‘বাপের সাথে শেষ ছবি’- ক্যাপশনে বাবার সঙ্গে তোলা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি নিহত জাহাঙ্গীরের মেয়ে নওশীন রাত্রি। দীর্ঘ ওই পোস্টে বাবাকে হারানোর শোক, মায়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদ এবং হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পোস্টে রাত্রি লিখেন, ‘আমি খুব বেশি কথা বলতে পারি না। নিজের মনের কষ্টটাও ঠিকমতো কাউরে বুঝাইতে পারি না। কিন্তু আমার বাবারে আমি কতটা মিস করি, সেইটা কাউরে বুঝাইতে পারব না। খাইতে বসলে বাবার কথা মনে পড়ে, কোনো কিছু করতে গেলেই বাবার কথা মনে পড়ে। চার মাস হইয়া গেল, বাবা আর ফোন দিয়া জিগায় না, ‘মা, কী করো?’ তাও মাঝে মাঝে মনে হয়, এই বুঝি ফোন আসব। এই বুঝি বাবা আগের মতো কথা কইব। কিন্তু ফোন আর আসে না। বাবা আর কোনো দিন ফোন দিব না, আমি ঘুমাইতে পারি না!’
মায়ের সম্পর্ক টেনে তিনি লিখেন, ‘আমার মা আসলে কাউরে জোর কইরা ফাঁসাইয়া দেওয়ার মানুষ না। উনি একজন শান্তিপ্রিয়, ঘরোয়া মানুষ। সারাজীবন নিজের পরিবার নিয়াই থাকছে। আজ স্বামীকে হারাইয়া উনি নিজেই এত বড় কষ্টের মধ্যে আছেন- তারপরও উনারে নিয়া মিথ্যা কথা বলা, উনার দিকে আঙুল তোলা এত সহজ কেমনে হয়?’
রাত্রি বলেন, ‘আমার মায়েরে নিয়া কথা বলার আগে নিজের বিবেকরে প্রশ্ন করেন। স্বামী হত্যার বিচার চাওয়া যদি অপরাধ হয়, তাইলে একজন অসহায় স্ত্রী বিচার চাইব কই? উনি বিচার চান, কাওকে অন্যায়ভাবে ফাঁসাইতে চান না।’
তিনি আরও বলেন, আমার মায়ের দিকে আঙুল তোলার সাহস দেখাইয়েন না। প্রমাণ থাকলে আইন অনুযায়ী কথা বলেন। আর প্রমাণ ছাড়া কাউরে অপবাদ দেওয়ার অধিকার আপনাদের কে দিছে? আমার মা তার স্বামীকে হারাইছেন- এই শোকের ওপর আর অপবাদ চাপাইয়েন না। বাবার হত্যার বিচার চাইতে গিয়া আমার মায়ের সম্মান নষ্ট করতে দিতেছি না।’
স্ট্যাটাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলনের সময়ের একটি স্মৃতিও তুলে ধরেছেন জাহাঙ্গীরের মেয়ে নওশীন। তিনি লিখেন, ‘২০২৪ সালের ৫ জুলাইয়ের কথা আমার খুব মনে পড়ে। জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় বাবা মিঠামইনে ফিরতেছিল। বাবা বলছিল, ‘মা, ডাক আসছে, যাইতে হইব।’ আমি বাবারে যাইতে নিষেধ করছিলাম। কিন্তু বাবা মানুষের জন্য কাজ করতে ভালোবাসত। নিজের এলাকার মানুষ ডাক দিছে, আর বাবা যাইতে পারব না- এমন মানুষ বাবা ছিল না। মানুষের পাশে দাঁড়াইতে পারলে বাবা কত খুশি হইত, সেইটা আমি জানি। কিন্তু আজ সেই মানুষটাই নাই। নিজের বাড়ির সামনে বাবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হইছে। আর আমরা এখনো বিচার চাইতে ঘুরতেছি!’
তিনি অভিযোগ তুলে প্রশ্ন করেন, ‘আমার বাবার অপরাধটা কী ছিল? মানুষের পাশে দাঁড়ানো? নিজের এলাকার মানুষের জন্য কাজ করা?’
নওশীন বলেন, বাবার ওই গাছ কাটার মামলার কথা আমার মনে আছে। ঘটনাটা ছিল মিঠামইনে, কিন্তু বাবা আত্মসমর্পণ করে কিশোরগঞ্জের ফজলুর রহমান দাদুর কথায়। আমাদের জানা, পরে বাবা ওই ঘটনায় নির্দোষ প্রমাণিত হইছিল। বাবা যখন কিশোরগঞ্জ থানায় আত্মসমর্পণ করতে গেছে, তার ঠিক আগে আমার সাথে ফোনে কথা হইছিল। বাবা আমাকে বলছিল, ‘মা, প্রাইম মিনিস্টারের নাকি নির্দেশ আছে, এখন আমাকে surrender করতে বলতেছে।’ বাবার মুখে এই কথা আমি শুনছি। আজ আমার প্রশ্ন- তখন যদি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা বইলা বাবাকে আত্মসমর্পণ করানো যায়, তাহলে আজ বাবার হত্যার বিচার নিশ্চিত করার বেলায় সেই ক্ষমতা, সেই নির্দেশ, সেই দায়িত্ব কোথায়?’
রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নওশীন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার হত্যার বিচার চাওয়ার সময় আপনারা এত চুপ কেন? বাবার হত্যার পেছনে কারা ছিল, কারা পরিকল্পনা করছে, কারা নির্দেশ দিয়েছে- এই প্রশ্নগুলার উত্তর বের করার জন্য আপনারা পুলিশকে জোর দিয়ে বলছেন না কেন? নাকি বিচার চাওয়ার সময়ই আপনাদের দায়িত্ব শেষ? মানুষের বিপদে পাশে থাকার কথা বলে রাজনীতি করেন, কিন্তু একটা খুন হওয়া মানুষের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সময় এত নীরবতা কেন?’
স্ট্যাটাসে মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারের (এসপি) উদ্দেশে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন নিহত নেতার মেয়ে। তিনি জানতে চেয়েছেন, তদন্তের অগ্রগতি কী, এখন পর্যন্ত কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, নির্দেশনা, অর্থায়ন কিংবা অন্যভাবে সহযোগিতার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি লিখেন, ওসি সাহেব, ‘এসপি সাহেব- আপনারা আসলে কাদের কাছ থেকে ব্রিফিং নিচ্ছেন, আর কাদের কথা শুনে চলতেছেন? আপনাদের কাজ কি শুধু কিছু আসামিকে গ্রেপ্তার দেখানো, নাকি এই হত্যার পেছনে যারা আছে তাদের সবাইকে খুঁজে বের করা? সামনে যারা ছিল, তাদের গ্রেপ্তার করলেই কি তদন্ত শেষ? যারা পরিকল্পনা করেছে, নির্দেশ দিয়েছে, টাকা দিয়েছে বা অন্যভাবে সাহায্য করেছে- তাদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন?’
রাত্রি লিখেন, ‘আমি আর শুধু ‘তদন্ত চলছে’ শুনতে চাই না। কী তদন্ত হইছে, কী প্রমাণ পাওয়া গেছে, আর বাকি যারা জড়িত তাদের শনাক্ত করতে কী করা হচ্ছে- সেটার জবাব চাই। আমার বাবার হত্যার বিচার কোনো রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার বিষয় না। এটা একটা পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।’
‘আর একটা কথা পরিষ্কার কইরা বলতে চাই- হেলালের ফোনালাপের পর কোনো আসামি বা সাক্ষীর যদি ক্ষতি হয়, কেউ যদি হুমকি পায়, কিংবা হেফাজতে থাকা কারও সঙ্গে কোনো অঘটন ঘটে, তাইলে সেই ঘটনারও নিরপেক্ষ তদন্ত হইতে হবে। পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হইল সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো ঘটনা ঘটলে দায় এড়াইয়া যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত না।’
রাত্রি ওই পোস্টে আরও লিখেন, ‘মিঠামইনের মানুষ, আপনারা যদি কারও ভয়ে সত্য কথা বলতে না পারেন, তাহলে এটা আমাদের সবার জন্য লজ্জার। একজন মানুষকে নিজের বাড়ির সামনে হত্যা করা হলো, আর আমরা যদি ভয় পাইয়া চুপ থাকি, তাহলে অন্যায়ের সাহস আরও বেড়ে যাবে। কারও টাকা আছে, ক্ষমতা আছে, লোকবল আছে- এই জন্য কি সে যা খুশি তাই করবে? টাকা সারাজীবন থাকবে না, ক্ষমতাও চিরদিন থাকে না। দুনিয়াতে মানুষ যা করে, তার জবাব একদিন না একদিন তাকে দিতেই হয়। অন্তত নিজের বিবেকের কাছে, আর মানুষের কাছে- কোনো না কোনোভাবে।’
পোস্টের শেষাংশে বাবাকে হারানোর অসহনীয় কষ্ট তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘পারবেন আমার আদরের বাপ ফেরত আইনা দিতে? না পারলে সব কয়টার ফাঁসি নিশ্চিত করেন। কে আমার কী হয় সম্পর্কে এটা দেখার সময় নাই, কেউ তো আর বাপ না আমার!’