পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী-পুরুষকে হেনস্তা, মারধর ও প্রকাশ্যে অপদস্থ করার ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে চিহ্নিত করে আটকে রাখা হচ্ছে, করা হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদ, এমনকি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ভিডিও। অথচ পরে কোনো কোনো ঘটনায় সামনে আসছে ভিন্ন তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করছেন, তাঁরা স্বামী-স্ত্রী। ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ বা অভিযোগের ভিত্তিতে এভাবে কাউকে হেনস্তা করার অধিকার কারও আছে কি না, আর অভিযোগের আড়ালে প্রকৃত ঘটনা কতটা আড়ালে থেকে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নই সামনে আনছে ঘটনাগুলো।
গত ১১ অক্টোবর চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে একজন আলেম ও তাঁর শাশুড়িকে একটি কক্ষে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ভিডিও ধারণের ঘটনা ঘটে। ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাঁদের আটকে রাখার পর ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে কয়েকজন আনসার সদস্যকে ওই নারী ও যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা যায়। তাঁদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ঘটনা নিয়ে ব্যবহারকারীরা নানা মন্তব্য করেন। ওই আলেমের ছবি ছড়িয়ে হাস্যরস করতে দেখা যায় অনেককেই। বিশেষ করে ওই আলেমকে চরমোনাই কর্মী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন জামায়াতপন্থী আইডি থেকে প্রচার করা হয়। দেখুন এখানে এখানে এখানে
তবে ১৪ অক্টোবর হাটহাজারী থানা পুলিশের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক আনসার সদস্যের দাবি, অন্য এক ব্যক্তি নারী ও যুবককে সেখানে নিয়ে এসে ঘটনাটি অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি ভিডিও ধারণ করেন বলে জানান। পরে সন্ধ্যায় তাঁর ফোন থেকে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হয়ে যায় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও প্রকাশের কারণে ভুল তথ্য ছড়ানোয় তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। পুলিশের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ার খবর প্রকাশের পর ভিডিও ধারণ ও প্রচারে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে।
এর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পরকীয়া সন্দেহে স্বামী-স্ত্রীকে বেধড়ক মারধর, শ্লীলতাহানি এবং অশ্লীল ভিডিও ধারণের অভিযোগ উঠেছে একদল যুবকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চার দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর ভুক্তভোগী নারী নুরজাহান বেগম (৩৫) কলাপাড়া থানায় ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বালিয়াতলী ইউনিয়নের তুলাতলী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নুরজাহান বেগম তার দ্বিতীয় স্বামী শামিমকে (৪০) সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে তেগাছিয়া থেকে ডাক্তার দেখাতে চাপলী বাজারের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তুলাতলী এলাকায় পৌঁছলে ওই গ্রামের সাইফুল, বশির, স্বপন ও নুর আলমসহ ১০ যুবক তাদের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। পরে তাদের বেধড়ক মারধর করা হয়।
নুরজাহান অভিযোগে উল্লেখ করেন, হামলাকারীরা পাশের একটি বিলের মধ্যে নিয়ে ফের মারধর করে এবং তাকে শ্লীলতাহানি করে। এসময় তার স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেয় এবং মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে। তাদের ডাকচিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে কলাপাড়া হাসপাতালে ভর্তি করেন।
গত ১২ জুন ছুটিতে বাড়িতে আসা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য রায়হান ইসলাম তার স্ত্রীকে নিয়ে নীলফামারীর গোমনাতী ফরেস্ট এলাকায় ঘুরতে যান। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে রায়হান ইসলাম নিজেকে সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলেও তারা তা বিশ্বাস না করে তাকে ও তার স্ত্রীকে হেনস্তা এবং মারধর করা হয়।
গত ১৯ জুলাই, পাবনায় গভীর রাতে নিজেদের পিকআপ ভ্যান নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন স্বামী-স্ত্রী। পথে গাড়িটি বিকল হয়ে গেলে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে তা মেরামতের চেষ্টা করছিলেন তারা। এ সময় তাদের গরু চোর সন্দেহে আটক করে গণপিটুনি দেয় স্থানীয় লোকজন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই দম্পতিকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়।
চলতি বছরের ২৩ মার্চ একই রকম হেনস্তার শিকার হন দম্পতি কৌশিক আহমেদ ও নিশি রাণী দাস। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার হাওয়াই রোড বালুর মাঠে ঘুরতে গিয়েছিলেন তারা। সেখানে প্রেমিক প্রেমিকা সন্দেহে তাদেরকে হেনস্থা করে স্থানীয় কিছু ছেলে যাদেরকে কিশোর গ্যাং হিসেবে সাব্যস্ত করে পুলিশ। হেনস্থার পাশাপাশি তাদের মোবাইল ও বাইকের চাবি ছিনিয়ে নেয় তারা। এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম সামি-সহ, সাঈফ ও জাহিদ নামে ৩ জনকে আটক করেছে মাদারগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ।
হাটহাজারী, কলাপাড়া, জামালপুর, পাবনা ও নীলফামারীর এসব ঘটনায় প্রেম, পরকীয়া বা অপরাধের সন্দেহে নারী-পুরুষকে আটক, মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ সামনে এসেছে। কয়েকটি ঘটনায় ভুক্তভোগীদের ভিডিও ধারণ ও তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “যারা এগুলো করছে, তাদেরকে রাষ্ট্রিয় আইনের আওতায় ঠিক মতো আনা হচ্ছে না বলে তারা বারবার এসব করছে। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া কেউ কারো ডকুমেন্টসও দেখতে চাইতে পারে না। তিনি মনে করেন এ ধরনের কাজ সামাজিক কোনো ব্যাধি না, বরং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো নাগরিক অন্য নাগরিক এসব প্রশ্ন করতে যাওয়ার সাহসই পাবে না। কেউ যদি কোনো অথরিটি ছাড়া কাউকে এমন প্রশ্ন করতে যায়, তাকে তো অবশ্যই অন্যরা বাধা দিবে। তাহলে এই কাজ কে করবে? অবশ্যই রাজনৈতিক ব্যাকাপ আছে, সেই করবে।”