নদীভাঙনে একে একে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। নদীর পাড় ধসে ঘরবাড়ি চলে এসেছে ভাঙনের মুখে, কোথাও ঝুঁকিতে রয়েছে বাজার। জেলার ৬৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৪১ দশমিক ১৮ কিলোমিটারই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ আগেভাগে এসব বাঁধ সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। ফলে বাঁধ ভাঙার উপক্রম হলে জরুরি মেরামত করেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন উপকূলের মানুষ।
পাউবোর তথ্য বলছে, পাউবো বিভাগ-১-এর আওতায় প্রায় ৪ কিলোমিটার এবং বিভাগ-২-এর আওতায় ৩৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, উপকূলীয় এলাকার গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলেও আগাম সংস্কারের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ মিলছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশের আশঙ্কা সৃষ্টি হলে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করতে হচ্ছে।
সব কৃষিজমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন বসতবাড়ির সামান্য জমিটুকুই অবলম্বন
সিরাজুল সরদার
বুধহাটা গ্রামের বাসিন্দা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা বাজার ও সদর এলাকায়। বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর ভাঙনে এসব এলাকার বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বুধহাটা বাজারে একটি বেকারির কিছু অংশ নদীতে ভেঙে পড়েছে। আশপাশের দোকানপাট ও বসতবাড়িও রয়েছে ঝুঁকিতে।
বুধহাটার বাসিন্দা সিরাজুল সরদারের ভাষায়, তার সব কৃষিজমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন বসতবাড়ির সামান্য জমিটুকুই তার অবলম্বন। বছরের পর বছর ভাঙতে ভাঙতে নদী লোকালয়ের কাছে চলে আসায় তার মতো অনেক পরিবার ভিটামাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
বসতবাড়ি ও বাজারের পাশাপাশি ঝুঁকিতে রয়েছে জনপদ রক্ষার প্রধান অবকাঠামো বেড়িবাঁধ। আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া এলাকায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর কপোতাক্ষ নদের বাঁধের বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার কাজ শুরু করেন। পরে পাউবোর কর্মকর্তারাও সেখানে যোগ দেন। মাটি, বস্তা ও জিও ব্যাগ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ রক্ষার চেষ্টা করা হয়। জিও ব্যাগ ও জিও টিউব স্থাপনের পরও মেরামত করা অংশ আবার ধসে পড়ে। পরে মূল বাঁধের পেছনে জিও টিউব দিয়ে রিং বাঁধ তৈরি করে জোয়ারের পানি ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগেভাগে বাঁধ সংস্কার করা প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না
আব্দুর রহমান তাযকিয়া
নির্বাহী প্রকৌশলী, সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২
প্রতাপনগর ইউপির চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী জানিয়েছেন, তার ইউনিয়নে প্রায় তিন কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন প্রতিরোধে মজবুত বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তালা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী বালিয়া গ্রামের বাসিন্দারা জোয়ারের পানি বাড়লেই বাঁধ পাহারা দেন। তাদের আশঙ্কা, বাঁধ ভেঙে গেলে বালিয়া, শুভংকরকাঠি, তেঘরিয়া ও শ্রীমন্তকাঠি গ্রামের বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও মাছের ঘের প্লাবিত হতে পারে।
শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চাউলখোলা-খুটিকাটা এলাকারও একই পরিস্থিতি। কপোতাক্ষ নদের ভাঙনে পাউবোর বেড়িবাঁধের প্রায় ২০০ ফুট অংশ ধসে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বাঁধ ভেঙে পুরো ইউনিয়ন প্লাবিত হতে পারে।
পাউবো বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়ার ভাষায়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগেভাগে বাঁধ সংস্কার করা প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণত কোনো স্থানে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশের উপক্রম হলে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক কাজ করা হয়। উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) দ্বিতীয় পর্যায়ে বাঁধ সংস্কার ও উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটির প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে।
নদীভাঙন ও বাঁধের ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলীনুর খান বাবুল মনে করেন, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর জরুরি মেরামতের পরিবর্তে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে সংস্কার করা প্রয়োজন।
পাউবো বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম যাকারিয়া জানালেন, তাদের আওতায় বর্তমানে দুটি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে একটি প্রকল্পের কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় একটি সম্পূরক প্রকল্পের তিনটি প্যাকেজের কাজের গড় অগ্রগতিও প্রায় ৭০ শতাংশ। তবে গত চার-পাঁচ বছরে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল থেকে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।