Image description

প্রতিদিন নানা কাজে ঘর থেকে বের হন মানুষ। কেউ যান কর্মক্ষেত্রে, কেউ বেড়াতে, কেউ জরুরি কাজে। কাজ শেষে কিংবা বেড়ানো শেষে অনেকেই ঘরে ফেরেন। কিন্তু অনেকেই ফেরেন না। পথ কেড়ে নেয় অনেকের জীবন। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়—পথের মৃত্যু থামে না। 

বাংলাদেশে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় বাস, মিনিবাস, হিউম্যান হলার ও অটোরিকশা। এসব যানবাহনের বেশির ভাগেরই ফিটনেস সনদ নেই। এগুলোই সড়কে যাত্রীদের জন্য একেকটি ‘চলন্ত মৃত্যুফাঁদ’ হয়ে উঠেছে। বহু মানুষের স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিদিন সাদা কাফনে মোড়ানো লাশের কফিন হয়ে ঘরে ফিরছেন; আবার অনেকে বরণ করছেন জীবনের তরে পঙ্গুত্ব।

অথচ দেশের সড়ক-মহাসড়কে নিরাপত্তার জন্য ২০১৯ সালে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের মাধ্যমে ৭টি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করে মোট ১১১টি সুপারিশ প্রদান করা হয়েছিল। এই বৈজ্ঞানিক গাইডলাইন বা সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। সরকার বিদ্যমান আইন নতুন করে সংশোধন করে বাস্তবায়নের কথা বলছে, যদিও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের গতি মন্থর।

প্রতি বছরের মতো এবারও নানা আয়োজনে আজ দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য– “নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”। এই স্লোগান সামনে রেখে সেমিনার কক্ষ, সুশীল সমাজের টেবিল আর প্রশাসনিক দপ্তরের বড় বড় প্রতিশ্রুতিতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত জেলা শহরগুলো মুখরিত হবে আজ। যেমনটা হয়েছে হয়ত বিগত বছরগুলোতেও। কিন্তু রাজপথে মৃত্যুর বিভীষিকা কমেনি। নিমিষে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার চিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।
অথচ সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও প্রকৌশলীরা বিভিন্ন সময় বলে আসছেন কী কারণে সড়কে এভাবে বৃষ্টির মতো ঝরছে প্রাণ। তারা বলেছেন– চালকদের অকারণ প্রতিযোগিতা ও বিপজ্জনক ওভারটেকিং, পরিবহন মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফার লোভ ও চালকদের ঘুমের অভাব, যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন জরাজীর্ণ গাড়ি রাস্তায় নামানো, মহাসড়কে নিষিদ্ধ ঘোষিত ধীরগতির যান চলাচল এবং মহাসড়কের জ্যামিতিক নকশাগত ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু সরকারের তরফে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে এর কোনো প্রতিকার করা হচ্ছে না। ফলে মৃত্যুর মিছিলও থামছে না।

৯ মাসে সড়কে ঝরেছে ৪ সহস্রাধিক প্রাণ

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬) দেশে ৪ হাজার ২৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ হাজার ১৫৭ জন (প্রতিদিন গড়ে ১৫ জনের বেশি)। আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৩৯১ জন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশে ৪ হাজার ২৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪ হাজার ১৫৭ জনের / ফাইল ছবি

সর্বশেষ নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মারা যান ১২ জন। আহত হন অন্তত ২৫ জন।

এ ঘটনায় পুলিশ ও আহতরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার শিকার আরপি স্পেশাল পরিবহনের বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। এ সময় বাসের চালক ও সহকারী পেছনের আসনে ঘুমাচ্ছিলেন।

দুর্ঘটনায় আহত চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাসিন্দা রমজান আলী জানান, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বাসটি পাবনার ঈশ্বরদীতে পৌঁছায়। সেখানে হোটেলে যাত্রা বিরতি শেষে চালকের আসন থেকে চালক উঠে গেলে সুপারভাইজার সোহেল বাস চালাতে শুরু করেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর বনপাড়ায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

সড়ক মাত্রই মৃত্যুফাঁদ!

একদিকে ইকোনমিক লাইফ পার হওয়া লক্কড়ঝক্কড় জরাজীর্ণ যানবাহনের অবাধ চলাচল, অন্যদিকে বৈধ লাইসেন্সবিহীন কিংবা মারাত্মক চোখের দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগতে থাকা দক্ষ-অদক্ষ চালক, সব মিলিয়ে দেশের প্রতিটি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর নিছক কোনো পারিবারিক ট্র্যাজেডি বা দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক অস্তিত্বের ওপর নেমে আসা এক ধারাবাহিক মহাসংকট- বলছেন নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্টজনরা।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ রয়েছে। কিন্তু শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সড়ক নিরাপদ হয় না; প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়। সড়কের নকশা ও নির্মাণ, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের যোগ্যতা, মানসম্মত হেলমেট ও সিটবেল্টের ব্যবহার, পথচারীর নিরাপত্তা এবং রোডক্র্যাশের পর জরুরি চিকিৎসা— প্রতিটি ক্ষেত্রকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সবাই অবগত। কেবল ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবেই কার্যকর প্রতিকার সম্ভব হচ্ছে না।

২০১৯ সালে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল সাতটি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করে ১১১টি সুপারিশ দিয়েছিল। কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। চালকদের বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অপর্যাপ্ত সড়ক বিভাজক ও বিশ্রামের অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন ও দিবসকেন্দ্রিক আয়োজন নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগ।

১৩ বছরে প্রাণ গেছে সোয়া লাখ

নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে উঠে এসেছে গত ১৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র। সমিতির প্রকাশিত দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত ১৩ বছরে অর্থাৎ ২০১৩ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের শেষভাগ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও সংযোগ সড়কে মোট ৭২ হাজার ৭৩৬টি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন মানুষ।

এ ব্যাপারে সংস্থাটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পূর্বে আমাদের দেশের সার্বিক যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল মূলত নিরাপদ নদীপথ ও পরিবেশবান্ধব রেলপথকেন্দ্রিক। তৎকালীন সময়ে দেশের মোট যাত্রীর প্রায় ৮০ শতাংশই নৌ ও রেলপথে যাতায়াত করতেন। পরবর্তীতে সুদূরপ্রসারী ও টেকসই কোনো মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই দেশের সার্বিক যাতায়াত ব্যবস্থাকে জোর করে সড়ককেন্দ্রিক করে তোলা হয়। বর্তমানে সড়ক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, বিআরটিএর সীমাহীন দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অদৃশ্য মালিক-শ্রমিক সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পুরো খাতটি এখন এক অশুভ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

সড়ক ‍দুর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে হাজার হাজার শিশুর

সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে করুণ ও নির্মম দিকটি উন্মোচন করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা প্রতিবেদন মতে, গত সাত বছরে অর্থাৎ ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে মোট ৭ হাজার ৯৬৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু অকালে প্রাণ হারিয়েছে। শিশুদের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট নিহত শিশুর মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক অর্থাৎ ২হাজার ৯৫৮ জন শিশু মারা গেছে মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি, নিয়ন্ত্রণহীন চালানো কিংবা আরোহী হিসেবে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু / প্রতীকী ছবি

এ ছাড়া পথচারী হিসেবে বাস, ট্রাক বা কাভার্ডভ্যানের নির্মম আঘাতে প্রাণ গেছে ২ হাজার ৮১২ জন শিশুর। অন্যদিকে পরিবারের সাথে বাসে কিংবা অন্যান্য গণপরিবহনে যাত্রী হিসেবে যাতায়াতের সময় মুখোমুখি সংঘর্ষ ও খাদে পড়ার দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ১৯৩ শিশুর।

এ ব্যাপারে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার কারণ আসলে কর্তৃপক্ষের জানা। দুর্ঘটনার পরিণতিও কী ঘটছে তাও জানা। কিন্তু প্রতিকার নেই। শিশুরা গ্রামীণ সড়কে বেশি হতাহত হচ্ছে। কারণ গ্রামীণ সড়কগুলো বসতবাড়ি ঘেঁষা এবং এই সড়কের যানবাহনসমূহ কোনো প্রকার নিয়ম-নীতি মেনে চলে না। সড়ক নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও থাকে না। আবার শিশুরাও সড়ক ব্যবহারের কোনো নিয়ম-নীতি জানে না। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে যেমন কোনো উদ্বেগ নেই, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও কোনো প্রকার সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ এই অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নীরবে আমাদের শিশুরা নিহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে। এটা জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতিটি শিশুই অমিত সম্ভাবনাময় এবং আজকের শিশুরাই আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ।

নিবন্ধিত যান সোয়া ৬৭ লাখ, বেশির ভাগই মোটরসাইকেল

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) খাতাকলমে নিবন্ধিত অর্থাৎ বৈধ যানবাহনের মোট সংখ্যা ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭টি। এই মোট নিবন্ধিত যানের সিংহভাগই দখল করে আছে দ্রুতগতির মোটরসাইকেল।

বিআরটিএ’র নিবন্ধন ডেটা অনুযায়ী, নিবন্ধিত যানের তিন-চতুর্থাংশই হচ্ছে মোটরসাইকেল, যার সংখ্যা ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯০টি। ব্যক্তিগত ব্যবহারের প্রাইভেটকারের সংখ্যা ৪ লাখ ৩২ হাজার ১১৪টি, নিবন্ধিত সিএনজি ও পেট্রোল চালিত থ্রি-হুইলার অটোরিকশার সংখ্যা ৩ লাখ ২৯ হাজার ৩৮৯টি, পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক পিকআপ ১ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৩টি, যাত্রী পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত ছোট মাইক্রোবাস ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৮৮ টি, জিপ গাড়ি ১ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪ টি এবং গণপরিবহনের মূল কাণ্ডারি বাস ও মিনিবাসের মোট সংখ্যা ৮৭ হাজার ২৮৫টি, যার মধ্যে বড় দূরপাল্লার ও সিটি বাস ৫৮ হাজার ৫৮৯ টি এবং মিনিবাস ২৮ হাজার ৬৯৬টি।

এ ছাড়া ভারী পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টরের যৌথ সংখ্যা ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৬১টি এবং ট্যাক্সিক্যাব, অ্যাম্বুলেন্স, ডেলিভারি ভ্যান ও বিশেষায়িত ট্যাঙ্কার মিলিয়ে নিবন্ধিত যানের সংখ্যা ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮২টি।

নিবন্ধন ছাড়া চলছে সাড়ে ৬ লাখ যানবাহন

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ২০ শতাংশের জন্য দায়ী আনফিট মোটরযান। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কারণে প্রতিদিনই ঘটছে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি।

অথচ বিআরটিএর খাতাকলমে নিবন্ধিত ৬৭ লাখ যানের আড়ালে কোনো প্রকার নিবন্ধন, রুট পারমিট কিংবা ফিটনেস সনদ ছাড়াই সারা দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে চলছে সাড়ে ৬ লাখ যানবাহন। সরকার নির্ধারিত ইকোনমিক লাইফ অর্থাৎ বাসের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২০ বছর এবং ট্রাক বা পণ্যবাহী যানের ক্ষেত্রে ২৫ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও সারা দেশে প্রায় ৭৫ হাজারের বেশি লক্কড়ঝক্কড়, ব্রেকফেল করা ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাস-ট্রাক নিয়মিত মহাসড়কে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও প্রধান শহরগুলোতে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের প্রায় ৭০ শতাংশের কোনো বৈধ হালনাগাদ ফিটনেস কাগজ নেই।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৩ থেকে ২০২৫ সালের শেষভাগ পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭৩৬টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন / ফাইল ছবি

অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ৬০ লক্ষ

রাজধানীসহ সারা দেশে সড়ক মহাসড়কে এখন অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা, থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, ভটভটি ও চান্দের গাড়ি অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব অবৈধ যানবাহনগুলোর না আছে কোনো যান্ত্রিক সুরক্ষা, না আছে দক্ষ চালক; অথচ এগুলোই প্রতিদিন মহাসড়কে মূল আইল্যান্ড ও বড় বড় বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে রক্তগঙ্গা ভাসাচ্ছে। এর পাশাপাশি আছে সরকারি নিয়ম অমান্য করে চলা জরাজীর্ণ গাড়ির কাফেলাও।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত থ্রি হুইলার ও অটোরিকশা চলছে। চলতি সেপ্টেম্বরেই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশা চলাচল করছে, শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ১০ থেকে ১২ লাখ।

৩০ শতাংশ পেশাদার চালকের ঘাটতি

বিআরটিএর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী মোট চালকের সংখ্যা ৫৯ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৩ জন। এর মধ্যে পেশাদার বা বাণিজ্যিক যান চালকের সংখ্যা আনুমানিক ২৩ থেকে ২৫ লাখের কাছাকাছি এবং অপেশাদার চালক রয়েছেন ৩৪ থেকে ৩৬ লাখের মতো। নিবন্ধিত যানবাহনের তুলনায় বিশেষ করে ভারী ও মাঝারি বাণিজ্যিক যানবাহন চালানোর মতো দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বৈধ পেশাদার চালকের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

সার্ভিস প্রোভাইডার ও ঠিকাদার কোম্পানির আইনি ও কারিগরি জটিলতার কারণে বিআরটিএর পরীক্ষায় পাস করার পরও সারাদেশে প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ চালক দীর্ঘদিন ধরে তাদের কাঙ্ক্ষিত মূল স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স হাতে পাচ্ছেন না। তারা বাধ্য হয়ে সাময়িক ই-লাইসেন্স বা বিআরটিএর দেওয়া কাগজের অনুমোদনপত্র পকেটে নিয়ে রাস্তায় নামছেন, যা মাঠ পর্যায়ে ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক নানা হয়রানির কারণ হচ্ছে।

সর্বশেষ দুই বছরের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট- সড়কে মোট প্রাণহানির মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মোটরসাইকেল। ঘটিত মোট সড়ক দূর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশই সরাসরি মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। তরুণদের অনিয়ন্ত্রিত গতি, হেলমেট না পরা, ওভারটেকিং করার প্রবণতা এবং বেপরোয়া ড্রাইভের কারণে প্রতিদিন মোটরসাইকেল চালক ও পথচারীরা অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। এর পরপরই দুর্ঘটনাকবলিত যানের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে দ্রুতগতির দূরপাল্লার বাস, ওভারলোডেড ট্রাক, কাভার্ডভ্যান এবং মহাসড়কে নিষিদ্ধ ঘোষিত থ্রি-হুইলার অটোরিকশা ও নসিমন-করিমন।

বিআরটিএ জানিয়েছে, দুর্ঘটনা রোধ ও সড়কে ট্রাফিক আইন জোরদার করতে বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত গত ৯ মাসে সারা দেশে অভিযান চালিয়েছে। বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের যৌথ উদ্যোগে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, অবৈধ লাইসেন্স, উল্টোপথে গাড়ি চালানো এবং অতিরিক্ত গতির অপরাধে ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সাথে মারাত্মক বিপজ্জনক শত শত জরাজীর্ণ গাড়ি জব্দ করে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পাঠানো হয়েছে। মারাত্মক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর আওতায় বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এমনকি বারবার ট্রাফিক আইন অমান্যকারী ও পয়েন্ট হারানো বহু চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত বা বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।

৭৩ শতাংশ চালক ভুগছেন চোখের সমস্যায়

সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে চরম উপেক্ষিত ও অদৃশ্য এক কারণ হলো পেশাদার ড্রাইভারদের চোখের দৃষ্টিসীমার ভয়াবহ দুর্বলতা। চালক চোখের সামনে পরিষ্কার দেখতে না পেলে বা রাতের বেলায় অন্ধত্ব অনুভব করলে যত ভালো গাড়িই হোক না কেন, তা দুর্ঘটনা এড়াতে পারে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাকরি হারানোর ভয়ে চশমা না পরেই রাতের পর রাত অনেক চালক বিপজ্জনকভাবে বাস-ট্রাকের মতো ভারি যানবাহন চালাচ্ছেন। বিআরটিএ ও সড়ক পরিবহন বিভাগ সম্প্রতি টার্মিনালগুলোতে বিনামূল্যে চালকদের চোখ পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে এবং পেশাদার লাইসেন্স নবায়নে চোখের টেস্ট রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পরীক্ষায় ৭৩ শতাংশ চালকের দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা পাওয়া গেছে, যাদের চশমা ব্যবহার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ক্যাম্পেইনের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ৮২৪ জন চালকের মধ্যে মোট ৫৪১ জন চালক চক্ষু পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের যৌথ উদ্যোগে স্বাস্থ্য ও চক্ষু পরীক্ষা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবরে পর্যন্ত। রাজধানীর নিকুঞ্জ এবং উত্তরা বিআরটিএ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গাবতলী বাস টার্মিনাল, মহাখালী বাস টার্মিনাল, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনাল এবং কুমিল্লা জিলা শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালিত হয়।

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের ভিড়। শৃঙ্খলা ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ / ফাইল ছবি

এতে উঠে আসে- প্রায় ৬৬ শতাংশ চালক চোখের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন। ৫৪১ জন চালকের মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশ চালকের দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা পাওয়া গেছে, যাদের চশমা ব্যবহার প্রয়োজন। এছাড়া ৪ শতাংশ ছানি সমস্যা এবং ২৩ শতাংশ অন্যান্য চোখের সমস্যা যেমন- শুষ্ক চোখ, অ্যালার্জির সমস্যা ইত্যাদি পাওয়া যায়। লক্ষণীয় যে, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত ২৬ শতাংশ এবং ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত ২৩ শতাংশ চালকের চোখের সমস্যা পাওয়া গেছে। এছাড়া ৮২৪ জন চালকের মধ্যে ৪০০ জন চালকের রক্তে শর্করা সীমার উপরে যা শতকরা ৪৯ শতাংশ, ২৫৮ জন চালক উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন রোড সেফটি প্রকল্প প্রকল্প সমন্বয়কারী শারমিন রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, পরীক্ষায় দেখা গেছে গণপরিবহনের চালকের সিটে বসা ৭৩ শতাংশ পেশাদার চালক চোখের কোনো না কোনো মারাত্মক সমস্যায় ভুগছেন। চালকদের একটি বড় অংশ দূরবর্তী সাইনবোর্ড, রাস্তার বাঁক বা রাস্তার বিভাজক ঝাপসা দেখেন, অনেকে চোখের ছানি সমস্যায় আক্রান্ত আবার অনেকে রাতের বেলায় আলোর প্রতিফলনে সাময়িক অন্ধত্ব বা কালার ব্লাইন্ডনেসে ভুগছেন। যার ফলে লাল ও সবুজ ট্রাফিক সিগন্যাল সঠিকভাবে চিনতে পারেন না।

তিনি বলেন, কিন্তু এ সত্য জানার পরও দেশের পরিবহন খাতে চালকরা চশমা না পরেই বা চিকিৎসা না করিয়েই মাসের পর মাস দূরপাল্লার নাইট কোচ ও ভারী ট্রাক বিপজ্জনকভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিষয়টির তীব্রতা ও সামাজিক গুরুত্ব অনুধাবন করে নিয়মিত বিনামূল্যে চালকদের জন্য চক্ষু ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা ক্যাম্প পরিচালনা করা উচিত। একই সাথে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন বা নতুন লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে নিবন্ধিত চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে পরীক্ষা সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত।

২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা জাতিসংঘের

জাতিসংঘের সেকেন্ড ডেকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি ২০২১-২০৩০ একটি সমন্বিত নিরাপদ সড়ক কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। জাতিসংঘ ২০২১-২০৩০ সময়কালকে সড়ক নিরাপত্তার দ্বিতীয় দশক হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ দশকের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে রোডক্র্যাশে মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত অন্তত ৫০ শতাংশ কমানো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোডক্র্যাশকে প্রতিরোধযোগ্য একটি অসংক্রামক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুসারে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এ ছাড়াও অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩.৬ অর্জনে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রোডক্র্যাশে প্রাণহানির সংখ্যা ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনার তাগিদ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক পর্যায়েও ২০৩০ সালের মধ্যে রোডক্র্যাশে নিহত ও আহতের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ কমিয়ে আনার উদ্যোগ হিসেবে বহুমুখী যানবাহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার, রোডক্র্যাশ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

সরকার ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। প্রস্তাবিত খসড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে জরুরি চিকিৎসা এবং উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষার বিধান রয়েছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট ও বারবার অপরাধে দ্বিগুণ জরিমানার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা অন্তত ৫০ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঘোষণা দিয়েছেন, ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ এবং আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার আলোকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ চূড়ান্ত করে অনুমোদন ও প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে রোডক্র্যাশে মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন।

সাত অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করে ১১১ সুপারিশ, বাস্তবায়ন হয়নি  

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, দেশে প্রতিদিন সড়ক ও মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল চললেও সমাধান ও প্রতিকারের বিষয়ে ধারাবাহিক ও সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। দিবস নির্ভরতায় কোনো সমাধান মিলবে না। সড়কে প্রাণহানি ও পঙ্গুত্বের ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়লেও এবং সম্প্রতি নাটোরে ১২ জনের মৃত্যুর মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটলেও এর স্থায়ী কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে বা কোনো বিশেষ দিবস আসলে তদন্ত কমিটি ও মিটিং হলেও পরবর্তীতে বিষয়গুলো আর গুরুত্ব পায় না। কেবল দিবস উদযাপন বা সভা-সমাবেশ করে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

সুপারিশ ও আইনের প্রয়োগহীনতা নিয়ে সাইফুন নেওয়াজ বলেন, সড়ক নিরাপত্তার জন্য ২০১৯ সালে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের মাধ্যমে ৭টি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করে মোট ১১১টি সুপারিশ প্রদান করা হয়েছিল। তবে এই বৈজ্ঞানিক গাইডলাইন বা সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে উচ্চপর্যায়ের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। সরকার বিদ্যমান আইন নতুন করে সংশোধনের কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের গতি মন্থর।

সড়ক খাতে মৌলিক সংকটগুলো চিহ্নিত করে বুয়েটের এই শিক্ষক বলেন, “মহাসড়কে দ্বিমুখী গাড়ি চলাচলের সময় দুর্ঘটনা এড়াতে অন্তত প্রয়োজনীয় সড়ক বিভাজক বা আইল্যান্ড নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরিবহন শ্রমিকরা কোনো নির্দিষ্ট নিয়োগপত্র বা নির্ধারিত কর্মঘণ্টা থেকে আজও বঞ্চিত। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকায় ঈদ বা পূজার মতো ছুটির মৌসুমে যাত্রীর চাপে চালকরা না ঘুমিয়ে একটানা গাড়ি চালান, যা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অনেক মালিক ছুটির সময়ে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই বাস নামান। এছাড়া মহাসড়কে চলার অনুপযোগী, ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহন দীর্ঘদিন ধরে চলাচল করছে। ক্ষতিপূরণ ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজন বা পঙ্গুত্ব বরণ কারীরা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। পাশাপাশি সাধারণ চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে দুর্ভোগ ও দীর্ঘ লাইন, সড়কে মামলা সংক্রান্ত হয়রানি এবং হেলমেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক শিথিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন

সরকার ইতোমধ্যেই 'সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬'-এর খসড়া প্রস্তুত সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ২০২৭ সালের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকার ইতোমধ্যেই 'সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬'-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। এতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা, চিকিৎসায় সহায়তাকারী বা উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা (গুড সামারিটান নীতি), ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের জন্য ডেমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থা এবং বারবার অপরাধ করলে দ্বিগুণ জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।