাফ নাজিরপাড়ার আবদুর রহমান, মো. ইসলাম, শীলবনিয়া পাড়ার সাইফুল ইসলাম, মৌলভীপাড়ার একরাম হোসেন এবং আবদুর রহমান। তাদের প্রত্যেকের হোটেল ব্যবসায় বিনিয়োগ রয়েছে। একই বছর আলম নামে এক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়ে। সে কক্সবাজার রিসোর্ট নামে একটি রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করতেন।