Image description

প্রাচীন জেলা রংপুরে নেই সদর হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ের জেনারেল হাসপাতাল। এতে করে জটিল রোগের চিকিত্সাস্থল রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই সকল ধরনের রোগীদের সেবা নিতে হচ্ছে।  ফলে সেখানে ধারণক্ষমতার তিনগুণ রোগী সেবা নেওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী, স্বজন, চিকিত্সক-নার্সসহ সংশ্লিষ্টরা। এনিয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয় মন্ত্রণালয়ে একাধিক বার চিঠি দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সচেনতরা বলছেন, রংপুরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সদর হাসপাতালসহ জেলা পর্যায়ের একটি জেনারেল হাসপাতাল চালুকরা জরুরি। বর্তমানে  সদর হাসপাতাল ভবনের দরজায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক ব্যাধি ওয়ার্ডের একটি বোর্ড টাঙানো আছে। দরজাটি বন্ধ থাকলেও এর দুইপাশের কক্ষের গ্রিলগুলো চুরি হয়েছে।

জানা যায়, একসময় রংপুর নগরীর প্রাণকেন্দ্রে সদর হাসপাতালের কার্যক্রম ছিল। জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়াসহ নানা রোগের চিকিত্সা সেখানে দেওয়া হতো। সেই সঙ্গে হাত-পা কেটে যাওয়া কিংবা ছোট-খাটো দুর্ঘটনায় আহতরা তাত্ক্ষণিক সেখানে সেবা পেতেন। সদর হাসপাতালটি জেলাবাসীর চিকিত্সাসেবার ভরসাস্থল ছিল। ১৯৭৬ সালে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চালু হয়। এরপর থেকে সদর হাসপাতালের কার্যক্রম সীমিত হতে থাকে। কখনো ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, কখনো রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সদর হাসপাতালের ভবনটিকে। করোনা কালের আগেও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডায়রিয়ার আক্রান্ত রোগীদের সেখানে চিকিত্সা দেওয়া হতো।

এর পর থেকে ভবনটি ব্যবহার না করায় বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। সদর হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা বন্ধ থাকায় চাপ বেড়েছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে জটিল রোগ নিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিত্সাসেবা নিতে যাচ্ছে। বিভিন্ন বিভাগের আউটডোরে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার রোগী সেবা নেন। সেই সাথে ইনডোরে প্রায় আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার রোগী চিকিত্সাসেবা নিচ্ছে। ১ হাজার শয্যার রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে ৬৫০ শয্যার জনবল। এত কম পরিমাণ জনবল দিয়ে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগীকে চিকিত্সাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিত্সক-নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের।

সেই সঙ্গে রোগী ও তাদের স্বজনদের চাপে হাসপাতালে চিকিত্সার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ফলে সেবা নিয়ে সারা বছরই নানা অভিযোগ করছেন রোগী ও স্বজনরা। এ সংকট নিরসনে রংপুর সদর উপজেলায় একটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। রংপুর সিভিল সার্জন ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে একটি চিঠি দেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতাধীন রংপুর নগরী বাদে জেলা সদরের অভ্যন্তরে ঈশ্বরপুর ও হরিদেবপুর মৌজায় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্বাচনের জন্য পাঁচ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবিত জায়গায় ২৫০ শয্যার জেলা অথবা সদর হাসপাতাল নির্মাণের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। 

সদর উপজেলা পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ও এর জনসংখ্যা ৭ লাখ ১৮ হাজারের বেশি। সদর উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী উপজেলার জনগণের উন্নতমানের চিকিত্সার জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল আবশ্যিকভাবে প্রয়োজন। এরপর ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক রংপুর সদর অথবা জেলা হাসপাতাল নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দেন। ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর তত্কালীন জেলা প্রশাসক রংপুর সদর উপজেলায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এত চিঠি চালাচালির পরও হাসপাতাল নির্মাণে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।  

সরেজমিনে দেখা যায়, সদর হাসপাতাল ভবনের দরজায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক ব্যাধি ওয়ার্ডের একটি বোর্ড টাঙানো আছে। দরজাটি বন্ধ থাকলেও এর দুই পাশের কক্ষের গ্রিলগুলো চুরি হয়েছে। ফলে যে কেউ দিন-দুপুরে ঐ একতলা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। ভবনের ভেতরে প্রতিটি কক্ষকে স্থানীয় ও বহিরাগতরা শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইয়াবা সেবনের সামগ্রী, সিগারেটের খোসা, ফেনসিডিলের বোতলসহ মাদক সেবনের নানা আলামত। প্রতিটি কক্ষের দরজা নেই, খসে পড়েছে পলেস্তারা, ছাদগুলো ভেঙে পড়ছে। ভবনের ভেতরে নেই হাসপাতালের কোনো আসবাবপত্র। ভবনের টয়লেট গুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, সদর হাসপাতালের পেছনে হরিজনপল্লি গড়ে ওঠায় সেখান থেকে মাদক কিনে সদর হাসপাতালের পরিত্যক্ত ভবনে সেবন করছে মাদকাসক্তরা। মাদক সেবীদের আনাগোনা থাকায় ঐ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে ভয়পায় স্থানীয়রা।

 নগরীর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মানিক সরকার বলেন, রংপুর সদর হাসপাতালে আগে ইনডোর ও আউটডোর সেবাছিল। আমরা সেখান থেকে চিকিত্সা সেবা নিয়েছি। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই হাসপাতাল আজ হারিয়ে গেছে। ফলে সবাই জ্বর-সর্দি থেকে শুরুকরে জটিল রোগ নিয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভিড় করছেন। অপরদিকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার বাহিরে রোগী সেবা নেওয়ায় সঠিক চিকিত্সা পাচ্ছে না।

রংপুরের নাগরীক কমিটির সদস্যসচিব অ্যাড পলাশকান্তি নাগ বলেন, রংপুর সদর হাসপাতালের পরিত্যক্ত অবকাঠামো যেখানে রয়েছে সেখানেই নতুন করে ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতাল কিংবা জেলা জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ করা যেতে পারে। এতে করে সরকারকে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে না। সেই সাথে নগরীর প্রাণকেন্দ্রে হওয়ায় জেলার প্রতিটি উপজেলা থেকে মানুষ সহজে চিকিত্সাসেবা নিতে পারবেন। আমি চাই দ্রুত সদর হাসপাতাল নির্মাণকরে তা স্বাস্থ্যসেবার জন্য চালুকরা হোক।

রংপুর জেলা সুজনের সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, চিকিত্সা মানুষের মৌলিক অধিকার। রংপুর বিভাগীয় ও প্রাচীন জেলা। অথচ এ জেলায় সদর হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ের একটি জেনারেল হাসপাতাল নেই। ফলে সকল মানুষকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মুখী হতে হচ্ছে। যদি এই দুইটি হাসপাতাল রংপুরে নির্মাণ করা যায় তবে একজন দিনমজুর থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে। পিছিয়ে পড়া রংপুরকে এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আশা করছি তারা সদয় হয়ে সদর হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ের একটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

রংপুর সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, রংপুর সদর বাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সদর উপজেলায় একটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়কে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছি। সেই চিঠিতে হাসপাতাল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা এবং কোথায় হাসপাতাল নির্মাণ করা যেতেপারে এমন স্থান উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের হাতে এখন কিছু নেই। মন্ত্রণালয় যদি উদ্যোগী হয় তবে রংপুর সদর হাসপাতাল কিংবা একটি জেলা পর্যায়ের জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে এগিয়ে নেবে।