দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ছে না। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগের তিন মাসের তুলনায় ২২.৪৪ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে দেশের বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। গত জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলার।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সংকট দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এ সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকানোর পাশাপাশি ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরে। রেমিট্যান্স প্রবাহেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় রিজার্ভ ও ডলারের বাজারে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে গতি ফেরেনি। বরং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে সংশয় বাড়ছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন। বাজারে চাহিদা কমছে। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো প্রধানত তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে শুল্ক নিয়ে বিরোধ ও বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চীন থেকে বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা থাকলেও বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের চড়া সুদহার এবং জ্বালানি সংকট উদ্যোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানার চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
কমেছে নিট বিদেশি বিনিয়োগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। এর আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এসেছিল ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। সেই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে নিট এফডিআই কমেছে ২২.৪৪ শতাংশ।
তবে গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় বিনিয়োগ বেড়েছে ১২.৭৮ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিল-জুনে নিট ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) এসেছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। গত জুন শেষে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২১.৪২ বিলিয়ন ডলার।
নিট এফডিআইয়ের হিসাব করা হয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন মূলধন, আগের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণের ভিত্তিতে। এ হিসাব থেকে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি প্রত্যাহার ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ পরিশোধের মতো অর্থপ্রবাহ বাদ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন মূলধনী বিনিয়োগ বা ইকুইটি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। আগের প্রান্তিকের তুলনায় তা ১.০৭ শতাংশ কম।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৪.৭৭ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিল-জুনে এ খাতে বিনিয়োগ এসেছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার।
এদিকে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পুনর্বিনিয়োগ আয় থেকে এসেছে ২৬ কোটি ডলার। আগের প্রান্তিকের তুলনায় তা ২৩.৯২ শতাংশ কম। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বেশি। গত বছরের এপ্রিল-জুনে পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি কমেছে আন্তঃকোম্পানি ঋণের মাধ্যমে আসা বিনিয়োগ। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ খাতে বিনিয়োগ কমেছে ৬৭ শতাংশ। আর গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৮৫.১৭ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার সমস্যা রয়ে গেছে। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট বেড়েছে এবং ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্যবসার পরিবেশের উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের বদলে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা আরো কমছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগের পথে বিদ্যমান বাধাগুলোও দূর করতে হবে। হঠাৎ প্রজ্ঞাপন বা সার্কুলারের মাধ্যমে নীতি পরিবর্তন করা হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়। দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে না ফিরলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আস্থা ফিরে পাবেন না।
তিনি বলেন, দেশে নিট এফডিআই কমে যাওয়ার পেছনে বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা পরিচালনা এবং প্রয়োজনে বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও দৃশ্যমান উন্নতি প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে অবকাঠামো ও সেবার মান বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ঢাকার বিমানবন্দরে ট্রলির সংকট ও লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় লাগার মতো সমস্যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শুরুতেই নেতিবাচক অভিজ্ঞতা দেয়।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো এবং চুক্তি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বাধা দূর করা গেলে বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে।
বাড়ছে বিদেশি ঋণ
নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমলেও বেড়েছে দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মোট বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার। এর আগের মার্চ শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১১০.৯৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৪.০৫ বিলিয়ন ডলার।
বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণের বড় অংশ সরকারি খাতের। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে প্রতিবছর এ উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ ও ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সরকারি খাতের বিদেশি ঋণ বেড়েছে। মার্চ শেষে এ খাতের ঋণস্থিতি ছিল ৯০.৯১ বিলিয়ন ডলার। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫.১০ বিলিয়ন ডলার। তিন মাসে সরকারি খাতের বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৪.১৯ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, একই সময়ে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ কমেছে। মার্চ শেষে এ খাতের ঋণস্থিতি ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার। জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯.৮৭ বিলিয়ন ডলারে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বৈশ্বিক সুদহার বেশি থাকা, টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ দ্রুত পরিশোধ করছে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতাও কমাচ্ছে তারা। এ কারণে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের স্থিতি কমেছে।