Image description

নির্বাচনের পর সরকারপ্রধান হিসেবে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) খুলনা ও মোংলা সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই অঞ্চলে এটিই তার প্রথম সফর। তার সফর ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। সেইসঙ্গে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে তাদের মাঝে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা সমাধান এবং নতুন অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার লক্ষ্যে এ অঞ্চলের মানুষের যেসব প্রত্যাশা রয়েছে, সেগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন দলীয় নেতারা।

যত প্রত্যাশা

দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং এর দ্রুত বাস্তবায়ন সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে উঠবে এবং হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে তারা আশা করছেন।

বন্ধ শিল্পকারখানা সচল

খুলনার বন্ধ হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ও অন্যান্য শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ দেখতে চান স্থানীয় লোকজন।

মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও বাণিজ্যিক গতিশীলতা

পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মোংলা বন্দর আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের ফলে মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের স্থবিরতা দূর হবে। সেইসঙ্গে বন্দর পরিচালনায় সব ধরনের প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ এবং ব্যবসায়ীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান ব্যবসায়ীরা।

সুন্দরবন ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং হিরণ পয়েন্টসহ উপকূলীয় অঞ্চলের বিশাল পর্যটন সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তরের প্রত্যাশা রয়েছে সাধারণ মানুষের। এ ছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়ন। দাকোপ ও সুন্দরবন সংলগ্ন দুর্গম উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন চান তারা।

আশায় বুক বেঁধেছে দাকোপের মানুষ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন আর যোগাযোগের দুর্ভোগ—এ তিন সংকটের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন উপকূলীয় দাকোপ উপজেলার মানুষ। একের পর এক নদীভাঙনে হারিয়েছেন বসতভিটা, কৃষিজমি ও সহায়-সম্বল। ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ আর দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে কাটছে তাদের জীবন। এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার দাকোপ উপজেলার নলিয়ানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। 

তাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, তিন নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনসহ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগের কথা জানাবেন।

সুন্দরবনঘেঁষা তিনটি পৃথক দ্বীপভূখণ্ড নিয়ে গঠিত দাকোপ উপজেলা। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে জেলা শহর খুলনার সঙ্গে এ উপজেলার সড়ক যোগাযোগের তেমন উন্নতি হয়নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে চালনা পৌরসভাসহ উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।

বেড়িবাঁধ নিয়ে শুনতে চান সুখবর

এলাকাবাসী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ষাটের দশকে দাকোপের তিনটি পৃথক দ্বীপের বন্যা নিয়ন্ত্রণে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পাউবো। পরবর্তী সময়ে এলাকাগুলোকে ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ৩১ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে চালনা পৌরসভা, তিলডাঙ্গা ও পানখালী ইউনিয়ন। ৩২ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে সুতারখালী ও কামারখোলা ইউনিয়ন। আর ৩৩ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে বাজুয়া, দাকোপ, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ ও বানিশান্তা ইউনিয়ন।

তৎকালীন বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য এসব পোল্ডারে বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে ৩১ নম্বর পোল্ডারের ৪৮ কিলোমিটার বাঁধ ষাটের দশকের পর আর সংস্কার করা হয়নি। ফলে এ পোল্ডারের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।

২০০৯ সালের ২৫ মে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে পাউবোর ৩২ নম্বর পোল্ডারের ৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ২৫ কিলোমিটার লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে সুতারখালী ও কামারখোলা ইউনিয়নের ২৫ থেকে ৩০ হাজার বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। আইলার দুই বছর পর পাউবো ৩২ নম্বর পোল্ডারের ৫০ কিলোমিটার এবং ৩৩ নম্বর পোল্ডারের ৫১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করে।

এদিকে ৩১ নম্বর পোল্ডারের খোনা, লক্ষ্মীখোলা পিচের মাথা, কামিনিবাসিয়া, মোজামনগর, গড়খালী, মৌখালী ও পানখালী ফেরিঘাটের পূর্ব পাশে এবং ৩২ নম্বর পোল্ডারের জালিয়াখালী, কালাবগী ও গুনারী কালীবাড়ি এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। এসব স্থানে দ্রুত বিকল্প বাঁধ নির্মাণ করা না হলে যেকোনো সময় বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এতে আবারও বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে উপকূলের জনজীবন।

নদী কেড়েছে সব, বাঁধের ওপর আশ্রয়

তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের বটবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণপদ সরদার নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষদের একজন। একসময় তার ১৫ থেকে ১৬ বিঘা কৃষিজমি, গরু, মাছের পুকুর ও তিনটি বসতঘর ছিল। কিন্তু ঢাকী নদীর ভাঙনে একে একে সব হারিয়েছেন তিনি। এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় পাশের বেড়িবাঁধের ওপর ঝুপড়ি ঘর তুলে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কৃষ্ণপদ সরদার বলেন, ‘বাপ-দাদার পৈতৃক সম্পত্তি বলতে আমার একসময় ১৫ থেকে ১৬ বিঘা কৃষিজমি ছিল, গোয়ালভরা গরু ছিল, মাছের পুকুর ছিল, তিনটি বসতঘর ছিল। তা সব একে একে গিলে খেয়েছে ঢাকী নদী। আমি এখন নদীগর্ভে আমার সর্বস্ব হারিয়ে হয়েছি সর্বস্বান্ত। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় পাশের বেড়িবাঁধের ওপর ঝুপড়ি ঘর বেঁধে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সবাই কথা দেয়, এ উপজেলায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সেতু নির্মাণসহ সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হবে। কিন্তু উন্নয়ন কেউই করে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনে এ উপজেলার বিভিন্ন স্থাপনা, রাস্তাঘাট, কৃষিজমি, বসতবাড়ি এবং সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা বিলীন হচ্ছে।’

কৃষ্ণপদ সরদারের ভাষায়, ‘বাঁধ ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া আমরা এলাকার হাজারো পরিবার খাদ্য চাই না, বস্ত্র চাই না, ত্রাণ চাই না। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সুপেয় খাবার পানির নিশ্চয়তার পাশাপাশি যুগোপযোগী টেকসই বাঁধ নির্মাণ চাই। গল্লামারী-বটিয়াঘাটা হয়ে নলিয়ান পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন চাই। সড়কপথে আর মৃত্যুর পথযাত্রী হতে চাই না আমরা।’

বেকারত্ব দূরের দাবি

এলাকার বেকারত্ব দূর করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি ঝপঝপিয়া, ঢাকী ও চুনকুড়ি নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি জানান তিনি। কৃষ্ণপদ সরদারের মতো নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষেরও একই প্রত্যাশা।

তিন নদীতে সেতুর প্রত্যাশা

দাকোপের সঙ্গে জেলা শহর খুলনার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। বিশেষ করে পানখালী-বরণপাড়ার মধ্যবর্তী ঝপঝপিয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। এ সেতু নির্মিত হলে খুলনার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি ঝপঝপিয়া, ঢাকী ও চুনকুড়ি নদীর ওপর সেতু নির্মাণ হলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে তাদের প্রত্যাশা।

সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির বলেন, তার ইউনিয়নের নলিয়ানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের খবরে বাঁধভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলবাসী নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। দুর্গম এ উপজেলার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত উন্নয়ন হবে—এমন আশায় মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে এলাকায় যুগোপযোগী টেকসই বাঁধ নির্মাণ, পৃথক তিনটি নদীর ওপর সেতু নির্মাণ ও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন দিগন্তের ঠিকানা আমরা খুঁজে পাবো।’

সফর ঘিরে প্রশাসনের প্রস্তুতি

দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হেলিকপ্টারে দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নের নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করবেন। সেখান থেকে সড়কপথে নলিয়ান লঞ্চঘাটে যাবেন তিনি। পরে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের একটি জাহাজে নৌপথে মোংলার উদ্দেশে রওনা হবেন।

ইউএনও জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নলিয়ান ও আশপাশের এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় সদস্যরা কাজ করছেন। এ ছাড়া নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে হেলিপ্যাড স্থাপন এবং নলিয়ান লঞ্চঘাট পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজ শেষ হয়েছে।

উন্নয়নের দাবি

স্থানীয় সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান বলেন, এ সংসদীয় এলাকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, দুটি উপজেলার নদীর ওপর পৃথক সেতু নির্মাণ, যুগোপযোগী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের দাবি তিনি সম্প্রতি সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করেছেন।

তিনি আরও বলেন, দাকোপের নলিয়ানে পর্যটনশিল্প স্থাপনের প্রস্তাবও দিয়েছেন, যাতে এলাকার বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে তাই দাকোপবাসীর প্রত্যাশা শুধু আনুষ্ঠানিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়। নদীভাঙন থেকে বসতভিটা রক্ষা, সুপেয় পানির নিশ্চয়তা, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ—এসব দীর্ঘদিনের সংকটের বাস্তব সমাধান চান তারা।