চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছর পরিচালনা করবে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড। দুই পক্ষের সম্মতি সাপেক্ষে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ আছে চুক্তিতে। এখন বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনাল দিয়ে পরিবহন করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এ–সংক্রান্ত চুক্তি হয়। এ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনালে বিনিয়োগ ও পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হলো। আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী ও বর্তমান বিএনপি—তিন সরকারের আমলে এসব চুক্তি হয়েছে।
সরকার কেন বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দিচ্ছে, আন্দোলনকারীদের আপত্তি কোথায়, চুক্তিতে বন্দরের আয় কত হবে এবং সেবার মান কতটা বাড়বে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন এই প্রতিবেদক। টার্মিনাল ইজারার নথি, বন্দর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন–উত্তরে বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন: চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ইজারা নিয়ে কেন এত আলোচনা?
উত্তর: বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। এনবিআরের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশ এই বন্দর দিয়ে পরিবহন হয়েছে। সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশও হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বাকি ১ শতাংশ হয় মোংলা দিয়ে।
রপ্তানি পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্য কনটেইনারে পরিবহন করা হয়। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সেবার মান ও ব্যয়ের সঙ্গে দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
দেশের তিন সমুদ্রবন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম সবচেয়ে পুরোনো। এর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ১৮৮৮ সালে। মোংলা চালু হয় ১৯৫০ সালে। পায়রা বন্দরে পণ্য পরিবহন শুরু হয় ২০১৬ সালে। তবে পায়রায় এখনো কনটেইনার পরিবহন চালু হয়নি। মোংলায় সীমিত পরিসরে কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা রয়েছে।
চট্টগ্রামে কনটেইনার পরিবহন শুরু হয় ১৯৭৭ সালের মার্চে। শিপিংবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্টের ক্রমতালিকায় কনটেইনার পরিবহনে বন্দরের অবস্থান ৬৮তম।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে। এনসিটি ও পতেঙ্গা ছাড়া বাকি দুটি হলো চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। এই দুটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে।
বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের চাপ বাড়লেও সে অনুযায়ী জেটি ও টার্মিনালের সুবিধা বাড়েনি। বর্তমানে চালু চারটি টার্মিনালের মধ্যে গত ৩৫ বছরে নির্মিত হয়েছে দুটি। জাহাজজট ও পণ্য খালাসে বিলম্বের মতো সমস্যাও রয়েছে। বিদেশি অপারেটর নিয়োগে এসব সমস্যার কতটা সমাধান হবে, তা নিয়েই মূল আলোচনা।
কনটেইনার টার্মিনালের প্রধান কাজ জাহাজ থেকে আমদানি কনটেইনার নামানো এবং রপ্তানি কনটেইনার জাহাজে তুলে দেওয়া। জেটি হলো জাহাজ ভেড়ানোর অবকাঠামো। এক বা একাধিক জেটি, কনটেইনার রাখার চত্বর এবং ওঠানো–নামানোর যন্ত্রপাতি নিয়ে একটি টার্মিনাল গড়ে ওঠে।

প্রশ্ন: কতটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ হয়েছে, আর কতটিতে প্রক্রিয়া চলছে?
উত্তর: চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনালের জন্য বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এগুলো হলো পতেঙ্গা, লালদিয়া ও নিউমুরিং।
পতেঙ্গা টার্মিনালের জন্য সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চুক্তি হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের জুনে পরিচালনা শুরু করে। চুক্তির মেয়াদ ২২ বছর।
লালদিয়ায় টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ২০২৫ সালে ডেনমার্কের মায়ের্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি হয়। প্রতিষ্ঠানটির তিন বছরে টার্মিনাল নির্মাণ করে পরবর্তী ৩০ বছর পরিচালনা করার কথা। শর্ত পূরণ হলে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
নিউমুরিং টার্মিনাল ১৫ বছর পরিচালনার জন্য বৃহস্পতিবার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। দুই পক্ষের সম্মতি সাপেক্ষে মেয়াদ বাড়ানোর কথা আছে চুক্তিতে। বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনাল দিয়ে পরিবহন হয়।
বর্তমানে বন্দরে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে। এনসিটি ও পতেঙ্গা ছাড়া বাকি দুটি হলো চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। এই দুটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। সিসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। এটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি আরবের আরএসজিটি ও দেশীয় এমজিএইচ গ্রুপ।
এ ছাড়া বে টার্মিনাল প্রকল্পের দুটি টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সেখানে এখনো অবকাঠামো নির্মাণ হয়নি।
মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল নির্মাণের কাজও এগোচ্ছে। জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা, বাংলাদেশ সরকার ও চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০২৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এটি বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালনা করার কথা রয়েছে।

প্রশ্ন: আগে কীভাবে অপারেটর নিয়োগ হতো, এখন কীভাবে হচ্ছে?
উত্তর: আগে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সাধারণত পাঁচ বছরের জন্য অপারেটর নিয়োগ করা হতো। প্রতি কনটেইনার জাহাজে ওঠানো বা নামানোর জন্য সবচেয়ে কম দর দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হতো।
অপারেটর নিজেদের জনবল দিয়ে কাজ করত। বন্দরের কর্মকর্তা–কর্মচারীরাও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। জেটি, যন্ত্রপাতি ও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ছিল বন্দরের হাতে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মাশুল আদায় করত এবং মাস শেষে কনটেইনারের সংখ্যা অনুযায়ী অপারেটরকে বিল দিত।
নতুন তিনটি চুক্তি হয়েছে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় সরকার টু সরকার বা জিটুজি ব্যবস্থায়। ২০১৫ সালের পিপিপি আইনে শুরুতে জিটুজি প্রকল্পের বিধান ছিল না। ২০১৭ সালে এ–সংক্রান্ত নীতি হয়। পরে ২০১৯ সালে আইন সংশোধন করা হয়। এই কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার কথা। এর মধ্যে বন্দরকে এককালীন ৫ কোটি ডলার দেবে প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন ব্যবস্থায় অপারেটর দীর্ঘ মেয়াদে টার্মিনাল নির্মাণ বা উন্নয়ন, যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ এবং পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। সেবার বিনিময়ে মাশুল আদায় করে প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষও অর্থ পায়।
অর্থাৎ টার্মিনালের দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব অপারেটরের হাতে যায়। মালিকানা থাকে বন্দরের। দুই পক্ষের অধিকার, দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণের সীমা চুক্তিতে নির্ধারিত থাকে।
প্রশ্ন: এনসিটির চুক্তিতে কী আছে?
উত্তর: একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিতে পরিচালনার অধিকার, দুই পক্ষের দায়বদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত, পরিবেশ ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা, ন্যূনতম সেবার মান, মাশুল এবং সম্পদের মালিকানা নিয়ে ধারা রয়েছে।
এ ছাড়া মেয়াদ ও নবায়ন, জেটির সামনে খননকাজ, দৈবদুর্বিপাক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, চুক্তি বাতিল ও ক্ষতিপূরণ, বন্দর কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের অধিকার, গোপনীয়তা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং হস্তান্তরের বিষয়ও রয়েছে।
টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার কথা। এর মধ্যে বন্দরকে এককালীন ৫ কোটি ডলার দেবে প্রতিষ্ঠানটি।
এককালীন অর্থের ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের দিন এবং বাকি ৭৫ শতাংশ টার্মিনাল বুঝিয়ে দেওয়ার আগে পরিশোধ করার কথা। চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর। দুই পক্ষের সম্মতি সাপেক্ষে মেয়াদ বাড়ানোর কথা আছে চুক্তিতে।
এই ধরনের কনসেশন চুক্তির সাধারণত পুরোটা প্রকাশ করা হয় না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের ঝুঁকি নেয় বলে তাকে সুরক্ষা দিতেই দুই পক্ষ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়, কোন ধারা প্রকাশ করা হবে, কোনটি প্রকাশ করা হবে না।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো–নামানোর শর্তও রয়েছে। গত অর্থবছরে এনসিটিতে পরিবহন হয়েছে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার।
এখানে ‘একক কনটেইনার’ বলতে ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারের সমতুল্য একক বা টিইইউ বোঝানো হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী এনসিটিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে অপারেটরের আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রশ্ন: এনসিটি থেকে বন্দর কত রাজস্ব পাবে?
উত্তর: বৃহস্পতিবার চুক্তির পর সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, প্রতি কনটেইনার রাজস্ব আয়ের ৬৭ শতাংশ বন্দর পাবে।
পরে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টার্মিনালের গড় আয়ের ভিত্তিতে প্রতি একক কনটেইনারের ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ বন্দর পাবে। এর বাইরে বছরে ১০ কোটি টাকার নির্ধারিত ফি পাবে বন্দর।
বন্দরের হিসাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এনসিটিতে কনটেইনারপ্রতি মোট আয় ছিল ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। এই আয় ধরে ৬৭ শতাংশ হিসাব করলে বন্দর পাবে প্রায় ১০৮ ডলার ৪২ সেন্ট।
তবে মন্ত্রী বলেছেন, বর্তমানে এনসিটিতে কনটেইনারপ্রতি আয় হয় ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার। সেই হিসাবে বন্দরের অংশ দাঁড়াবে ৯৩ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে ১০০ ডলার ৫০ সেন্ট।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্থগিত হওয়া দর-কষাকষিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড আয়ের স্তর অনুযায়ী বন্দরকে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। কনটেইনারপ্রতি আয় ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার হলে বন্দরকে ৯৭ ডলার ৫০ সেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। আয় ১৬০ ডলারের নিচে নামলে তা হতো ৯৩ ডলার ৫০ সেন্ট।
এই ধরনের কনসেশন চুক্তির সাধারণত পুরোটা প্রকাশ করা হয় না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের ঝুঁকি নেয় বলে তাকে সুরক্ষা দিতেই দুই পক্ষ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়, কোন ধারা প্রকাশ করা হবে, কোনটি প্রকাশ করা হবে না।
প্রশ্ন: তিন টার্মিনালের চুক্তির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: তিন টার্মিনালে বিনিয়োগের ধরন আলাদা। লালদিয়ায় খালি জমিতে নতুন টার্মিনাল হবে। পতেঙ্গায় বন্দরের নির্মিত টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করছে। এনসিটি চালু ও যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ টার্মিনাল; সেখানে আধুনিকায়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
লালদিয়া: ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি হয়। গত ২২ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটিকে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমি বুঝিয়ে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেখানে টার্মিনাল নির্মাণে এপিএমের ৭৬ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী আট লাখ একক কনটেইনার পর্যন্ত কনটেইনারপ্রতি ২১ ডলার পাবে বন্দর। ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত কনটেইনারের জন্য প্রতি এককে ২৩ ডলার পাওয়ার কথা।
প্রকল্পে স্থানীয় বিনিয়োগকারী অংশীদার হিসেবে রয়েছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড। কনটেইনার ডিপো পরিচালনায় অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক অপারেটরের সঙ্গে টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে। নতুন কর্মসংস্থানও হবে।
পতেঙ্গা: বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থে টার্মিনালটি নির্মাণ করেছে। ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। আরএসজিটি সেখানে যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করে পরিচালনা করছে। মূল চুক্তিতে কনটেইনারপ্রতি বন্দরকে ১৮ ডলার দেওয়ার কথা রয়েছে।
পাঁচ লাখ একক কনটেইনার পরিবহনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই টার্মিনালে গত অর্থবছরে পরিবহন হয়েছে প্রায় দেড় লাখ একক কনটেইনার।
নিউমুরিং: টার্মিনালটির নির্মাণ শুরু হয় ২০০৪ সালে, শেষ হয় ২০০৭ সালে। নির্মাণে ব্যয় হয় ৫৬৭ কোটি টাকা। পরে যন্ত্রপাতি স্থাপনসহ মোট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা।
এনসিটিতে রাজস্ব ভাগাভাগির ভিত্তিতে বন্দর অর্থ পাবে। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কনটেইনারপ্রতি বর্তমান আয় ধরে বন্দরের অংশ ৯৩ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে ১০০ ডলার ৫০ সেন্ট হতে পারে। তবে তিন টার্মিনালে বিনিয়োগ, সেবা ও চুক্তির ধরন আলাদা হওয়ায় শুধু কনটেইনারপ্রতি প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে চুক্তিগুলোর লাভ–ক্ষতি তুলনা করা যায় না।

প্রশ্ন: কোন টার্মিনালে বন্দরের সক্ষমতা বেশি বাড়বে?
উত্তর: লালদিয়া নির্মিত হলে বছরে নতুন করে ৮ থেকে ৯ লাখ একক কনটেইনার পরিবহনের সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার কথা। পতেঙ্গা টার্মিনালের পূর্ণ সক্ষমতা পাঁচ লাখ একক কনটেইনার।
এনসিটি আগে থেকেই চালু। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সেখানে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। নতুন অপারেটরের অধীনে এর চেয়ে বেশি কনটেইনার পরিবহন করা গেলে সেই বাড়তি অংশকে বর্তমান পরিবহনের তুলনায় বৃদ্ধি হিসেবে দেখা যাবে।
তবে সক্ষমতা থাকা এবং সেই সক্ষমতা ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। জাহাজ আসা, কনটেইনার রাখার জায়গা, পণ্য খালাস এবং বন্দরের বাইরের যোগাযোগব্যবস্থার ওপরও প্রকৃত পরিবহন নির্ভর করে।
প্রশ্ন: দেশীয় প্রতিষ্ঠান থাকতে বিদেশি অপারেটর কেন?
উত্তর: সরকারের বক্তব্য, নিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ। তাদের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পরিচালনদক্ষতা কাজে লাগিয়ে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনে বিপুল অর্থও প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগ এলে এসব খাতে সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন কমবে।
বৃহস্পতিবার নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও বাণিজ্যের প্রসারের লক্ষ্যে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চুক্তি করা হচ্ছে। বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অবশ্য এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবিতে বিনিয়োগ ও পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছিল কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানও। বন্দরের ভাষ্য, এসব প্রস্তাব আসার আগেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তাই নতুন প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়নি।
প্রশ্ন: বিশ্বে বন্দর পরিচালনার কত ধরনের ব্যবস্থা আছে?
উত্তর: বিশ্বব্যাংকের ২০০৭ সালের ‘পোর্ট রিফর্ম টুলকিট’ প্রকাশনায় বন্দর পরিচালনার চার ধরনের মডেল উল্লেখ করা হয়েছে। বিনিয়োগ, মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তার ভিত্তিতে এই ভাগ করা হয়।
পাবলিক সার্ভিস পোর্ট: সরকারি সংস্থা অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করে এবং নিজেরাই পরিচালনা করে।
টুল পোর্ট: সরকারি সংস্থা জেটি ও যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করে। পরিচালনার কিছু কাজ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। চট্টগ্রামের এনসিটি, জিসিবি ও সিসিটি এত দিন এই ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়ে এসেছে।

ল্যান্ডলর্ড পোর্ট: জমির মালিকানা সরকারি সংস্থার হাতে থাকে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে পরিচালনা করে। পতেঙ্গা টার্মিনাল এই ব্যবস্থার উদাহরণ।
প্রাইভেট পোর্ট: বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। যুক্তরাজ্যে এই ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে। হাউস অব কমনস লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ৪৩ শতাংশ বন্দর বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় ল্যান্ডলর্ড মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। এনসিটিতে আগে থেকেই বন্দরের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি থাকায় এর ব্যবস্থায় ল্যান্ডলর্ড ও টুল পোর্ট–দুই মডেলের বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
আঙ্কটাডের ‘রিভিউ অব মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী, বিশ্বে সক্রিয় কনটেইনার বন্দরের সংখ্যা ৯৩৭। সংস্থার ‘ট্রেইন ফর ট্রেড’ ডেটাসেট অনুযায়ী, ৬৭ শতাংশ বন্দর ল্যান্ডলর্ড মডেলে পরিচালিত হয়।
তবে পরিচালনার মডেল ও অপারেটর নিয়োগের পদ্ধতি আলাদা বিষয়। ল্যান্ডলর্ড মডেলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগ করা যায়। বাংলাদেশে আলোচিত চুক্তিগুলো হয়েছে জিটুজি ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট অপারেটরের সঙ্গে।

প্রশ্ন: অন্য দেশগুলো কীভাবে বন্দর চালায়?
উত্তর: দেশভেদে সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ ব্যবস্থাপনা রয়েছে। একই দেশের বিভিন্ন টার্মিনালও ভিন্ন ব্যবস্থায় পরিচালিত হতে পারে।
ড্রিউরি ও মেরিটাইম গেটওয়ের ২০২২ সালের কনটেইনার মার্কেট রিপোর্ট এবং বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরবিষয়ক প্রকাশনায় ভারতের ৩০টি কনটেইনার টার্মিনালের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি ভারতীয় অপারেটর, ৯টি বিদেশি অপারেটর, ৭টি দেশি–বিদেশি যৌথ প্রতিষ্ঠান এবং ২টি সরকারি বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে।
একই প্রকাশনায় পাকিস্তানের পাঁচটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের পরিচালনায় থাকার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ডিপি ওয়ার্ল্ড, দুটি হাচিসন পোর্ট হোল্ডিংস এবং একটি ইন্টারন্যাশনাল কনটেইনার টার্মিনাল সার্ভিসেস পরিচালনা করে। শ্রীলঙ্কার পাঁচটি টার্মিনালের তিনটি বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং দুটি দেশি–বিদেশি যৌথ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে।
সিঙ্গাপুরে পিএসএ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং চীনের প্রধান বন্দরগুলোয় রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দেশি–বিদেশি অপারেটরের পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষও পরিচালনায় যুক্ত। নেদারল্যান্ডসের রটারড্যামে টার্মিনাল পরিচালনা করে দেশি–বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব দেশে তাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের হওয়ায় তারা নিজেরাই নিজেদের বন্দর চালাচ্ছে।
প্রশ্ন: বিরোধিতাকারী শ্রমিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আপত্তি কোথায়?
উত্তর: ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে হওয়া চুক্তি বাতিল দাবিতে আন্দোলন করে আসছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। বৃহস্পতিবার ঢাকায় চুক্তি সইয়ের পর বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের মূল ফটকের কাছে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। আলোচনার পথ তৈরি না হলে সোমবার অনশনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তারা। আবার চুক্তির বিরোধিতা করে বৃহস্পতিবার ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে সিপিবি, বাসদসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন। বেলা পৌনে তিনটার দিকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
বন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিচ্যুত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। বরং টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও অটোমেশন প্রতিষ্ঠিত হলে উল্টো আরও চাকরির সুযোগ তৈরি হবে এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে।শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহনমন্ত্রী
শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রধান যুক্তি, জেটি ও আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ টার্মিনালটিতে বন্দর প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। প্রধান যন্ত্রপাতি গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো আরও ১৯ থেকে ২৩ বছর ব্যবহার করা যাবে। তাই বড় বিনিয়োগ ছাড়াই চালানো সম্ভব এমন একটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরকে দিলে বন্দরের আর্থিক ক্ষতি হবে। শ্রমিকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শ্রমিক সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠনও বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরোধিতা করেছিল।
প্রশ্ন: শ্রমিক–কর্মচারীরা কি চাকরি হারাবেন?
উত্তর: সরকারের বক্তব্য, কেউ চাকরি হারাবেন না। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, বন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিচ্যুত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। বরং টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও অটোমেশন প্রতিষ্ঠিত হলে উল্টো আরও চাকরির সুযোগ তৈরি হবে এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে। বন্দরে যখন আরও দক্ষতার সঙ্গে কনটেইনার ওঠানো–নামানো হবে, তখন আরও জনবলের প্রয়োজন হবে। ফলে কোনো শ্রমিকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নেই।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তির সুস্পষ্ট শর্ত অনুযায়ী এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে বিদ্যমান কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে নতুন পরিচালন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বাস্তবে কর্মীদের নিয়োগ, দায়িত্ব ও সুবিধার কী পরিবর্তন হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত এবং বাস্তবায়নের ওপর।
প্রশ্ন: বিদেশি অপারেটর এলেই কি বন্দরের দক্ষতা বাড়বে?
উত্তর: শুধু অপারেটর বদলালেই বন্দরের সব সমস্যার সমাধান হবে না। অপারেটর জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো–নামানো ও টার্মিনালের কাজ দ্রুত করতে পারে। কিন্তু জাহাজ ভেড়ানো, কাস্টমসের ছাড়পত্র এবং বন্দরের বাইরের যোগাযোগব্যবস্থাও সেবার মানে প্রভাব ফেলে।
প্রথমত, জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ। পর্যাপ্ত জেটি না থাকলে বন্দরের জলসীমায় এসেও জাহাজকে অপেক্ষা করতে হয়। চট্টগ্রামের চালু টার্মিনালগুলো কর্ণফুলী নদীর তীরে। নদীতে প্রবেশ করে জেটিতে ভিড়তে দিনের জোয়ারের অপেক্ষাও করতে হয়। বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জট না থাকলেও প্রতিটি জাহাজকে গড়ে ১৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

দ্বিতীয়ত, কাস্টমসের প্রক্রিয়া। জাহাজ থেকে নামানোর পর কনটেইনার ইয়ার্ডে রাখা হয়। কাস্টমসের প্রক্রিয়া শেষ করে পণ্য খালাস নেন আমদানিকারকেরা। এনবিআরের ২০২২ সালের টাইম রিলিজ স্টাডি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মাধ্যমে পণ্য খালাসে গড়ে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা লাগে। এই পুরো প্রক্রিয়া অপারেটরের নিয়ন্ত্রণে নয়।
শুল্কায়নে কাগজনির্ভর ও অনলাইন–ব্যবস্থা পাশাপাশি চলছে। কিছু পণ্যের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতেও সময় লাগে। তত দিন কনটেইনার বন্দরে পড়ে থাকে।
আমদানি কনটেইনারের অন্তত ৬০ শতাংশ খুলে বন্দর চত্বরে পণ্য খালাস করা হয়। এসব পণ্য নিতে বহু ট্রাক টার্মিনালে ঢোকে। এতে যানজট হয় এবং নতুন কনটেইনার রাখার জায়গার ওপর চাপ পড়ে।
তৃতীয়ত, সড়ক, রেল ও নৌযোগাযোগ। বন্দর থেকে পণ্য কত দ্রুত দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাবে এবং রপ্তানি কনটেইনার কত দ্রুত বন্দরে আসবে, তার ওপরও দক্ষতা নির্ভর করে।
রেলপথে মোট কনটেইনারের প্রায় ৫ শতাংশ এবং নৌপথে ১ শতাংশের কম পরিবহন হয়। সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় রেলপথগামী কনটেইনার নিতে অনেক সময় দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগে। সড়কপথেও জট থাকে। আবার চট্টগ্রামের বিভিন্ন ডিপো থেকে রপ্তানি কনটেইনার আসতে দেরি হলে জেটিতে জাহাজকে অপেক্ষা করতে হয়।
এখন পর্যন্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা দেখানোর জন্য একটি উদাহরণ আছে। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এই টার্মিনালে ঘণ্টায় গড়ে ২০টির বেশি কনটেইনার ওঠানো–নামানো হয়। দেশীয় অপারেটরের হাতে পরিচালিত অন্য টার্মিনালগুলোতে এই সংখ্যা গড়ে সর্বোচ্চ ১৭টি।
বিশ্বের কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্র তার প্রধান বন্দরকে এভাবে বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না। এত বড় সিদ্ধান্ত হলেও জনগণ জানে না চুক্তির শর্ত কী, বাংলাদেশের লাভ কী, দায় কী, কোন আইন অনুসরণ করে চুক্তি হচ্ছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, রাজস্ব, শ্রমবাজার বা নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব কী হবে।আনু মুহাম্মদ, অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য
প্রশ্ন: বিদেশি অপারেটর এলে কি মাশুল বাড়বে?
উত্তর: অপারেটর বিদেশি হলেই মাশুল বাড়বে, এমন নয়। মাশুল কত হবে এবং তা পরিবর্তনের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেটি চুক্তি ও সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
যে তিনটি চুক্তি হয়েছে সেগুলোতে সরকার নির্ধারিত মাশুল আদায় করার কথা বলা হয়েছে। তবে মূল ট্যারিফের বাইরে নতুন কোনো সেবা দেওয়া হলে তার বিনিময়ে মাশুল আদায় করতে পারবে অপারেটররা। এনসিটি ও লালদিয়া টার্মিনালে বাড়তি সেবার মাশুল থেকে যে রাজস্ব আসবে বন্দরকে তার ভাগ দিতে হবে। সেই হার কত তা জানা যায়নি।
এপিএম টার্মিনালস ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির আগে চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল বাড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন মাশুল আদায় করবে বিদেশি অপারেটররা।
প্রশ্ন: বন্দর বিষয়ে অভিজ্ঞ, ব্যবসায়ী ও আন্দোলনকারীরা কী বলছেন?
অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য, সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: চট্টগ্রাম বন্দর কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত ভূরাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দু। এমন অবস্থায় এই বন্দরকেই বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার যে কাজ করছে সরকার, সেটি নিছক উন্নয়ন বা বাণিজ্যগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। বিশ্বের কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্র তার প্রধান বন্দরকে এভাবে বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না। এত বড় সিদ্ধান্ত হলেও জনগণ জানে না চুক্তির শর্ত কী, বাংলাদেশের লাভ কী, দায় কী, কোন আইন অনুসরণ করে চুক্তি হচ্ছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, রাজস্ব, শ্রমবাজার বা নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব কী হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক: চুক্তিতে কী আছে তা জানা নেই। তবে আন্তর্জাতিক অপারেটর বন্দর পরিচালনা করলে সেবার মান বাড়বে, এটা বলা যায়। তারা ‘প্রফেশনাল সার্ভিস’ দেয়। তাতে হয়রানিমুক্ত সেবা মিলবে। বন্দরের দক্ষতাও বাড়বে। তবে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে বন্দরের মাশুল যাতে না বাড়ে। কারণ, তাতে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাবে। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের আগে আন্তর্জাতিক অপারেটরদের দেশীয় অংশীদার রাখার বাধ্যবাধকতা যেন থাকে, তা নিশ্চিত করা দরকার। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দেশীয় অংশীদারিও নিশ্চিত করা যায়।
বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য জাফর আলম: খণ্ডিতভাবে যতটুকু জানা গেছে, তাতে ভালো চুক্তি মনে হয়েছে। তবে ঝুঁকি কে কতটুকু নিচ্ছে, সেটা না জেনে মন্তব্য করা যাবে না। এটা ঠিক যে ডিপি ওয়ার্ল্ড বা অন্য যেসব বিদেশি অপারেটর আসছে, তারা নিজেদের ব্যবসার প্রয়োজনে টার্মিনালগুলো আধুনিকায়ন করে ঢেলে সাজাবে। তাতে আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যে গতি আসবে। এখন আমরা যেভাবে কনটেইনার ব্যবস্থাপনা করি, সেটাকে তারা পাল্টে দেবে। তখন কনটেইনার পরিবহন বাড়বে। সেবার মানও বাড়বে। তবে আমূল পরিবর্তনের জন্য তাদের হিন্টারল্যান্ড (বন্দর থেকে কনটেইনার আনা–নেওয়ার পথে) বিনিয়োগ করা দরকার। বন্দর কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে শুধু এই বন্দর নয়, বিদেশে বন্দরের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করা যায়।
[২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট প্রকাশিত এক্সপ্লেইনারের হালনাগাদ সংস্করণ ]