রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিংয়ে অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে কারা কী উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছেন সে রহস্য কিছুতেই কাটছে না। রহস্যঘেরা ওই মাদক ও মদের আড্ডায় বেসরকারি কয়েকটি করপোরেট কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তার উপস্থিতি ছিল বলে জানা গেছে। অভিযানের সময় তারা গা-ঢাকা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
জানা গেছে, বাড়িটিতে রহস্যময় গোপন বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বিতর্কিত বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কমপক্ষে ২০ জন কর্মকর্তা। ছিলেন গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি), প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, ফিলিপ মরিস, ইয়ামাহা মোটরসাইকেল সংযোজনকারী ও পরিবেশক এসিআই মোটরসসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত পদস্থ কর্মকর্তারা। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার একটি বাড়িতে জড়ো হওয়াকে ‘কাকতাল’ মানতে নারাজ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য ও গোয়েন্দারা। তারা বলছেন, ওই বৈঠকের নেপথ্যে রয়েছে গভীর রহস্যময় ষড়যন্ত্র।
পুলিশ জানিয়েছে, পুলিশ অফিসার্স হাউজিংয়ের ওই বাড়িটি মঙ্গলবার ওএসডি হওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের। বাড়িটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির কাছে ভাড়া দেওয়া ছিল। সেখানে গত সোমবার রাতে অভিযানে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল। তবে অভিযান থামাতে নানামুখী তদবির করেন আব্দুল্লাহ আল জহির। কিন্তু তদবির উপেক্ষা করে অভিযান অব্যাহত রাখে ডিবি পুলিশ।
পরে সেখান থেকে মোট ৮৫ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে পুরুষ ৫৯ ও নারী ২৬ জন। আটকদের মোবাইল কোর্ট বসিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও জরিমানা করা হয়। পুরুষদের এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১,০০০ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরো তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নারীদের ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১,০০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মঙ্গলবারই তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে ২৬ জনকে নেওয়া হয় কাশিমপুর কারাগারে। অন্যরা আছেন কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ।
কারা, কী উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ডিআইজির ওই বাড়িতে জড়ো হয়েছেন, সেটা পরিষ্কার করেনি তদন্ত সংস্থা। জানতে চাইলে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনারী সংস্থা ডিবিপুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘তাদের প্রত্যেককে নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের পেশা বা কী উদ্দেশ্যে তারা জড়ো হয়েছে, সেটা জানতে পারিনি।’ এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। এমনকি যাদের সাজা দেওয়া হয়েছে, তাদের নাম পরিচয়ও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ডিবিপুলিশের পক্ষ থেকে তালিকা প্রকাশ করতেও অপারগতা প্রকাশ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে সাজাপ্রাপ্তদের তালিকা সংগ্রহ করে আমার দেশ। তাতে দেখা যায়, অনেকে তাদের সঠিক নাম দিলেও পেশা, বাড়ির ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেননি। ফলে আটকদের পরিচয় নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। অনেকে ছদ্মনামও ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোবাইল কোর্টে সাজাপ্রাপ্ত এসব নারী ও পুরুষের প্রায় সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের। তাদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার দুই কন্যা, পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের ছেলে ও মেয়েরা রয়েছে। আছেন একটি বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থার ট্রেইনি ক্যাপ্টেনও। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের বিস্তারিত পরিচয়, পেশা, সেখানে জড়ো হওয়ার উদ্দেশ্য, সেখানে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড ছিল কি না তা খতিয়ে দেখছে।
খিলক্ষেত থানার ওসি আব্দুল আলীম আমার দেশকে বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো আসামি হস্তান্তর করা হয়নি। ডিবি পুলিশের অভিযানের পর মোবাইল কোর্ট বসিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান ও জরিমানা করা হয়। ডিবির তত্ত্বাবধানে আসামিদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। থানায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়নি।’
গুলশান আরা ও দেবাশীষ-সংশ্লিষ্টতা
রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতার অভিযোগে গত ১২ অক্টোবর রাজধানীর পল্লবী ও বনানী থেকে ডিবিপুলিশ গ্রেপ্তার করে সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরাকে। তারা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানান।
অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও উসকানিমূলক প্রচারের তথ্য পায় পুলিশ। তারা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছিল। পরে তাদের সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে ওই রহস্যময় গোপন বৈঠকের সঙ্গে গুলশান আরা ও দেবাশীষের কর্মকাণ্ডের যোগসাজশ রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দাদের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ইতোমধ্যে তারা বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্যও হাতে পেয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করেননি।
১৫ দিনের কারাদণ্ড পাওয়া ২৬ নারী
অতিরিক্ত ডিআইজির রহস্যময় সেই বাড়ি থেকে আটক ২৬ নারীকে ১৫ দিন করে কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করা কেএম সাওফা সিলভি (২৬), পিতা—কেএম এনায়েতুর করিম; এশিয়াটিকের কর্মকর্তা মিরপুরের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আফসানা বুলবুল (২৭), পিতা—হামিদ নেওয়াজ; এশিয়াটিকের আরেক কর্মকর্তা সামজানা মেহজাবীন (২৬), পিতা—ইদ্রিস আলী, মেহজাবীন নিজেকে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শেষ বর্ষের ছাত্র পরিচয় দেন। তবে তা ভুয়া বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। টঙ্গীর এবিএ গার্মেন্টসের কর্মকর্তা ফারিয়া জামান (২৬), পিতা—আক্তারুজ্জামান; ক্লোথিং ব্র্যান্ড উদ্যোক্তা ফারিয়া সুন্নাহ (২৭), পিতা—ফেরদৌস আলী; সিটি ব্যাংকের অ্যাসোসিয়েট ম্যানেজার নিশাত সাল সাবিল মিম (২৭), পিতা—নুরুল ইসলাম; ধানমন্ডির ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রী মালিহা, পিতা—আব্দুল বাতেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সারিকা (২৫), পিতা—আব্দুল হান্নান চৌধুরী।
তালিকায় আরো আছেন গেট লিবরেজের অপারেশন স্পেশালিস্ট রিফা (২৬), পিতা—শাহ আলম; মোহাম্মদপুরের ইফতিদা (২৩), পিতা—মিন্টু; ছাত্রী ফাউন্ডেশন প্যানস্টোন একাডেমির নায়মা, পিতা—আমিনুল ইসলাম; ক্লোথিং ব্র্যান্ড উদ্যোক্তা মুনমুন রায় বর্ষা (২৫), পিতা—বিমল রায়, রাজধানীর কাওলা সিভিল অ্যাভিয়েশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী তাসকিন হোসাইন রাহা (১৯), পিতা—তানভীর হোসেন; আইইউবি থেকে অনার্স সম্পন্ন করা হৃদি (২৪), পিতা—মমিনুর রশিদ; এসিআই মোটরসের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইয়ামাহা মোটরের প্রোডাক্ট এক্সিকিউটিভ নাছরিন সুলতানা (২৬), পিতা—জামান হোসেন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কনসালটেন্ট ও গ্রামীণফোনে ঊর্ধ্বতন পদে কর্মরত সায়মা (২৬), পিতা—মঞ্জুরুল মাওলা; ডিজিটাল প্রোডাক্ট কোম্পানির ফ্রি ল্যান্সার ও এশিয়াটিকে কর্মরত ওয়াফা (৩২), পিতা—রফিক।
এছাড়াও তালিকায় আছেন—আমেরিকাভিত্তিক কল সেন্টারে কর্মরত মোহাম্মদপুরের আনিকা বেলাল করিম (৩০), পিতা—আনিস মাহমুদ; স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মালিহা (২৬), পিতা—জাকির রহমান; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আফরা (২৪), পিতা—আব্দুল মান্নান; মিরপুর বিইউপির সাবেক ছাত্রী সামরাইন (২৩), পিতা—শফি ইকবাল; আইইউবির ছাত্রী সোহা (২১), পিতা—শফি ইকবাল; মিরপুর ডিওএইচএসের সাবরিনা (১৯), পিতা—সিহাব ইকবাল; বিইউপির ছাত্রী জারিন তাসনিম (২৬), পিতা—মেজর (অব.) সোয়েব; আমেরিকা থেকে ছুটিতে আসা সামিয়া (২৫), পিতা— কামরুজ্জামান। চট্টগ্রাম এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর ইউমেনের ছাত্রী রুবাবা মোহাম্মদী (২৫), পিতা— আব্দুল কাদির।
৫৯ যুবককে এক মাসের কারাদণ্ড
অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়ি থেকে মাদকদ্রব্যসহ গ্রেপ্তার ৫৯ পুরুষকে এক মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সাজা পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন—চট্টগ্রামের এনায়েত বাজারের সুকেন্দু বিকাশ বড়ুয়ার ছেলে রানা বড়ুয়া (৩৮), মিরপুর ডিওএইচএসের শহিদুল হাসানের ছেলে নাদবি হাসান (২৬), উত্তর ইব্রাহিমপুরের আবু জাফর মোল্লার ছেলে সাদমান রাফিক (২৫), উত্তরা পশ্চিমের মৃন্ময় গুহের ছেলে পরম গুহ (২৬), ধানমন্ডির আবু মো. শফিউল আজমের ছেলে আবু মো. মুহসিউল আজম (৩২), গ্রিন রোডের উমর আল ফারুকের ছেলে মোরসালিন (২৪), গুলশান-২-এর এহসানুল হকের ছেলে রাইয়ান আব্দুল্লাহ সাকিবুল হক (২৭), মিরপুর ডিওএইচএসের শহিদ উল্ল্যার ছেলে রামিম আল রাফি নাসিম (২৫), ধানমন্ডির সেলিস এইচআর-এ ইন্টার্ন হিসেবে কর্মরত শেওড়াপাড়ার ইছাক আলীর ছেলে সাদমান সাকিব (২৮), ধানমন্ডির পাভেল শাহাবুদ্দিনের ছেলে আল শাহরিয়ার রুদ্র (২২), তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) ছাত্র।
দণ্ডিতদের মধ্যে আরো আছেন— পশ্চিম শেওড়াপাড়ার আহসান হাবীব সুমনের ছেলে সাদমান বিন আহসান (২৫), তিনি গুলশান-১-এর ‘ইটিআই বাংলাদেশ’ এনজিওর কর্মকর্তা। বনানীর আব্দুল ছাত্তারের ছেলে হানজালা নূর সাঈদ (২৭); তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র। পশ্চিম মালিবাগের শাহ মো. জুবায়ের হোসেনের ছেলে শাহ মো. শাফায়েত হোসেন (২২); তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ইসিবি চত্বরের আব্দুর রহমানের ছেলে নাঈমুর রহমান (২৬); তিনি গাজীপুরের আইইউটির ছাত্র। উত্তর বাড্ডার ইমরুল আলমের ছেলে সাইফুল ইসলাম রাফি (২৬); তিনি উত্তরার শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ধানমন্ডি-৩২-এর কামরুল ইসলামের ছেলে হাসিব খান (২৬); তিনি আইইউবির ছাত্র। বনানীর নিয়ামত উদ্দিন আহমেদের ছেলে তাওহিদ (২৭); তিনি ফিলিপ মরিসের (মালবোরো) ম্যানেজার।
আরো আছেন পল্লবীর নুরুল ইসলামের ছেলে মো. সাদাত (২৮); তিনি মারভেল কোম্পানির কমিউনিকেশন লিড (জনসংযোগ কর্মকর্তা)। কাফরুলের জাহাঙ্গীর হারুনের ছেলে জিফান তাহমিদ (২৯); তিনি ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ব্যবসায়ী। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আব্দুল জলিলের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার শাহিন ভূঁইয়া (৩২)। ইসিবি চত্বরের জামাল হোসেন সিকদারের ছেলে জুবায়ের সিকদার (২৫); তিনি বিইউপির চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। পুরান ঢাকা কোতোয়ালির ফারিয়াজ আরজুর ছেলে ফারাহিম ফাইয়াজ (২৭); তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের সেলস অ্যান্ড রিজার্ভেশন অফিসার। উত্তর কাফরুলের গোলাম কিবরিয়ার ছেলে শায়ান কিবরিয়া (১৯); তিনি আদমজী কলেজের শিক্ষার্থী (এইচএসসি পাস)। খিলক্ষেত লেকসিটির বাবর আলীর ছেলে মাহবুবুল আলম (৩৮); তিনি গোল্ডেন সানরাইজের ম্যানেজার। কলাবাগান সেন্ট্রাল রোডের সোহেল আহমেদের ছেলে ফারহান আহমেদ (২৫); তিনি বিইউপির চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। কাঁঠালবাগানের জয়নাল আবেদিনের ছেলে আইমান আবেদিন রাফিন (২৫); তিনি অনলাইন পেজ মডারেটর।
দণ্ডিতদের মধ্যে আরো আছেন মোহাম্মদপুরে শেখ ফজলুল হকের ছেলে শেখ ফাহিম হক (২৬); তিনি আইইউবির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ভাটারা ব্লক-জির মির্জা বকুলের ছেলে মির্জা আরেফিন (২৭)। পল্লবীর এমএ গফুরের ছেলে মেহরাব রহমান (২৬); তিনি বিইউপির এমবিএর ছাত্র। রূপগঞ্জ জলসিঁড়ি আবাসন এলাকার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকিরের ছেলে হিম (১৯); তিনি বিইউপির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। মিরপুর ক্যান্টনমেন্টের হাসান মোহাম্মদ তানভির ইমতিয়াজের ছেলে রাশিক ইভতেসাম (২০); তিনি আদমজী কলেজের শিক্ষার্থী (এইচএসসি পাস)। ভাটারার রাশেদুল হকের ছেলে রাফিয়াদ দারাজাদ হক (২৩); তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কোতোয়ালির নবাবপুর রোডের এরফান হাসান (৩০); তিনি ঢাকা ট্রিবিউনের সাবেক সাংবাদিক। ধানমন্ডির ড. হাবিবুর রহমানের ছেলে মাহমুদ ফাহিম রহমান শান্ত (২৫); তিনি কিংস কলেজ লন্ডনের ছাত্র।
আরো আছেন ক্যান্টনমেন্ট ইসিবি এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলাম তানজিম (২৭); তিনি প্রাণ আরএফএলের ব্র্যান্ড ম্যানেজার। শাহজাহানপুর শহীদবাগের মঈনুল হকের ছেলে সাফওয়ান হক (২৭); তিনি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। বসুন্ধরার জামাল উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে রাফি আহমেদ চৌধুরী (২২); তিনি এআইইউবির ছাত্র। কাফরুলের মো. মনিরুজ্জামানের ছেলে মাফি মুস্তাফা (২৫); তিনি ইনভিজিবল টেকের (ইউএসএ) ডেটা অ্যানালিস্ট। আফতাবনগরের শফিক উল্লাহর ছেলে তানজির আহমেদ (৩১); তিনি এশিয়াটিক মিডিয়া লিমিটেডের (এএমএল) সিনিয়র ম্যানেজার। মিরপুর-১২ পল্লবীর মো. মাইনুদ্দিনের ছেলে সাজিদ মাহমুদ (২৬); তিনি এশিয়াটিক মাইন্ডশেয়ার বিডির স্ট্র্যাটেজিক কর্মকর্তা। উত্তর বাসাবোর মহসিন সরকারের ছেলে ফাইজাল আলভি সরকার আদব (২৫); তিনি এআইইউবির সিএসইর ছাত্র। ধানমন্ডির মাহফুজুর রহমানের ছেলে ওমর বিন মাহফুজ (২৪); তিনি ফোর ট্রেডার্স লিমিটেডের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
দণ্ডিতদের মধ্যে আরো আছেন— বসুন্ধরার সাজ্জাদুল আলম সেজান (২৭)। মিরপুর ক্যান্টনমেন্টের আব্দুস সালামের ছেলে ফয়সাল আহমেদ(২৪); তিনি এমআইএসটির স্টুডেন্ট ও রিসার্চ অ্যানালিস্ট। ক্যান্টনমেন্টের মাটিকাটা বাজারের ইসমাইল হোসেনের ছেলে তানজিদ ইসলাম সিয়াম (১৯); তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র। বনশ্রী রামপুরার মিজান মাওলার ছেলে আফতাবুল মাওলা রাব্বি (২৪); তিনি প্রাইমটেক্স লিমিটেডের সিনিয়র ভেন্ডর ম্যানেজার। পশ্চিম রামপুরার ইয়ামিন খানের ছেলে ইউসুফ খান পলক (২৫); তিনি বিআইইউপির সিএসইর ছাত্র। ক্যান্টনমেন্ট ইসিবি এলাকার মাইনুদ্দিন মানিকের ছেলে মনিরুল ইসলাম (২৬); তিনি আইইউবিএটির বিবিএর ছাত্র।
আরো আছেন— নর্থ কাফরুলের সুলতান আহমেদের ছেলে ফেরদৌস আহমেদ (৩০); তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগে কর্মরত। শান্তিনগরের শাহ নিয়াজ আকনের ছেলে হাসান হাফিজুর (২৭), খিলক্ষেতের রেজাউল করিমের ছেলে সাজিউর রহমান (২৬), শান্তিনগরের শহিদুল আলম চৌধুরীর ছেলে হামেদ হাসান (২৪), শান্তিনগরের মহিউদ্দিন খানের ছেলে ফারহান খান সাদাফ (২৫), দক্ষিণখানের কাজী তাহমিদ ইসলাম (২৮); তিনি এশিয়াটিকের কমনিওর কোম্পানিতে এসডিআর পদে কর্মরত। লালমাটিয়ার শেখ মনিরুল আলম টিটুর ছেলে শেখ অধ্যায় আলম (২৩)। মিরপুর-১০-এর মাসুদ রানার ছেলে আরিয়ান মানাভ (২৭), পশ্চিম শেওড়াপাড়ার জলিল উদ্দিনের ছেলে নাহিন আলী জাকি (২৬), মিরপুর ডিওএইচএসের জামাল হোসেনের ছেলে তাজওয়ার তাহমিদ জামাল (২৬) এবং ঢাকার কাঁটাবন রোডের শেখ ফরিদ হোসেন চৌধুরীর ছেলে আইমান শাবিত চৌধুরী (২৫)।
তাদের বিষয়ে পরিবারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অনেকে নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করেছেন বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন।

রিসোর্ট বা বারের অনুমোদন নেই
বাড়িটি এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলার প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত হলেও আবাসিক হোটেল বা রিসোর্ট হিসেবে অনুমোদনপ্রাপ্ত ছিল না। ছিল না বার ও রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স। অবৈধভাবেই বাড়িটিতে চলছিল বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
বাড়িটির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির দাবি করেছেন, জন্মদিন বা গায়ে হলুদের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য অনলাইনে বাড়িটির উঠান ভাড়া দেওয়া হতো। তবে (ডিবি) বাড়িটিতে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর সময় দেখা যায়, ওই বাড়িতে প্রতি মাসে ২০-২২টি বাণিজ্যিক ডিজে পার্টির আয়োজন হতো। সেখানে নিয়মিত বসত মাদক ও মদের আসর।
পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত চলছে
অতিরিক্ত ডিআইজি বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ আল জহিরকে ইতোমধ্যে ওএসডি করা হয়েছে। তার বিষয়ে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। তার বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত মঙ্গলবার আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়েছে। পাশাপাশি তার এই জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণের আয়ের উৎস নিয়েও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধানে নেমেছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি বাড়িটি ভাড়া নিয়ে কেউ রাতযাপন করতেন, আবার কেউ পার্টি করতেন। তার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও।
জন্মদিনের পার্টির কথা বলে ভাড়া নেওয়ার দাবি
অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি জহির বলেন, ‘আমি অনলাইনে নিয়মিত বাড়িটি ভাড়া দেই এবং সেখানে কিছু কঠোর নিয়মও রয়েছে। এবার জন্মদিনের পার্টির কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। সেখানে যদি কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে, তবে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তবে আমি অসৎ উদ্দেশ্যে কখনোই বাড়ি ভাড়া দেইনি।’
৭০ শতাংশ ভাড়া নিতেন জহির
পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় সাড়ে ছয় কাঠা জমির ওপর নির্মিত তিনতলা বাড়িটি অনলাইনে ‘এয়ারবিএনবি’ অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। জহির বাড়িটি পরিচালনার জন্য মাহবুব আলম নামে একজনকে ‘কো-হোস্ট’ হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, ওই বাড়ি থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার ৭০ শতাংশ টাকা জহিরের অ্যাকাউন্টে জমা হতো এবং অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ মাহবুব নিতেন। বাড়িটি এক পুলিশ কর্মকর্তার হওয়ার সুবাদে স্থানীয় পর্যায়ে কেউ এর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস করত না বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ ।
এছাড়া ভাটারা থানা এলাকায় তার সাড়ে ছয় কাঠা জমি কেনার টাকার উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, এয়ারবিএনবি হলো একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস বা প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মানুষ তাদের বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, ভিলা বা রুম স্বল্প ও দীর্ঘ সময়ের জন্য পর্যটক বা অতিথিদের কাছে ভাড়া দিতে পারেন এবং অতিথিরা বুকিং করতে পারেন।
অভিযান পরিচালনাকারী ডিবি উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, বাড়িটিতে নিয়মিত ডিজে পার্টির নামে অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদকের আসর বসত। মদ, নারী ও অসামাজিক কার্যকলাপ—সবই চলত ফ্রি স্টাইলে।
পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট এই বাড়িতে একেকটি রুম ১০ জন পর্যন্ত ভাড়া নিত এবং অতিরিক্ত লোক থাকলে প্রতিজনের জন্য ৬০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হতো। দুপুর ১২টা থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে মাসে গড়ে ১৮ থেকে ২০টি প্রোগ্রাম হতো এবং প্রতিটি অনুষ্ঠান থেকে লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হতো। তল্লাশিতে বাড়িটি থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।