Image description

গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকটে দেশের শিল্প খাত যে অচলাবস্থায় পড়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির জ্বালানি সরবরাহ ও অভ্যন্তরীণ কিছু সমন্বয়ে তা কিছুটা হলেও কমেছে। তবে বড় ধরনের এই সংকট পুরোপুরি কেটেছে বলা যাবে না। বরং নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং আধুনিক লজিস্টিকস সুবিধার দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা না থাকায় দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ এখনো বড় অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে।

বিনিয়োগকারীদের মতে, টেকসই শিল্প গড়তে পর্যাপ্ত জ্বালানি ও দক্ষ লজিস্টিকস সাপোর্টই মূল চালিকাশক্তি। অথচ নীতিনির্ধারকরা বারবার সেই অবকাঠামোগত মূল কাঠামোর দিকে দীর্ঘমেয়াদি নজর কম দিয়ে ‘জমি বিতরণ’ ও ‘প্লট হস্তান্তর’ নীতিকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছেন। সাম্প্রতিক সময়েও বন্ধ ও লোকসানি ৪৪টি সরকারি কারখানার হাজার হাজার একর জমি ছাড়ার প্রক্রিয়া কিংবা বিসিকের নতুন প্লট বরাদ্দের যে তোড়জোড়, তা মূলত জমির দিকেই অতিনির্ভরতার পুরনো প্রশাসনিক কৌশলের পুনরাবৃত্তি।

চলতি জ্বালানি সংকট পুরোপুরি না কাটার কারণে বিদ্যমান চালু কারখানাগুলোয় এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালানো যাচ্ছে না। ফলে মূল অগ্রাধিকার যেখানে হওয়া উচিত ছিল— সস্তা ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পণ্য পরিবহনে বিশ্বমানের লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলা, সেখানে বারবার জমি বণ্টন ও অবকাঠামোগত ঘোষণা দিয়েই বিনিয়োগ আকৃষ্টের প্রচেষ্টা সরকারের।

বিজিএমইএ ও শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কাছে শিল্পনগরে বড় আকারের প্লট বরাদ্দ এবং বিজেএমসির অধীনে বন্ধ থাকা ডেমরার লতিফ বাওয়ানী বা চট্টগ্রামের কেএফডি জুট মিলের মতো বিশাল পরিসরের কারখানাগুলো দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একইভাবে মুন্সীগঞ্জের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পার্ক, বিসিক কেমিক্যাল শিল্পনগরী এবং সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শত শত প্লট। তবে প্রশ্ন হলো— গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও আধুনিক লজিস্টিকস অবকাঠামোর টেকসই সমাধান নিশ্চিত না করে শুধু এভাবে একের পর এক জমি ও লিজ চুক্তি দিয়ে যাওয়ার এই প্রশাসনিক ঝোঁক শেষ পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগকে গতিশীল করবে, নাকি আবারও কাগুজে প্লট আর খেলাপি ঋণের বোঝাই বাড়াবে?

তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও এফবিসিসিআইর প্রশাসক ফজলুল হক মনে করেন, বিনিয়োগের প্রক্রিয়াগুলো সমান্তরালভাবে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তার মতে, জমি বা বিসিকের প্লট বরাদ্দ পেয়ে অবকাঠামো দাঁড় করাতেই অন্তত কয়েক মাস থেকে বছর কেটে যায়। তাই সরকারের উচিত হবে জ্বালানি সংকটের টেকসই রোডম্যাপের সঙ্গে জমি ও অন্যান্য লজিস্টিকস প্রক্রিয়াগুলো সমন্বিতভাবে চালানো। তবে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা না মিললে জমি হস্তান্তরের কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত কার্যকর সুফল আনবে না।

জ্বালানি ও লজিস্টিকস সংকটের টেকসই সমাধান ছাড়া শুধু প্লট বরাদ্দ দিয়ে প্রকৃত বিনিয়োগ টানা সম্ভব নয় বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বললেন, নীতিগতভাবে অকার্যকর সরকারি জমি কাজে লাগানো যুক্তিসংগত। তবে নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ এবং বন্দরের মতো লজিস্টিকস সুবিধা না দিয়ে নতুন প্লট তৈরি করলে সেগুলো আবারও পতিত হিসেবেই আটকে থাকবে। তাই জমি হস্তান্তরের আগে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ-গ্যাস পরিকল্পনা এবং বিশ্বমানের লজিস্টিকসের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা জরুরি।

ইতিহাস বলছে, জ্বালানি ও লজিস্টিকসকে উপেক্ষা করে শুধু জমি ও সুবিশাল অবকাঠামোনির্ভর কৌশলের খেসারত আগেও গুনতে হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় সিটি গ্রুপের ‘হোসেন্দি অর্থনৈতিক অঞ্চল’-এর কথা উল্লেখ করা যায়। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল এলাকায় ছয়টি শিল্প ইউনিট করা হলেও সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় এই সুবৃহৎ বিনিয়োগ দীর্ঘদিন উৎপাদনহীনভাবে আটকে থাকে, যা প্রায় ২৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ে। সিটি গ্রুপের এই সংকট প্রমাণ করে, সঠিক সময়ে জ্বালানির জোগান না থাকলে সুবিশাল শিল্প প্লটও শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় লোকসানি সম্পদে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিসিক নগরীগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে জমির অগ্রাধিকার বেশি থাকলেও ছিল না জ্বালানি ও উন্নত লজিস্টিকসের যোগসূত্র। বিসিকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে ১৮টি এস্টেট ও পার্কে ১ হাজার ৬৬৫টি প্লট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও তার বড় অংশই গত বছরের অলস পড়ে থাকা প্লট। শ্রীমঙ্গলের মতো স্থানে প্লট থাকার পরও প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য নিশ্চয়তা না পাওয়ায় বছরের পর বছর ধরে উদ্যোক্তারা কারখানা চালু করতে পারেননি।

 

চলমান সংকট হয়তো আগের চেয়ে সাময়িক কিছুটা শিথিল হয়েছে, কিন্তু সার্বিক অবকাঠামো না বদলালে শিল্প রক্ষা কঠিন। পেট্রোবাংলার টেবিলে এখনো ঝুলে আছে প্রায় দুই হাজার শিল্পে গ্যাস সংযোগের আবেদন। সরকার ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারেই নতুন এলএনজি টার্মিনাল, পাইপলাইন এবং নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান সম্পন্ন করে দেশে পুরোপুরি স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লেগে যাবে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান মনে করেন, সংকট নিরসনে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। শুধু জমি সহজলভ্য করাই যথেষ্ট নয়; সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, নিয়ন্ত্রক সংস্কার এবং দক্ষ ও আধুনিক বন্দরের মতো লজিস্টিকস অবকাঠামোর উন্নয়ন সমান্তরালে নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের মতে, জ্বালানি না দিয়ে শুধু জমি বা অবকাঠামো দিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব নয়। সম্প্রতি এক সেমিনারে তিনি বললেন, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে মনোনিবেশের আগে বিদ্যমান কারখানাগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন সেবা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। স্থায়ী, সাশ্রয়ী দাম এবং নির্ভরযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।

সব মিলিয়ে উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকদের বার্তা স্পষ্ট—বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হলে জমি বিতরণের পুরনো মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। জমির চেয়ে এখন নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং দ্রুত ও উন্নত লজিস্টিকস সুবিধাই হতে হবে সরকারের মূল অগ্রাধিকার।