Image description
 
 

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জনপদ কুমিল্লায় ক্রমেই বাড়ছে অপরাধ। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। বিশেষ করে গত ১০ মাসে জেলায় ১২০টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য সামনে আসায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

গত কয়েক মাসে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম এবং স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জনসংখ্যার তুলনায় সীমিত জনবল, অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত নজরদারি নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইন বিভাগের প্রধান ড. নায়ীম আলীমুল হায়দার বলেন, কুমিল্লার মতো জনবহুল ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের উচ্চহার উদ্বেগজনক। কিশোর গ্যাং, অস্ত্রের সহজলভ্যতা, মাদক ও সীমান্ত চোরাচালান, আইন প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রতা এবং সামাজিক ও পারিবারিক নজরদারির অভাব অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। আইনের কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মানচিত্রদেখুন

 

জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মাসে কুমিল্লায় ১২০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে ১২টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। একই সময়ে ৪১৩টি চুরি, ৪০টি ডাকাতি ও ১৫টি অপহরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৮টি। এছাড়া ৪৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় পুলিশ ৬১টি অস্ত্র উদ্ধারে সক্ষম হয়। এসব ঘটনায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশিষ্টজনরা।

হত্যাকাণ্ডের পেছনে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, ছিনতাই, পারিবারিক ও জমিসংক্রান্ত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা এবং আধিপত্য বিস্তারের মতো কারণ উঠে আসছে বিভিন্ন ঘটনার প্রাথমিক তথ্যে। পাশাপাশি মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, চাঁদাবাজি ও চুরির অভিযোগও রয়েছে। নগর এলাকা থেকে মহাসড়কÑবিভিন্ন স্থানে অপরাধের আশঙ্কায় বিশেষ করে রাতের বেলায় চলাচল নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। ছিনতাইকারীরা কখনো যাত্রীর ছদ্মবেশে, কখনো আবার চালকের ছদ্মবেশে অপরাধ করে বেড়ায়।

আলোচনায় তিন হত্যাকাণ্ড

চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়িতে আইরিশ হিল হোটেলের পাশের ফুটপাত থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। র‌্যাবের তথ্যানুযায়ী, গভীর রাতে বাস থেকে নামার পর তিনি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়েন। যাত্রী ও চালকের ছদ্মবেশে থাকা চক্রের সদস্যরা তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তার মৃত্যু হয় বলে জানানো হয়েছিল।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ওই ঘটনায় মোবাইল ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়।

সবশেষ গত ৮ অক্টোবর কুমিল্লার লালমাইয়ে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারায় কুমিল্লা ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। ওই ঘটনায়ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককেন্দ্রিক সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছিনতাইকারী চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পরপর এসব হত্যাকাণ্ডে মহাসড়ক ও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাসস্ট্যান্ড, অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থান এবং আবাসিক এলাকার আশপাশে নিয়মিত পুলিশি টহল প্রয়োজন। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য যানবাহনে চলাচলকারীরা ছিনতাইকারীদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেনÑএমন অভিযোগও রয়েছে। ছিনতাইয়ের ভয়ে রাতে চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা জরুরি কাজে বের হতেও অনেকে দ্বিধা করছেন।

জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশ কম

কুমিল্লা জেলায় প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের বিপরীতে পুলিশ সদস্য রয়েছেন প্রায় ২,৫০০ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ২,৬০০ মানুষের বিপরীতে একজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। এ অবস্থায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জনবল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বলেন, জেলায় ১৮টি থানা রয়েছে। কুমিল্লা মহানগর এলাকায় একটি মেট্রোপলিটন থানা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। ২,৫০০ সদস্য নিয়ে এই থানা গঠন করা গেলে নগরীর অপরাধপ্রবণতা অনেক কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী আহসান টিটু আমার দেশকে বলেন, অপরাধ প্রতিরোধে দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, অপরাধ সংঘটিত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান ও আন্তরিক ভূমিকা নিশ্চিত করা। কুমিল্লা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় এখানে অপরাধের প্রবণতা বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজকে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধেরও সম্পর্ক রয়েছে। গত ১৭ বছরে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন। সমাজকে ওই অবস্থা থেকে বের করে আনতে সময় লাগবে।

অপরাধ দমনে তৎপর পুলিশÑদাবি কর্মকর্তার

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) লুৎফুর রহমান আমার দেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সতর্ক ও সক্রিয় রয়েছে। নিয়মিত ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের আটক করা হচ্ছে।

তিনি জানান, ১৫ দিনের অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সন্দেহে ২,২৯২ জনকে আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধে জড়িত নন—এমন ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং অন্যদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেÑএমন অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, কুমিল্লা বড় ও সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এখানে অপরাধের ঝুঁকি বেশি। কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত অভিযুক্তদের আটক ও ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।

 

তবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগ দূর করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন স্থানীয় বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল, সিসিটিভি নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ছিনতাইকারী চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।