একটি সিংহের রাতে ঘুম হতো না। শিকার খাওয়ার পর বয়সের কারণে দাঁতে মাংস জমে থাকত, আর রাতে ইঁদুরের উৎপাত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাত। ইঁদুর তাড়ানোর জন্য সিংহ একটি বিড়ালকে নিয়োগ দিল। বিড়ালটি ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করছিল। কিন্তু কিছুদিন পর অসুস্থ হয়ে পড়লে নিজের ছেলেকে কাজে পাঠায়। বিড়ালের ছেলে এসে দেখে ইঁদুর বারবার আসে, আর তাকে বারবার তাড়াতে হয়। এই ঝামেলা এড়াতে একদিন সে সব ইঁদুর মেরে ফেলে। তাতেই ঘটে বিপত্তি। সিংহ খুশি হওয়ার বদলে তাকে চাকরিচ্যুত করে বলে, ‘তুই চাকরি ছাড়, তুই যা।’
মাদকের চালান নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বোঝাতে এই রূপক গল্পের অবতারণা করা হলেও অপরাধ দমনের বর্তমান ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া অনেকটা এই গল্পের জটিলতার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, চালান আটক হচ্ছে, কিন্তু অপরাধের চক্র ভাঙা যাচ্ছে না। একদল ধরা পড়লে অন্য দল জায়গা নিচ্ছে। বারবার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাও কয়েকদিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসছেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, ‘৮ থেকে ২০ বার পর্যন্ত ইয়াবাসহ ধরা পড়েছেন, এমন ব্যক্তিরাও গ্রেপ্তারের মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। তাহলে অভিযান চালিয়ে লাভ কতটা। সীমান্ত দিয়ে ১০০টি ইয়াবার চালান এলে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিশেষ রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) মিলে হয়তো দুটি আটকাতে পারে। বিশাল সমুদ্র থেকে এক বালতি পানি তোলার মতোই এই সাফল্য।’
এই বক্তব্যের বাস্তব চিত্র যেন দেখা গেল চট্টগ্রাম নগরের মনসুরাবাদে। একটি খালি ট্রাকের পাটাতনের নিচে বিশেষ কৌশলে তৈরি গোপন চেম্বার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। মাদক পরিবহনে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ট্রাকচালক মো. রুহুল আমিনকে (৪৫)।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (ডিবি-দক্ষিণ) শেখ শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘কক্সবাজারের পেকুয়া থেকে খালি ট্রাকটি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন রুহুল। তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, গাড়িটি চালিয়ে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ী মোড় অতিক্রম করার পর অন্য একজন ট্রাকের নিবন্ধন নম্বর দেখে সংকেত দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। এরপর চালানের পরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছানোর নির্দেশনা দেওয়ার কথা ছিল।’
গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, মাদক সিন্ডিকেটের এটি নতুন কৌশল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে পুরোনো বা চিহ্নিত মাদক কারবারিদের পরিবর্তে নতুন ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের দিয়ে মাদক পরিবহন করানো হচ্ছে। ফলে পরিচিত কারবারিদের ওপর নজরদারি থাকলেও নতুন বাহকদের মাধ্যমে চালান পরিবহনের চেষ্টা চলছে।
চট্টগ্রামে প্রায় ১০ কোটি টাকার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা দেশে প্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই ইয়াবার চালান ও বহনকারী আটক করছে। কিন্তু সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে না। একটি চক্রের কয়েকজন ধরা পড়লে সেখানে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরও কয়েকজন।
সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার নথিতে কক্সবাজারের উখিয়ায় ইয়াবা কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ১০৮ জনের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে তিন সহোদরকে গডফাদার, দুইজনকে পাইকারি বিক্রেতা এবং ১০৩ জনকে খুচরা বিক্রেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের তালিকায় একাধিক নারীর নামও রয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় সূত্রের মতে, ইয়াবা পাচারের অন্যতম প্রবেশপথ হিসেবে উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবা প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ের কারবারিদের হাতে পৌঁছায়। এরপর একাধিক হাত ঘুরে তা যায় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। তাদের মাধ্যমে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ে উপজেলা থেকে দেশের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়।
তালিকায় উখিয়ার পাঁচটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের নাম রয়েছে। সবচেয়ে বেশি নাম এসেছে রাজাপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে।
গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি তালিকায় এক থেকে তিন নম্বরে থাকা তিন ভাই হলেন জালিয়াপালং ইউনিয়নের শফির বিল গ্রামের মো. হোসেন আলী, রৌশন আলী ও জসিম উদ্দিন। তাদের মাদক কারবারের গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তিন ভাইয়ের নামে উখিয়া ও রামু থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তারা বর্তমানে পলাতক।
তালিকায় পাইকারি বিক্রেতা হিসেবে নাম রয়েছে জালিয়াপালং ইউনিয়নের রূপবতী গ্রামের আহসানুল করিম ও জসিম উদ্দিনের। তাদের বিরুদ্ধে উখিয়া, কক্সবাজার সদর ও টেকনাফ থানায় মামলা রয়েছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তারা বর্তমানে কারাগারে আছেন।
অন্যদিকে, ১০৩ জনকে খুচরা মাদক কারবারি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।
গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য, উখিয়ার বালুখালী, শিয়াল্লাপাড়া, বেতবুনিয়া, দরগাবিল, ডেইলপাড়া, ডিগিলিয়া, বরইতলী, রহমতের বিল ও ধামনখালীসহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে ইয়াবার চালান আসে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সড়কপথে এসব ইয়াবা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যায়। সীমান্ত থেকে স্থানীয় বাজার এবং সেখান থেকে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থায় একাধিক স্তরের কারবারি যুক্ত রয়েছে।
এ ব্যবস্থায় বাহকরা সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ। তাদের কাছ থেকে চালান উদ্ধার করা যায়, গ্রেপ্তারও করা যায়। কিন্তু তাদের পেছনে থাকা পাইকারি বিক্রেতা, অর্থদাতা, পরিবহন সমন্বয়কারী ও মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা না গেলে সরবরাহব্যবস্থা সচল থাকার সুযোগ তৈরি হয়। উখিয়ায় বারবার চালান আটকের পরও কারবার বন্ধ না হওয়ার পেছনে এমন দুর্বলতার অভিযোগ তুলছেন স্থানীয়রা।
উখিয়ার স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবাসহ বাহককে আটকের মাধ্যমে অনেক সময় অভিযান শেষ হয়ে যায়। বাহকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূল হোতাদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ না থাকায় নতুন নতুন বাহক তৈরি হচ্ছে। ফলে ব্যক্তি বদলালেও কারবারের কাঠামো অক্ষত থাকছে।
উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাকিবুল হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে মাদক কারবারিরা ঘন ঘন পাচারের কৌশল ও পথ পরিবর্তন করছে। মাদক নির্মূল এবং তালিকাভুক্ত কারবারিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
উখিয়া-টেকনাফে ইয়াবা কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রশ্ন করেন, উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় ইয়াবা পাচারের কর্তৃত্ব এখন কার হাতে? আবদুর রহমান বদির স্থলাভিষিক্ত কে হয়েছেন? তার এই প্রশ্ন ঘিরে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
কক্সবাজার-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরীর বাড়ি উখিয়া উপজেলায়। অন্যদিকে, আবদুর রহমান বদির বাড়ি টেকনাফে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমানে উখিয়ায় ইয়াবা কারবারিদের তৎপরতা বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেকে ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করছেন। অতীতে টেকনাফের ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে আবদুর রহমান বদির নাম ও প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি ইয়াবা কারবারিদের তালিকায় বদির ভাইদের নামও ছিল। তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, উখিয়া সীমান্তে প্রায়ই ইয়াবার চালান আটক হলেও সরবরাহ বন্ধ হয়নি। বরং নারী, পুরুষ, যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরও এ কারবারে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী মনে করেন, ইয়াবা দমনের ক্ষেত্রে শুধু অভিযান বাড়ালেই হবে না, অপরাধের পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভাঙতে হবে। বিপুলসংখ্যক চালানের তুলনায় আটক চালানের সংখ্যা কম। আবার গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এলে অভিযান থেকে তৈরি হওয়া চাপও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
ডিআইজি টাইমসকে বলেন, দেশে আসা প্রতি ১০০টি চালানের মধ্যে পুলিশ, বিজিবি ও এসআরবি মিলে হয়তো মাত্র দুটি আটকাতে পারে। তার তুলনায়, এটি বিশাল সমুদ্র থেকে এক বালতি পানি তোলার মতো। ৮ থেকে ২০ বার পর্যন্ত ধরা পড়ার পরও কেউ কেউ গ্রেপ্তারের পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। এতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাজের গতি থেমে যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডিআইজি বলেন, চট্টগ্রাম রেঞ্জে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পুরো ইয়াবা সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এ কাজে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি থাকলেও অভিযানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বাধা বা চাপ নেই।
তার মতে, একটি চক্র সরে গেলে অন্য চক্র সেই জায়গা দখল করে নেয়। তবে শুধু অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয়। বিভ্রান্তি এড়াতে এবং আইনি ভিত্তি শক্ত করতে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।