Image description

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ রবিবার (১৮ অক্টোবর)। গত বছরের এই দিনে আগুনে পুড়ে যায় হাজার কোটি টাকার পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নথি। ঘটনার পর অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে ১৪ দফা সুপারিশ করা হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব সুপারিশের বেশির ভাগ বাস্তবায়নের পথে। নেওয়া হয়েছে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার, নিয়মিত টহল, প্রশিক্ষণ ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার উদ্যোগ। তবে আমদানিকারকদের দাবি, কার্গো ব্যবস্থাপনায় এখনও ঝুঁকি রয়েছে। নতুন কার্গো কমপ্লেক্সও পুরোপুরি চালু হয়নি।

গত বছরের ১৮ অক্টোবর দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটসংলগ্ন কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। বিজিবিও উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে অংশ নেয়। ওই দিন রাত ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হয়। তবে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে ১৯ অক্টোবর বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৭ ঘণ্টা ধরে চলে আগুন নেভানোর কাজ। এ ঘটনায় ২৫ জন আনসারসহ মোট ৩৫ জন আহত হন। পুড়ে যায় হাজার কোটি টাকার পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নথি।

 

ঘটনার পর বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি কার্গোসহ পুরো বিমানবন্দর এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে ১৪টি সুপারিশ করে। এসব সুপারিশের মধ্যে ছিল অস্থায়ী ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন, ফায়ার হাইড্রেন্ট ও স্প্রিংকলার ব্যবস্থা চালু, জরুরি সংকেত স্থাপন, ফায়ার বক্সসহ হোস পাইপ বসানো, অচল ফায়ার হাইড্রেন্ট মেরামত, স্থায়ী ফায়ার স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ এবং অগ্নিনিরাপত্তা অবকাঠামো ও জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো।

এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মাধ্যমে ফায়ার ক্রুদের প্রশিক্ষণ, ভূমি অধিগ্রহণের দলিল সংগ্রহ, বিমান বাহিনীর সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি আধুনিকায়ন এবং কেন্দ্রীয় ফুয়েল শেডের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশও করা হয়। জেনারেল এভিয়েশন হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সে ফায়ার হাইড্রেন্ট, স্প্রিংকলার ও ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপনের পাশাপাশি এমটিপুল, সেমসু ও সিএটিসির চারটি পয়েন্টে ফায়ার বক্সসহ হোস পাইপ বসানোর কথা বলা হয়। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাতটি অচল ফায়ার হাইড্রেন্ট মেরামত এবং ফায়ার সার্ভিসের অস্থায়ী স্টেশনের গাড়ি রাখার শেড নির্মাণের বিষয়ও ছিল সুপারিশে।

আমদানিকারকদের দাবি, ঝুঁকি রয়ে গেছে

শাহজালাল বিমানবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম ভূঁইয়া মিঠু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর আমদানিকারকদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এমনকি ওই ঘটনার পর এ বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তারপরও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমদানিকারকেরা পণ্য আমদানি করছেন।

তিনি বলেন, নতুন কার্গো কমপ্লেক্স এখনও চালু হয়নি। অত্যাধুনিক এই কমপ্লেক্স চালু হলে শেডের ভেতরে ও বাইরে মালামাল পড়ে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এভাবে মালামাল পড়ে থাকলে পণ্যের ক্ষতির পাশাপাশি অগ্নিঝুঁকিও থাকে।

শাহজালালে অগ্নিকাণ্ড ২০২৫ 1শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের অগ্নিকাণ্ড। ফাইল ছবি

অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে গত এক বছরে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন খায়রুল আলম। তিনি বলেন, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিজেদের দিক থেকে যেসব কাজ করেছে, সেগুলো হয়তো তাদের বিবেচনায় ঠিক আছে। তবে কার্গো ব্যবস্থাপনায় এখনও ঝুঁকি রয়েছে বলে তারা মনে করেন।

বিমান বলছে, উন্নতি হয়েছে

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক কার্গো (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাশিদুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পুরো এলাকা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলেও বেশ কিছু বিষয়ে উন্নতি হয়েছে। কয়েকটি গেট তৈরি করা হয়েছে। এসব গেট দিয়ে দ্রুত মালামাল খালাস করা যাচ্ছে। এ ছাড়া কার্গো কমপ্লেক্সের একটি অংশ ব্যবহার শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, অভিযোগ থাকতেই পারে। তবে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে নেওয়া ব্যবস্থাগুলো ভালো। সামনে এ বিষয়ে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এখন মালামাল খালাসে আগের মতো সময় লাগছে না। সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে মালামাল সরবরাহ করছেন।

সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতির দাবি

বেবিচকের সদস্য (প্ল্যানিং অ্যান্ড অপারেশনস) মেহবুব খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত বছরের অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছিল। ওই বৈঠকের প্রায় সব সুপারিশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে।

তিনি বলেন, কার্গো এলাকার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়গুলো দেখভাল করবে বিমান ও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। বেবিচক তাদের জায়গা লিজ দিয়েছে। তারা নিজেদের দুর্বলতা দূর না করলে দুর্ঘটনার দায়ও তাদের বহন করতে হবে।

বেবিচকের ফায়ার সেফটি বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ভয়াবহ ওই ঘটনার পর অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে ব্যাপক কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি অফিসের বৈদ্যুতিক তার ঢিলা আছে কিনা, শর্ট সার্কিট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না; এসব যাচাই করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ফায়ার সেফটি প্ল্যান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে জমা দেওয়া হয়েছে। ওই পরিকল্পনায় স্মোক ডিটেক্টর ও অ্যালার্মিং সিস্টেম রয়েছে। কোনো ধরনের ধোঁয়া শনাক্ত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বেজে উঠবে। এ ছাড়া প্রতিদিন ভোর, সকাল ও রাতে টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

বেবিচকের মুখপাত্র কাওছার মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর এলাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে বিভিন্ন অফিসে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি উদ্ধার মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে। এ ছাড়া টার্মিনাল ভবন এলাকায় কর্মরত ১ হাজার ৯০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে অগ্নিনিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ব্যবহার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

বিমানবন্দরের সার্বিক অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিনেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকে, যাতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা তদারকি, সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা যায়।