Image description

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের বিষয়। নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীন সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতা, নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা এবং বিরোধী দলের আস্থার সংকট—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক আবর্তিত হয়েছে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্নটি কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সমতা, রাজনৈতিক আস্থা, সাংবিধানিক বৈধতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা।

জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের ভিত্তিতে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব প্রণয়ন এবং পরবর্তী আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে অষ্টাদশ সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপনের পথ প্রস্তুত করা এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কমিটি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের মাধ্যমে তাঁদের মতামত সংগ্রহ করছে।

এর ধারাবাহিকতায় গত ২৪ অক্টোবর সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সম্ভাব্য উচ্চকক্ষকে এ সরকার গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার একটি ধারণা আলোচনায় আসে।

প্রস্তাবটির একটি সম্ভাব্য রূপ হলো—উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে উচ্চকক্ষের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া এবং সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা; পাশাপাশি উচ্চকক্ষ থেকে অন্যান্য উপদেষ্টা নির্বাচন করা।

কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করা হবে। তবে আলোচনায় উঠে আসা প্রস্তাবগুলোর চূড়ান্ত সাংবিধানিক কাঠামো এখনো নির্ধারিত হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্ন হলো, সম্ভাব্য উচ্চকক্ষকে ভিত্তি করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করলে তার নিরপেক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

তত্ত্বাবধায়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের ধারণা

 

‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ সাধারণত নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া বা সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা করে। অন্যদিকে, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ শুধু নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠিত হয় না; সামরিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ, রাজনৈতিক সংকট নিরসন কিংবা সাংবিধানিক রূপান্তরের সময়ও এ ধরনের সরকার দায়িত্ব পালন করতে পারে।

সব দেশে নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার পদ্ধতি এক নয়। কোথাও বিদায়ী সরকারই সংযমের নীতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করে, আবার কোথাও পৃথক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতা অনুযায়ী ভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

 

বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা কী বলে?

 

যুক্তরাজ্যে লিখিত একক সংবিধানের পরিবর্তে আইন, সাংবিধানিক রীতিনীতি ও প্রচলিত প্রথার সমন্বয়ে সরকার পরিচালিত হয়। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য আলাদা কোনো সাধারণ সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেই। যুক্তরাজ্যে কেয়ারটেকার কনভেনশন্স বা তত্ত্বাবধায়ক রীতি অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সময়ে অথবা নতুন সরকার গঠনের মধ্যবর্তী পর্যায়ে ক্ষমতাসীন সরকার রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে নির্বাচনকালীন সময়ে এবং নতুন সরকার গঠনের মধ্যবর্তী পর্যায়ে প্রচলিত সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত, দীর্ঘমেয়াদি দায় সৃষ্টি করতে পারে এমন পদক্ষেপ এবং বিতর্কিত নিয়োগের ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শন করতে হয়।

 

এ ব্যবস্থায় সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, কিন্তু নির্বাচনকালীন প্রশাসন পরিচালনার জন্য পৃথক নির্দলীয় সরকার গঠন করা হয় না।

 

কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াতেও নির্বাচনকালীন পৃথক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে বিদায়ী সরকার দায়িত্ব পালন করে। এ সময় সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, চুক্তি এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযমের রীতি অনুসরণ করা হয়। প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে পরামর্শের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। ভারতেও পৃথক নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সাধারণ সাংবিধানিক বিধান নেই। বিদ্যমান সরকার দায়িত্বে বহাল থাকে; তবে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা করে এবং নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী আচরণবিধির মাধ্যমে সরকারি ক্ষমতা ও সম্পদের নির্বাচনী ব্যবহারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে ভারতের ক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন সরকারের পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ভূমিকা এবং আচরণবিধির কার্যকারিতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ

জার্মানির ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার একটি সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। দেশটির সংবিধানের ৬৯(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির অনুরোধে চ্যান্সেলর অথবা চ্যান্সেলর বা রাষ্ট্রপতির অনুরোধে কোনো মন্ত্রী তাঁর উত্তরসূরি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত নিজ নিজ দপ্তরের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে বাধ্য থাকবেন। তবে এটি পৃথক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা নয়; বরং নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সাংবিধানিক পদ্ধতি। জার্মানির বিপরীতে, ইতালির সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট সীমা বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন এবং বিদায়ী মন্ত্রিসভাকে ‘চলমান বা নিয়মিত রাষ্ট্রীয় কার্যাবলি পরিচালনা’—করার জন্য দায়িত্বে বহাল থাকতে নির্দেশ দেন।

প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বতন্ত্র নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে রাজনৈতিক সংকটপ্রবণ দেশগুলোর ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস, নির্বাচন নিয়ে বিরোধ, ক্ষমতাসীন দলের প্রশাসনিক প্রভাব, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংকট এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের অনিশ্চয়তা একটি গ্রহণযোগ্য সাময়িক সরকারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক ইতিহাস রয়েছে। নেপালে রাজনৈতিক সমঝোতা ও সাংবিধানিক ভিত্তিতে একাধিকবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। ১৯৯০-৯১ সালের গণআন্দোলনের পর কৃষ্ণ প্রসাদ ভট্টরাইয়ের নেতৃত্বে, ২০০৭ সালে গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরণের লক্ষ্যে গিরিজা প্রসাদ কৈরালার নেতৃত্বে এবং ২০১২ সালে প্রথম গণপরিষদ বিলুপ্তির পর নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ২০১৩ সালে খিল রাজ রেগমির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এসব সরকার নেপালের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সাংবিধানিক রূপান্তরে ভূমিকা রাখে। তবে এগুলো প্রচলিত অর্থে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সমতুল্য নয়।

 

অন্যদিকে, পাকিস্তানের সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। ২০১০ সালের অষ্টাদশ এবং ২০১২ সালের বিংশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে। পাকিস্তানের সংবিধানের ২২৪ ও ২২৪এ অনুচ্ছেদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নিয়োগ, সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে পরামর্শ এবং মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত না হলে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে একমত হতে না পারলে সংসদীয় কমিটি এবং পরবর্তী পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

 

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার তাৎপর্য শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধানে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নিয়োগ নিয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে কীভাবে তা নিরসন করা হবে, সে বিষয়ে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নির্ধারণের মধ্যেও এর গুরুত্ব নিহিত। একই সঙ্গে কোনো দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান থাকলেই নির্বাচন অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হবে এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা, প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

উচ্চকক্ষভিত্তিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার: সম্ভাবনা ও প্রশ্ন

উল্লিখিত দেশগুলোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচ্য প্রস্তাবের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তানে রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিকল্প সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বিদ্যমান সরকার নির্বাচনকালীন সংযমের নীতি অনুসরণ করে। ভারতে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

বাংলাদেশের আলোচ্য প্রস্তাবটি এসব ব্যবস্থার কোনোটিরই সরাসরি অনুকরণ নয়; বরং সম্ভাব্য উচ্চকক্ষকে ভিত্তি করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা।

প্রস্তাবটির সম্ভাব্য যুক্তি হলো, উচ্চকক্ষের মেয়াদ যদি নিম্নকক্ষের মেয়াদের সঙ্গে একযোগে শেষ না হয়, তাহলে নিম্নকক্ষ ভেঙে যাওয়ার পরও একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কার্যকর থাকতে পারে। সেই প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি, সদস্যদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, মেয়াদ এবং ক্ষমতার ওপর।

 

উচ্চকক্ষ যদি মূলত ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে শুধু সেই কক্ষের অস্তিত্ব নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারবে না। আবার উচ্চকক্ষের সদস্যরা সরাসরি নির্বাচিত হলে তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ ও দলীয় আনুগত্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। অতএব, উচ্চকক্ষের গঠন ও প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি নির্ধারণের সময় এর নির্বাচনকালীন ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। স্পিকার নির্বাচনের পদ্ধতি কী হবে? তাঁর নিরপেক্ষতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? তিনি কি একই সঙ্গে উচ্চকক্ষের স্পিকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, নাকি একটি পদ থেকে সরে গিয়ে অন্য দায়িত্ব গ্রহণ করবেন? তাঁর অপসারণের শর্ত, দলীয় কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার বাধ্যবাধকতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি কী হবে? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট সাংবিধানিক উত্তর ছাড়া শুধু পদাধিকারীর পরিচয়ের ভিত্তিতে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা কঠিন।

 

একইভাবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, তা-ও নির্ধারণ করতে হবে। সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে উপদেষ্টা নির্বাচন করা হলে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে; কিন্তু সম্মতি প্রতিষ্ঠিত না হলে কী হবে, তা আগেই নির্ধারণ করা জরুরি।

 

কোনো পক্ষকে অনির্দিষ্টকাল নিয়োগপ্রক্রিয়া আটকে রাখার সুযোগ দেওয়া হলে সরকার গঠন নিয়েই নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের মতো সময়সীমাবদ্ধ বিকল্প প্রক্রিয়া বিবেচনা করা যেতে পারে, যদিও বাংলাদেশের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষভিত্তিক কাঠামোর সঙ্গে তা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা পৃথকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

 

বাংলাদেশের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনা

বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগের ব্যবস্থা থাকলে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। ঐকমত্য ব্যর্থ হলে সংসদীয় কমিটি, নির্বাচন কমিশন বা অন্য কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

দ্বিতীয়ত, উচ্চকক্ষকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হলে এর সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি, দলীয় প্রতিনিধিত্ব, মেয়াদ এবং স্পিকারের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান থাকা দরকার। উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়াকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার স্বয়ংক্রিয় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা না করে উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য পৃথক যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করা যেতে পারে।

 

তৃতীয়ত, নির্বাচনকালীন সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট করতে হবে। দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা এবং সরকারি সেবা সচল রাখা হবে এর প্রধান দায়িত্ব। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তন, বিতর্কিত নিয়োগ, বড় আর্থিক দায় সৃষ্টি এবং নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকা প্রয়োজন। জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকলে তার যৌক্তিকতা, নথিভুক্তকরণ ও পরবর্তী পর্যালোচনার ব্যবস্থাও নির্ধারণ করতে হবে।

 

চতুর্থত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন কমিশনের বিকল্প নয়। নির্বাচনের তফসিল, ভোটগ্রহণ, ফলাফল ঘোষণা এবং নির্বাচনী অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা ও বাস্তব স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট না হলে নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।

 

পঞ্চমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কখন দায়িত্ব গ্রহণ করবে, কত দিন দায়িত্ব পালন করবে, কোন পরিস্থিতিতে মেয়াদ বাড়ানো যাবে এবং নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে—এসব বিষয়ও সংবিধানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। জরুরি অবস্থার মতো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে মেয়াদ বাড়ানোর বিধান থাকলে তার জন্য নির্দিষ্ট অনুমোদন ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা উচিত।

 

নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা কাঠামোয়, শুধু পদে নয়

 

বাংলাদেশের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে চলমান আলোচনা শুধু কে সরকারপ্রধান হবেন, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। মূল বিবেচ্য বিষয় হলো, কীভাবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যা ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রাখবে এবং নির্বাচনকালীন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে।

 

যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার জন্য একটিমাত্র সর্বজনীন মডেল নেই। প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, সাংবিধানিক কাঠামো, দলীয় প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ভিন্ন। তাই অন্য দেশের কোনো ব্যবস্থাকে হুবহু অনুকরণ করার পরিবর্তে তার কার্যকর উপাদানগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতায় কীভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

 

উচ্চকক্ষভিত্তিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সম্ভাবনা সামনে এনেছে। তবে উচ্চকক্ষের অস্তিত্ব কিংবা কোনো নির্দিষ্ট পদাধিকারীকে সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করলেই নিরপেক্ষতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে না। এর সাফল্য নির্ভর করবে নিয়োগপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের ব্যবস্থা, নির্বাহী ক্ষমতার সীমা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং কার্যকর জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।

 

সাংবিধানিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা কোনো ব্যক্তি বা দলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না থেকে সুস্পষ্ট সাংবিধানিক বিধান ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়।

 

  • লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়