Image description

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে বলা হয় প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক। দলমত-নির্বিশেষে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে তার অবস্থান হওয়া উচিত নিরপেক্ষতার মানদণ্ডে সবার ঊর্ধ্বে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলীয় পরিচয়ের বাইরে এসে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক স্বার্থ রক্ষাই তার প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর নজির রয়েছে দলীয় শিক্ষক সংগঠনের পদ ছেড়ে দেওয়ার।

তবে এখন দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরও অনেকেই ছাড়ছেন না দলীয় পদ। কেউ রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে, কেউ দলপন্থী শিক্ষক সংগঠনের শীর্ষ পদে রয়েছেন। এমনকি দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি ও শিক্ষক সংগঠনের সভায়ও দেখা যাচ্ছে তাদের অংশ নিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, কুমিল্লা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে এমন চিত্র। তাদের কেউ কেউ  দলীয় পদে থাকার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমেও সম্পৃক্ত। 

শিক্ষাবিদদের মতে, আইনগতভাবে দলীয় পদ ছাড়ার বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে পদে না থাকাটাই উত্তম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এ (ইউট্যাব) পদত্যাগপত্র দিলেও তা এখনো গৃহীত হয়নি বলে জানা গেছে। সংগঠনটিতে তার জায়গায় কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক মো. মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত কমিটিতে তিনি সভাপতি হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এদিকে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সারিতে বসে থাকতে দেখা গেছে। এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আব্দুস সালাম বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। সংগঠনটির বিভিন্ন সভায়ও তাকে নিয়মিত অংশ নিতে দেখা যায়। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকেও দেখা গেছে সাদা দলের সভায় অংশ নিতে।

শুধু শিক্ষক সংগঠনের পদেই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন উপলক্ষে গঠিত জাতীয়তাবাদী ঐক্য পরিষদের কমিটিতেও রয়েছেন এই দুই উপ-উপাচার্য। বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত এই কমিটির আহ্বায়ক পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং সদস্য সচিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মো. মোর্শেদ হাসান খান। কমিটির সদস্য তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন অধ্যাপক আব্দুস সালাম ও অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। প্রথম সদস্য হিসেবে রয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে থাকা শিক্ষকদের দলীয় সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মোহাম্মদ আল-আমীন সংগঠনটির সভাপতি।

 

গত ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান। তিনি ইউট্যাবের সহসভাপতি। পাশাপাশি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালকও। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলেন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ইউট্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. শামছুল আলম জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহম্মদ নজরুল ইসলাম সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়টির বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক। পাশাপাশি তিনি ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. নওশের ওয়ান জিয়া পরিষদের ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন তিনি। গত জাতীয় নির্বাচনে দিনাজপুর-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নপত্রও কিনেছিলেন তিনি।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম ইউট্যাবের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দলীয় পদে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে আছি, সেটা বিএনপির পদ। আমি যখন উপাচার্যের চেয়ারে বসি, তখন আমি উপাচার্যই। তখন দলীয় পদ ম্যাটার করে না। এই পদের জন্য দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় না।’

অন্য দলমতের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর দলীয় পরিচয়ের প্রভাব পড়ে কি না— এ প্রশ্নে তিনি বলেছেন, ‘না, এটা কখনোই প্রভাব ফেলে না। আমি উপাচার্যের চেয়ারে বসলে তখন আমি সবার উপাচার্য। কে কোন দলমত, সেটা আমি দেখি না। উপাচার্যের দায়িত্বকে আমি ক্ষমতা নয়, আমানত মনে করি।’

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘পেশাজীবী সংগঠনের পদে থেকে কাজ করা যায়। এটা ওই ধরনের প্রভাব ফেলে না। রাষ্ট্রীয় বড় বড় পদে থেকেও অনেকেই দলের দায়িত্ব পালন করছেন। এটা বড় কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় না।’

কিন্তু এ মতের সঙ্গে আপত্তি রয়েছে শিক্ষাবিদদের। তাদের মতে, উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যরা শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রতিনিধি নন; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পক্ষের অভিভাবক। ফলে তাদের দলীয় পরিচয় ও সাংগঠনিক সক্রিয়তা অন্যদের মধ্যে পক্ষপাতের ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক তথা উপাচার্য কিংবা উপ-উপাচার্য যারা আছেন, তাদের কোনো দলীয় পদ থাকা উচিত নয়। অতীতে আমরা কাউকে পদে থাকতে দেখিনি। নিকট-অতীতের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান ও অধ্যাপক মাকসুদ কামালের কথা যদি বলি, তারা দলীয় পদে ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দলীয় সংগঠনগুলোর সভায়ও অংশ নিতেন না।’

তিনি আরও বললেন, ‘সাবেক উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক সীতেশ চন্দ্র বাছার দায়িত্ব নেওয়ার আগে নীল দলের আহ্বায়ক ছিলেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি সেই পদ ছেড়ে দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার অভিভাবক হিসেবে এটিই হওয়া উচিত— অন্যথায় প্রশ্ন থাকে।’

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘কাউকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। আমারও অধিকার আছে যেকোনো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার। তবে দলীয় রাজনীতি আর কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে সবার জন্য কাজ করা— এক বিষয় নয়।’

তার মতে, যিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকবেন, তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সবার অভিভাবক। সেখানে কোনো দলকে প্রাধান্য দেওয়া কিংবা দলীয় মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নয়। একজন উপাচার্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠানেরই অভিভাবক নন; তিনি হাজার হাজার শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদেরও আস্থার জায়গা। সেখানে কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান বললেন, ‘আইনগতভাবে এ বিষয়ে স্পষ্টতা নেই। তবে নৈতিকতার জায়গা থেকে অন্তত দায়িত্ব নেওয়ার পর দলীয় পদগুলোতে থাকা উচিত নয়। এতে অনেক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।’

তার মতে, সমস্যা হচ্ছে, তিনি উপাচার্য কিংবা উপ-উপাচার্য হচ্ছেন দলীয় পরিচয়েই। সে অবস্থান থেকে পদত্যাগ করাও সহজ নয়। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন হওয়া উচিত হলেও দুঃখজনকভাবে তা হয়নি।