সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। রোববার রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে তাঁদের আটক করা হয়।
আটকরা হলেন লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরা (৪৩) ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষ বড়ুয়া (৪৭)। পরে তাদের ঢাকার মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এরপর সোমবার বিকেলে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) শেখ বশির আহমেদ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম শুনানি শেষে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন জানান, ডিবির এক পরিদর্শক বাদী হয়ে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত রোববার গভীররাতে রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে কাজী গুলশান ও দেবাশীষকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের পল্লবী জোনাল টিমের সদস্যরা এই অভিযান চালান।
এজাহারে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সরকারবিরোধী প্রচার, তহবিল সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ‘ইউনিটি কেয়ার পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পলাতক শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ‘কালআজকাল ডটকম’ নামে একটি পেজের মাধ্যমে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কনটেন্ট তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছিল। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেও রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রচারের অভিযোগ রয়েছে গ্রেপ্তার দুজনের বিরুদ্ধে।
পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে অবৈধ অর্থায়ন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর বিভিন্ন ধারায় অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তারা সহযোগীদের নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
কাজী গুলশান আরার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্যে একাত্মতা ও আনুগত্য প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ নামের একটি কমিটি গঠন এবং ওই সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে এজাহারে।
গতবছর ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গোপন বৈঠক ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা হয়েছিল। সেই বৈঠকের সঙ্গেও গ্রেপ্তার সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র। গত বছরের জুলাই মাসের ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সেনাবাহিনীর মেজর সাদিকুল হককে চাকরিচ্যুত করে আইনের আওতায় আনা হয়। বর্তমানে তিনি কারাবন্দী।
বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে গ্রেপ্তার সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার পক্ষের বা তাদের পরিবারের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
অবৈধ অর্থায়ন
গতকাল এক বিবৃতিতে ডিএমপি জানিয়েছে, কাজী গুলশান আরা ও দেবাশীষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকা।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক ও সাজাপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিলেন। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছিলেন। এই অপতৎপরতার অংশ হিসেবে, গত দুই বছরের বেশি তারা সহযোগীদের সঙ্গে মিলে সামাজিক মাধ্যমসহ ইন্টারনেটে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নানা সরকারবিরোধী প্রচার, উস্কানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করছিলেন।
এসব কাজে জড়িত থাকার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনায় অবৈধভাবে অর্থায়ন করার অভিযোগ রয়েছে কাজী গুলশান ও দেবাশীষের বিরুদ্ধে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা হোয়াটসঅ্যাপে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টারস আলফা নাম্বার ওয়ান’– এর মতো গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির পক্ষে অর্থ সংগ্রহ করে আসছিলেন।
নাশকতার পরিকল্পনা
দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার মাধ্যমে তারেক রহমানের সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা নানান ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানান, গ্রেপ্তার সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা বাংলাদেশে নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন। আসন্ন দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বিভিন্ন স্থানে নাশকতার পরিকল্পনা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভী বলেন, ‘এই জিনিসটা মাথায় রাখতে হবে, সামনে দুর্গাপূজা...পরাজিত শক্তি এবং তাদের যারা মদদ দিচ্ছে, তারা নানাভাবে এটাকে ম্লান করার জন্য, সরকারের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করার জন্য তারা চেষ্টা করবে।’ রোববার রাতে সাবেক যে দুই সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারাও নাশকতার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা। তিনি বলেন, ‘চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র কিন্তু থেমে নেই। গতকাল (রোববার) অবসরপ্রাপ্ত দুজন সামরিক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কারণ, নানা নাশকতার পরিকল্পনা হচ্ছিল।’
কারা এই গুলশান আরা ও দেবাশীষ
গ্রেপ্তারের পর কাজী গুলশান আরা ও দেবাশীষের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। যদিও তাদের বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাজী গুলশান ও দেবাশীষ বেশ আগেই সেনাবাহিনী থেকে অবসরে গেছেন। এর মধ্যে লেফটেন্যান্ট পদে থাকাকালে গুলশান আরা ২০০৭ সালে অবসর নেন। এরপর তিনি ঢাকার বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একপর্যায়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে ব্যবসাও করেন তিনি।
অন্যদিকে, লন্ডনপ্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেসবুক লিখেছেন, গতকাল (রোববার) মধ্যরাতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দীর্ঘ নজরদারির পর একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা এই অভিযান পরিচালনা করে।
তিনি লেখেন, গ্রেপ্তার লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষকে ২০২২ সালে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সবচেয়ে আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন। আজিজের সরাসরি হস্তক্ষেপে নোটশিটের মাধ্যমে তিনি পদোন্নতি পান। আজিজই তাকে ডিজিএফআই ও আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের মতো স্পর্শকাতর সংস্থায় নিজের হয়ে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেন। আজিজের হয়ে বিজিবিতে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের একটি চক্র পরিচালনা করতেন দেবাশীষ ও তার বাবা দয়াল চন্দ্র পাল।