Image description

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, কর্মস্থলে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সাধারণ মানুষকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে অফিসে উপস্থিতি ও প্রস্থানের সময় মেনে চলার নির্দেশনাও জারি করা হয়।

সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কর্মরতদের প্রতিদিনের হাজিরা সিস্টেম তদারকি করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, ৪৩টি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডিজিটাল হাজিরা সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট করে আইসিটি ডিভিশন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও ডিজিটাল হাজিরা দেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন ডিজিটাল হাজিরা সিস্টেমটা কেমন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হাজিরার প্রেজেন্টেশন দেখানো হয়েছে।

সেখানে আমাদের প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ডিজিটাল হাজিরার সিস্টেমের এক্সেস মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব এবং আইসিটি বিভাগের সচিবকে দেওয়া আছে। তিনি বলেন, ‘স্যারেরা চাইলে যে কোনো সময় যে কোনো মন্ত্রণালয়ের অফিসারদের অবস্থান দেখতে পারবেন যে, তারা কখন অফিসে আসছেন আবার কখন অফিস ত্যাগ করে চলে যাচ্ছেন।’

সচিবালয়, সরকারি হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝটিকা পরিদর্শন করছেন প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। তাদের এসব আকস্মিক পরিদর্শনে উঠে আসছে দাপ্তরিক উপস্থিতি, সেবার মান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার নানা দিক।

সরকারের এই তৎপরতায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা। শুধু নির্দেশনা জারি করেই দায়িত্ব শেষ না করে সরেজমিনে পরিস্থিতি যাচাই, হাজিরা খাতা দেখা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সরকারি অফিসে সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তদারকিতে নেমেছেন। চলতি বছরের ২৯ মার্চ সকালে তিনি সচিবালয়ে গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দপ্তর আকস্মিক পরিদর্শন করেন। সকাল ৯টার কিছু পর সচিবালয়ে পৌঁছে তিনি হেঁটে বিভিন্ন ভবনে যান এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতির খোঁজ নেন।

এ সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কক্ষে গিয়ে তাদের কর্মস্থলে উপস্থিতি ও দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন প্রধানমন্ত্রী। পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে অফিস শুরুর সময় থেকেই কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকার বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়। দাপ্তরিক কাজে গতি আনা, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো এবং অফিসের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন।

সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রের দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী নিজে গিয়ে উপস্থিতি যাচাই করায় সরকারি কর্মচারীদের সময়ানুবর্তিতা নিয়ে সরকারের প্রত্যাশা নতুন করে আলোচনায় আসে। এতে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর বার্তাও যায়

আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শন

সরকারের তদারকি শুধু সচিবালয় বা মন্ত্রণালয়ের দপ্তরে সীমাবদ্ধ নেই। সাধারণ মানুষের সরাসরি সেবা পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সরকারি হাসপাতালও আকস্মিক পরিদর্শন করছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী।

গত ৭ মার্চ গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝটিকা পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। পরিদর্শনে চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে। হাসপাতালের ওয়ার্ড ও শৌচাগারের পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকার বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

এরপর ২৩ মার্চ ঈদুল ফিতরের ছুটির মধ্যে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার বাস্তব অবস্থা যাচাই করাই ছিল এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। এরপর ২৪ মার্চ দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রমও ভিডিওকলে পর্যবেক্ষণ করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। এ সময় হাজিরা খাতাসহ হাসপাতালের কার্যক্রমের বিষয়ে খোঁজ নেন তিনি। এসব উদ্যোগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক ও কর্মীদের উপস্থিতি, সেবার মান এবং রোগীদের ভোগান্তির বিষয়গুলো সামনে এসেছে।

এ ছাড়া ২৬ আগস্ট মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়ম শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এসব অভিযান সরকারের নজরদারি কার্যক্রমেরই অংশ।

এলজিইডিতে ঝটিকা পরিদর্শন

সরকারি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ৬ এপ্রিল সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) ঝটিকা পরিদর্শনে যান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি সেখানে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি যাচাই করেন। এতে দেখা যায়, অফিস শুরুর নির্ধারিত সময়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত হতে পারেননি।

অফিস শুরুর সময়ের পাঁচ মিনিট আগেই কার্যালয়ে পৌঁছান প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু তখনো অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে আসেননি। সকাল ৯টায় কার্যালয়ের মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি দপ্তরে সময়ানুবর্তিতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নৈতিকতা থাকা প্রয়োজন। সরকারি দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা, সময়ানুবর্তিতা ও জনসেবার মানসিকতা অপরিহার্য বলেও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সময়মতো অফিসে উপস্থিতির নির্দেশনা

সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নির্দেশনা জারি করে। এতে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিতি ও প্রস্থানের বাধ্যবাধকতা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ এবং সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪ অনুসরণের বিষয়টিও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়। এরপরও কোনো কোনো সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাসময়ে উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় মাঠপর্যায়ে তদারকির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একদিকে প্রশাসনিক কাজে গতি বাড়বে, অন্যদিকে সরকারি সেবা নিতে আসা মানুষের ভোগান্তিও কমবে।

চলতি বছরের ২ মার্চ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবশ্যই সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব নির্দেশনার মূল লক্ষ্য দাপ্তরিক কার্যক্রমের শুরু থেকেই কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং অফিস সময়ে প্রশাসনিক সেবা সচল রাখা।

এ বিষয়ে সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার আমার দেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল হাজিরা দেখা ও মন্ত্রীদের বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা অভিযান শতভাগ সমর্থন করি। ইউরোপ, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে নির্ধারিত সময়ের পর অফিসে আসা, কাজের সময়ে আড্ডা দেওয়া কিংবা কাজ শেষ না করে আগে চলে যাওয়ার সংস্কৃতি নেই।

তিনি বলেন, সময়মতো অফিসে না আসা বা নির্ধারিত সময়ের আগে চলে যাওয়া এক ধরনের নৈতিক দুর্নীতি। সময়ানুবর্তিতার মতো এই বেসিক বিষয়গুলোর চর্চা বাড়ালে ধীরে ধীরে অন্যান্য ক্ষেত্রেও উন্নয়ন ঘটবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হলো টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিটি প্রশাসনিক স্তরের নজরদারি রাখা। অতীতে এরশাদ সাহেব তার ১০ বছরের শাসনামলে হঠাৎ হঠাৎ সচিবালয়ের গেটে গিয়ে দাঁড়াতেন এবং বিলম্বে আসা কর্মকর্তাদের আটকে গেট বন্ধ করে দিতেন।’

সরকারের সাবেক এ কর্মকর্তা বলেন, সময়ের নীতি না মানলে প্রথমে মোটিভেশনমূলক বার্তা দেওয়া উচিত। তাতেও কাজ না হলে আইনের আওতায় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।