Image description

সবেমাত্র শেষ করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের পরীক্ষা। বুকভরা স্বপ্ন ছিল দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াবেন, উপভোগ করবেন মুক্ত বিহঙ্গের জীবন। জীবনের বাঁধাধরা ছক ভেঙে নতুন নতুন জায়গা দেখা আর অভিজ্ঞতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করাই ছিল তার ইচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে একটা মিউজিক ব্যান্ড গড়ার পরিকল্পনাও চলছিল। নাম তার নাফিজ তেহামি।

অন্যদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্রী কায়লা জাহান নাবিলার স্বপ্নটা ছিল একটু অন্যরকম। স্বপ্ন ছিল দেশের ওষুধ শিল্পে গবেষণা করে নতুন কিছু করে দেখাবেন। মাত্র কয়েক দিন আগেই এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নিজের গবেষণা উপস্থাপনের জন্য ‘সেরা পোস্টার’ পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। সামনেই ছিল চূড়ান্ত গবেষণার মূল্যায়ন আর এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি।

কিন্তু হুট করে আসা একটি আগুন এক নিমিষেই কেড়ে নিল এই দুটো সম্ভাবনাময় জীবন।

শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ায় পাটুয়ারটেক সৈকতের কাছে ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারান ২৬ বছর বয়সী তেহামি এবং ২৭ বছরের নাবিলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন তেহামি। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাদের সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন আরও আটজন।

অগ্নিকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তেহামির মা কাজল রেখা শোকে পাথর হয়ে বারবার কেঁদে কেঁদে বলছেন, ‘আমার যাইফকে ফিরিয়ে দাও।’ আদরের ছেলেকে তিনি এই নামেই ডাকতেন।

তেহামির বাবা জিয়াদুল কবির কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমাদের তো আর কেউ রইল না। এখন আমরা কাকে নিয়ে বাঁচব?’ আর মা কাজল রেখার প্রশ্ন, ‘আর বেঁচে থেকে কী হবে? কীভাবে দিন কাটাব আমি? আমার যে সব শেষ হয়ে গেল।’

দুর্গাপূজার ছুটিতে সমুদ্র দেখতে এসে একই পরিবারের ছয়জন সদস্য এই আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। স্বজনদের হারিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলো এখন দিশেহারা।

বন্ধুর কথা মনে করে মুনিম সাগর বললেন, ‘তেহামি কখনোই সাধারণ আর চারদেউলে বন্দিজীবন চাননি। সে বিশ্বটাকে কাছ থেকে দেখতে চাইত, নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে নিজের শর্তে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাইত।’

গানের প্রতি দুজনের ভালোবাসাই তাদের এক করে রেখেছিল। দুই বন্ধু মিলে ব্যান্ড গড়ার কথা ভাবলেও দুজনের পছন্দ আলাদা হওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি। সাগর ভালোবাসেন রক মিউজিক, আর তেহামির টান ছিল ডেথ মেটালের প্রতি। তবে পছন্দের এই মিল না থাকা কখনোই তাদের বন্ধুত্বে চিড় ধরাতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই একসাথে বেড়ে ওঠা, আড্ডা আর ভবিষ্যৎ জীবনের নানা পরিকল্পনা ভাগাভাগি করে নেওয়া ছিল তাদের প্রতিদিনের অভ্যাস।

স্কুল জীবন থেকেই তাদের পথচলা শুরু। বরগুনা ডিবেটিং কাউন্সিলের হয়ে বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ আর বিজ্ঞান মেলায় দুজন একসঙ্গে অংশ নিয়েছেন। সাগর পড়তেন বরগুনা জেলা স্কুলে, আর তেহামি ছিলেন আমতলী এ কে পাইলট স্কুলে।

 

পৃথিবী চষে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখা সেই তরুণের জীবন থমকে গেছে কক্সবাজারের এক রিসোর্টের আগুনে। যেসব অচেনা জায়গা দেখার বায়না ছিল মনে, তা আর কোনোদিন দেখা হবে না। আর বন্ধুর সঙ্গে মিলে গান গাওয়ার সেই ব্যান্ড দলটাও রয়ে গেল অধরা।

তেহামির মতো নাবিলাও অনেক কষ্ট করে নিজের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। নতুন কিছু জানা, গবেষণা করা আর দেশের জন্য ভালো কিছু করাই ছিল তার মূল ধ্যানজ্ঞান।

রসায়নের এই মেধাবী ছাত্রী গত দেড় বছর ধরে একমনে নিজের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি সেরা গবেষকের পুরস্কার পান।

চূড়ান্ত পরীক্ষা বা ডিফেন্সের আগে এই পুরস্কারটি যেন তার দীর্ঘদিনের কষ্টের এক সুন্দর প্রতিদান ছিল। স্নাতকোত্তরের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, আর ভাবছিলেন কীভাবে নিজের পেশাগত জীবন শুরু করবেন।

কিন্তু শনিবারের সেই ভয়াল আগুন এক নিমেষে সব ওলটপালট করে দিয়েছে।

নাবিলার সহপাঠী রবিউল কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, তারা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না যে নাবিলা আর তাদের মাঝে নেই।

মেয়ে নাবিলা আর মালিহাকে হারিয়ে মা রোকসানা আক্তার রীনা অঝোরে কেঁদে চলেছেন। বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘আমার নাবিলা আর মালিহা শেষ হয়ে গেল। ও আল্লাহ, তুমি আমাদেরও কেন নিয়ে যাচ্ছ না? আমাদেরও ওদের কাছে নিয়ে যাও!’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ আমিনুল হক নাবিলার মেধা আর নিষ্ঠার কথা বলতে গিয়ে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না।

তিনি বলেন, ‘নাবিলা আমাদের নিজের সন্তানের মতো ছিল। ভীষণ শান্ত, নম্র আর মেধাবী একটা মেয়ে। গত দেড় বছর ধরে ও রাত-দিন এক করে গবেষণা করছিল। মেয়েটা খুব খুশিতে ছিল। সামনেই ছিল ডিফেন্স, সুন্দর একটা ক্যারিয়ার গড়ার সব প্রস্তুতি ও নিচ্ছিল।’

নাবিলাকে উচ্চতর গবেষণার জন্য বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দ্রেয়ার কথা জানান অধ্যাপক আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘আমি নাবিলাকে বলতাম তুমি অনেক মেধাবী, উন্নত গবেষণার জন্য তোমার বিদেশে যাওয়া উচিত।’ কিন্তু নাবিলা সবসময় বলত, ‘স্যার, আমি তো দেশের জন্যই কাজ করতে চাই। দেশের ওষুধ খাতকে গবেষণায় আরও এগিয়ে নেওয়ার খুব ইচ্ছে আমার।’

বিভাগীয় প্রধান আফসোসের সুরে বললেন, ‘সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো মেয়েটার স্নাতকোত্তরের রেজাল্টটা আমরা এখনো প্রকাশ করতে পারলাম না। এখন কার নামে এই রেজাল্ট প্রকাশ করব? যে মেয়েটা সেদিনও পুরস্কার পেয়ে খুশিতে ভাসছিল আর রঙিন ভবিষ্যৎ সাজাচ্ছিল, সে আজ আমাদের মাঝে নেই।’

তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, নাবিলার যে মেধা আর কাজের প্রতি ভালোবাসা ছিল, তাতে সে বেঁচে থাকলে অনেক দূর যেতে পারত।

 

তেহামির কাছে ভবিষ্যতের অর্থ ছিল স্বাধীনভাবে বাঁচা, নতুন নতুন জায়গা ঘুরে দেখা আর মনের আনন্দে গান গাওয়া। আর নাবিলার কাছে ভবিষ্যৎ মানে ছিল নতুন কিছু আবিষ্কার করা আর দেশের চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ খাতে অবদান রাখা।

দুজনের স্বপ্নের পথ আলাদা হলেও, আগুনে সব শেষ হয়ে যাওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা নিজেদের স্বপ্নের পেছনেই ছুটছিলেন। আজ শুধু পড়ে আছে এই দুই উদীয়মান তরুণের স্মৃতি, যাদের জীবনের গল্পটা সুন্দর করে তৈরি হতে শুরু করেছিল মাত্র।