Image description

স্বাস্থ্য খাতের বড় উন্নয়নকাজ মানেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ— এ যেন স্থায়ী সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় এসব অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। তবে এবার একটি কাজের প্রস্তাব দেখেই রীতিমতো ‘চোখ ছানাবড়া’ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের। তাদের মত, এটি একটি দুর্নীতির ছক— যা বেশ সূক্ষ্মভাবে সাজানো হয়েছে। কারণ প্রায় ৩ হাজার কোটি ব্যয়ের এ কাজে ৮৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা রাখা হয়েছে পরামর্শক, প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের জন্য, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু তা-ই নয়, বিল্ডিং ও অবকাঠামো খাতে ৩০৯ কোটি, ভ্রমণ ব্যয় ১২০ কোটি, গাড়িভাড়া বাবদ ৪০ কোটি টাকাসহ বিভিন্ন ব্যয়ের প্রস্তাবও অতিমাত্রায় বেশি। এসব দেখে বেশ শক্ত অবস্থান নিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা। তাই প্রতিটি খরচই যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার সুপারিশ দিয়ে প্রস্তাবটি ফেরত দেওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। এমন ঘটনা ঘটেছে ‘স্ট্রেংদেনিং হেলথ ইমার্জেন্সি প্রিভেনশন, প্রিপার্ডনেস, রেসপন্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স উইথ হেলথ অ্যাপ্রোচ’ শিরোনামে একটি প্রকল্প প্রস্তাবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রকল্পটির প্রস্তাবের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, স্পষ্টত দুর্নীতির সুন্দর আয়োজন সাজানো হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। আমাদের দেশে প্রশিক্ষিত, দক্ষ মানুষ ও চিকিৎসকের অভাব নেই। তাদের বাইরে এত বেশি পরামর্শকের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সেই সঙ্গে বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে, বাস্তবে তেমন আছে বলে মনে করি না। এক্ষেত্রে প্রতিটি খাতের খরচ পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করে তারপরই প্রকল্প নেওয়া দরকার। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সম্ভবত আগে খরচ ধরেছে, পরে ইউনিটভিত্তিক হেড কস্ট ধরতে চেয়েছে; কিন্তু এটি ঠিক নয়। কেননা এতে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। নিয়ম হলো, আগে ইউনিটভিত্তিক হেড বের করে ব্যয় নির্ধারণ করা— যোগ করলেন সাবেক এই আমলা।

গত ৭ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে পরামর্শক ব্যয় নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলছিলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পরামর্শক খরচ কমাতে হবে। এক্ষেত্রে নিজস্ব দক্ষ কর্মীদের কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

পরিকল্পনা কমিশন জানাচ্ছে, প্রকল্পটির ২ হাজার ৯৯২ কোটি ৯২ লাখ টাকার মধ্যে সরকারি তহবিলের ২৪৭ কোটি ৯২ লাখ ৮৩ হাজার এবং বৈদেশিক ঋণ রয়েছে ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। এর আওতায় একটি সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে মহামারী প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর কথা। প্রক্রিয়াকরণ শেষে প্রস্তাবটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। প্রস্তাবটি নিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভায় প্রস্তাবিত বিভিন্ন ব্যয় নিয়ে তোপের মুখে পড়েন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

সভা সূত্রে জানা গেছে,  প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন ক্ষেত্রে  মোট পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১১ শতাংশ। এ ছাড়া  দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে চাওয়া হয়েছে ৩৯৭ কোটি ৫ লাখ টাকা (১৩ শতাংশ)। সেমিনার বা ওয়ার্কশপ খাতে ধরা হয়েছে ১২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা (৪ দশমিক ২ শতাংশ)। আদার বিল্ডিং অ্যান্ড স্ট্রাকচার খাতে ধরা হয়েছে ৩০৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা (১০ শতাংশ)।  এসব খাতের মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে অন হেলথ অ্যাপ্রোচের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কী কাজে আসবে, তা নিয়ে পিইসি সভায় প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। সেখানে বলা হয়েছে, এসব ব্যয় দিয়ে দৃশ্যমান কী উপকার হবে, তা প্রকল্প প্রস্তাবে সুস্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সভা থেকে বলা হয়েছে, যৌক্তিক পর্যায়ে ব্যয় নির্ধারণ করা দরকার। সেই সঙ্গে প্রয়োজনবোধে কার্যক্রমভিত্তিক নির্দেশকের মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিইসি সভার আগে গত ১২ মে পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রস্তাবিত প্রকল্পের কয়েকটি বিষয় সুস্পষ্ট করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে গত ১৩ জুলাই খাতগুলোর অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে যৌক্তিকতার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও সন্তুষ্ট হয়নি কমিশন। পরামর্শক, প্রশিক্ষণ, সেমিনার বা ওয়ার্কশপ, ভ্রমণ এবং আদার বিল্ডিং অ্যান্ড স্ট্রাকচার খাতের ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। এসব খাতের অতিরিক্ত ব্যয় বাদ দিয়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য দৃশ্যমান খাতে ব্যয় বাড়ানো যেতে পারে বলে পিইসি সভায় মতামত দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধান (স্বাস্থ্য) মানস মিত্র আগামীর সময়কে বলেছেন, পিইসি সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কার্যবিবরণী তৈরির কাজ চলছে। এটি হয়ে গেলে প্রকল্প প্রস্তাবটি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ফেরত পাঠানো হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, প্রকল্পটিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। যেরকম প্রস্তাব করা হয়েছে, সেরকম আর থাকবে না। এমনকি অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগও থাকবে না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রকল্প তৈরির দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রকল্পে দেখা যাচ্ছে, বড় অঙ্কের ঋণ আছে বিশ্বব্যাংকের। এক্ষেত্রে ঋণের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় বিশ্বব্যাংকও নানা অনিয়মের সুযোগ করে দেয়। এখানে আমাদের দেশের আমলারা এবং বিশ্বব্যাংকের আমলারা মিলে যোগসাজশে সুবিধা ভাগাভাগির চেষ্টা করেছেন। এতে দুর্নীতি করার মাধ্যমে জনগণের অর্থের অপচয় হয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

পিইসি সভায় আরও যেসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ের কাছে

 

প্রকল্পটির প্রভাব দেশব্যাপী হলেও এটি মূলত ১০০ উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হবে। এই ১০০ উপজেলা কীভাবে চিহ্নিত করা হলো এবং এলাকাভিত্তিক বরাদ্দ চূড়ান্ত করার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে। প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদন কোন সংস্থার মাধ্যমে করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পের যথার্থতা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে অথবা তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা জরুরি। অতীতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নয়ন সহযোগীর ঋণের মাধ্যমে এ ধরনের প্রকল্প নিয়েছে কি না— তার তথ্য থাকা প্রয়োজন। জনবল প্রস্তাবে অর্থ বিভাগের সম্মতির বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া যানবাহন বা পরিবহন সেবা ক্রয় বিষয়ে অর্থ বিভাগের  জনবলবিষয়ক কমিটির সুপারিশ সংযোজন করা হয়নি।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, এরকম প্রস্তাব এলে কেন বিদেশ সফর দরকার, কারা যাবেন, সেই প্রশিক্ষণ নিয়ে কী কাজে লাগবে। এভাবে প্রতিটি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন করা উচিত। যতক্ষণ যৌক্তিক উত্তর না মিলবে, ততদিন প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। এভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে একধরনের শাস্তি নিশ্চিত হবে। কেননা প্রস্তাব দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে শাস্তির কোনো আইন নেই। তাই পরিকল্পনা কমিশনের উচিত কঠোর অবস্থান নেওয়া। তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রস্তাব করবে না।