Image description

পরকীয়ার অভিযোগ তুলে ফরিদপুরের সদরপুরে এক সৌদিপ্রবাসীর স্ত্রীকে আটকে রেখে মারধর, গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন এবং জোর করে মাথার চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুই যুবকের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের দৃশ্যের দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আটকের জন্য অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। তবে ঘটনার পেছনের কারণ, নির্যাতনে কারা কারা জড়িত এবং ওই নারী ও তার কথিত প্রেমিককে কী পরিস্থিতিতে আটকে রাখা হয়েছিল, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

টিভি সরঞ্জাম বাছুন

 

গতকাল রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ব্যাপারীডাঙ্গী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নির্যাতনের শিকার নারী ওই গ্রামের এক সৌদিপ্রবাসীর স্ত্রী। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. জলিল মোল্যা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারীকে চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কালো টি-শার্ট পরা এক যুবক তার হাত ধরে রেখেছেন। চেক টি-শার্ট পরা আরেক যুবক কাঁচি দিয়ে তার মাথার চুল কাটছেন। এ সময় নারীটি চিৎকার করে প্রতিবাদ করলেও চুল কাটা বন্ধ করা হয়নি। ভিডিওর শেষ দিকে দুই যুবককে তার মুখে থাপ্পড় মারতে দেখা যায়।

আরেকটি ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে ওই নারী ও তার কথিত প্রেমিককে রাতে একটি গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে মারধর করতে দেখা যায়। দুটি ভিডিওতে নির্যাতনের যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ভিডিওগুলোর সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং নির্যাতনের সব পর্যায়ের সত্যতা তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

নতুন ভাষা শিখুন

 

স্থানীয় সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত দুই যুবক হলেন প্রতিবেশী ইউসুফ ব্যাপারীর নাতি সুমন হোসেন ও জয় হোসেন। তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের অভিযান শুরুর কথা জানা গেলেও তাদের আটক করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) ওই নারী বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন। ওই দিন দিবাগত রাতে তার কক্ষ থেকে এক যুবককে বের হতে দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে আটক করেন বলে স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য। এরপর ওই নারী ও যুবককে আটকে রাখা হয়। পরদিন বিকেলে ওই নারীর চুল কেটে তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে যুবকটিকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

ঘটনাটির বিষয়ে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন শাহ বলেন, ‘ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের একাধিক দল জড়িত ব্যক্তিদের আটকে অভিযান শুরু করেছে। কেউ অপরাধ করলে তার জন্য আইন রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনোই কাম্য নয়। এটি আইনবিরোধী কাজ।’

পরকীয়ার অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের আগেই কাউকে আটকে রেখে মারধর করা, গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন কিংবা জোর করে চুল কেটে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় সমাধান চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

এ ধরনের ঘটনা দেশে নতুন নয়। সাম্প্রতিক অতীতেও চুরির অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধ কিংবা কথিত অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে নারী ও পুরুষকে আটকে রেখে নির্যাতন এবং চুল কেটে দেওয়ার একাধিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

গত ১৩ জুন শরীয়তপুরে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে মাদক বিক্রির অভিযোগ তুলে মারধর, মাথার চুল কেটে দেওয়া, মুখে আলকাতরা মাখানো এবং বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বেঁধে রাখার অভিযোগ প্রকাশ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এ ঘটনায় পুলিশ তদন্তের কথা জানিয়েছিল। ঘটনাটি দেখায়, অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে প্রকাশ্যে অপমান ও নির্যাতনের প্রবণতা এখনো উদ্বেগজনক।

এর আগে ২ মার্চ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ডহরগাঁও এলাকায় চুরির অভিযোগে তিন নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর এবং তাদের চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ তাদের নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়। পুলিশের বক্তব্য ছিল, চুরির অভিযোগ থাকলেও কাউকে বেঁধে মারধর করা বা জোর করে চুল কেটে দেওয়া আইনসম্মত নয়।

টিভি সরঞ্জাম বাছুন

 

চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক নারীকে ধর্ষণ, গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন এবং চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছিল। ওই ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগের ধরন ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও এসব ঘটনায় ব্যক্তির নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় আইন প্রয়োগের গুরুত্ব সামনে আসে।

২০২৫ সালের ১০ জুন কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মাংস চুরির অভিযোগে রিনা খাতুন নামের এক নারীকে গাছে বেঁধে মারধর ও মাথার চুল কেটে দেওয়ার খবর প্রকাশ করে এনটিভি অনলাইন ও জাগোনিউজ২৪ ডটকম। এ ঘটনায় তার বাড়িতে ভাঙচুর ও সম্পদ লুটপাটের অভিযোগও উঠেছিল। একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রচলিত জীবনধারার বাইরে থাকা মানুষের চুল জোর করে কেটে দেওয়ার ঘটনাকে অমানবিক, বেআইনি এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

সদরপুরের ঘটনাটি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ভিত্তিতে জনমত তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ভিডিও দেখে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা ভুক্তভোগী নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করা উচিত নয়। নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে গিয়ে এ ঘটনার নির্দিষ্ট মন্তব্য বা ব্যবহারকারীদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে কোনো মন্তব্যকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা জনসমষ্টির প্রতিক্রিয়া হিসেবে উদ্ধৃত করা হচ্ছে না।

নতুন ভাষা শিখুন

 

সদরপুরের ঘটনায় এখন কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—নির্যাতনের শিকার নারী নিরাপদে আছেন কি না, তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কী পরিস্থিতি, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কোথায় এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কারা জড়িত ছিলেন, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

পরকীয়ার অভিযোগ থাকুক বা অন্য কোনো বিরোধ, কাউকে গাছে বেঁধে মারধর, জোর করে চুল কেটে দেওয়া কিংবা অপমান করে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের বিচার করার দায়িত্ব আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। সদরপুরের ঘটনায় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি।