বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছিলেন নিরঞ্জন রায়। স্বপ্ন ছিল সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করবেন, বদলাবে নিজের ও পরিবারের জীবন। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে নিয়োগের গেজেটে নাম না আসায় সেই স্বপ্নে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষায় সুপারিশপ্রাপ্ত এই প্রার্থীর। প্রথম দফায় বাদ পড়া ৪৬ জনের মধ্যে ৪০ জনকে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হলেও সেখানে আসেনি তার নাম। কেন বাদ পড়েছেন, সেই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তরও পাননি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক মেধাবী শিক্ষার্থী এই নিরঞ্জন। মাদারীপুর জেলার একজন দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। এসএসসি পরীক্ষার সময় মাকে হারানোর পরও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন বলে জানান তিনি।
নিরঞ্জন রায়ের দাবি, তিনি কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে বা অন্য কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলাও নেই। এছাড়াও নিজ এলাকায় এবং ক্যাম্পাসেও রয়েছে সুনাম। তিনি বিএনপি সমর্থনকারী পরিবারের সন্তান। অথচ তাকে কেন ৪৯ তম (বিশেষ) বিসিএস নিয়োগের গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি, এমনকি তার সাথে কথাও বলেনি। এভাবে যদি অনুমাননির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে এবং অজানা কারনে আমাকে গেজেট বঞ্চিত করা হয়, তাহলে ন্যায় বিচার কোথায় পাবো ? বাদ পরার কারণ আমাকে জানাতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে ।
তিনি আরও বলেন, ‘তৎকালীন আওয়ামী সরকারের আমলে বিএনপি পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে আমি তিনবার সাব-ইনস্পেক্টর (নিরস্ত্র) পদের ভাইভা দিয়েও ভেরিফিকেশন থেকে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। গ্রামের ঠিকানায় যখন পুলিশ ভেরিফিকেশন আসতো, বিএনপি করার কারণে আর সুপারিশপ্রাপ্ত হইতাম না। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসেও অজানা কোনো ভুল তথ্যের কারণে আমাকে বাদ পড়তে হলো যা খুবই দুঃখজনক ও বৈষম্যমূলক।’
বাদ পড়া এই প্রার্থী বলেন, তার বড় ভাই কৃষ্ণ রায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কর্মী। ২০১২ সালে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে হামলার শিকার হয়ে কারা বরণ করার কথাও জানান নিরঞ্জন।
নিরঞ্জন রায়ের দেওয়া তথ্যমতে, তার আরও একটি সরকারি চাকুরি হয়েছিল, বিসিএসে যোগ দেওয়ার প্রত্যাশায় সেখানে যোগ দেননি। এ ছাড়া কয়েকটি সরকারি চাকুরির মৌখিক পরীক্ষাতেও অংশ নেননি।
এ অবস্থায় সরকারের কাছে নিজের বাদ পড়ার কারণ যাচাই এবং পুনঃমূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন নিরঞ্জন রায়। তিনি বলেন, ‘যে কারণেই বাদ দেওয়া হোক না কেন, কোনো তদন্ত ও প্রমাণনির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে সেটি পুনরায় যাচাই করা হোক। আমার ন্যায্য অধিকার আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক এবং অতি দ্রুত গেজেটে আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৪৯তম বিসিএস বিশেষ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলে ৬৬৮ জনকে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সাময়িকভাবে সুপারিশ করেছিল। ৬৮৩টি শূন্য পদের বিপরীতে এ সুপারিশ করা হয়। পরে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেটে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে সুপারিশপ্রাপ্ত ৫৭ জনের নাম না থাকায় প্রশ্ন ওঠে নিয়োগপ্রক্রিয়ার যাচাই-বাছাই নিয়ে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, যাচাই-বাছাই ও পুলিশ ভেরিফিকেশন সাপেক্ষে বাদ পড়া প্রার্থীদের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পরে ৫ অক্টোবর রাতে আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে দ্বিতীয় দফায় প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ফলে প্রথম দফায় বাদ পড়া ৪৬ জনের মধ্যে ৪০ জনের নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হলেও বাকি ছয়জন নিয়োগবঞ্চিতই থাকেন।